Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তলে তলে এনআরসির প্রস্তুতি নয় তো?

‘আপনি খবরের কাগজের লোক?’ উৎকণ্ঠায় কাঁপতে থাকা নির্মলা মণ্ডলের চোখের চামড়াগুলো যেন একটু আশার আলো দেখেছে। ‘একটু দাঁড়ান...’ বলেই একছুট্টে ঢুকে গেল ঘরের ভিতর। মিনিটখানেকের তফাতে বেরিয়ে এলেন একটা দোমড়ানো প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে।

তলে তলে এনআরসির প্রস্তুতি নয় তো?
  • ১১ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: ‘আপনি খবরের কাগজের লোক?’ উৎকণ্ঠায় কাঁপতে থাকা নির্মলা মণ্ডলের চোখের চামড়াগুলো যেন একটু আশার আলো দেখেছে। ‘একটু দাঁড়ান...’ বলেই একছুট্টে ঢুকে গেল ঘরের ভিতর। মিনিটখানেকের তফাতে বেরিয়ে এলেন একটা দোমড়ানো প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে। থরথর হাতে তার থেকে বের করে আনলেন একতাড়া কাগজপত্র। পরিচয়পত্র। ভোটার কার্ড, আধার, রেশন কার্ড, পুনর্বাসনের পর সরকার যখন এখানে ঘর বরাদ্দ করেছিল, মলিন হয়ে যাওয়া চিঠি। ‘দেখুন তো... এতে হবে?’ নির্মলাদেবীর বয়স প্রায় ৭০। প্রতিদিন সকালে ওই মোড়ের মাথায় ফুল নিয়ে বসেন। ফুটপাতের উপরই। মোড়ের নাম যা খুশি হতে পারে। আপনার, আমার সবার পাড়াতেই এমন একটা মোড় আছে। আর সেখানে এমনই এক নির্মলা মণ্ডলকে আমরা রোজ সকালে খুঁজে পাই। বেশিটা সোমবার বা বৃহস্পতিবার। ওই দুটো দিন তাঁর শরীর খারাপ হলেও চলে না। কারণ বিক্রিটা বেশি। ভয় পেয়েছেন নির্মলাদেবী। স্বামী গত হয়েছেন বছর দশেক। তারপর থেকে একাই নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। এখন হঠাৎ করে শুনছেন এসআইআর বলে কী একটা যেন হচ্ছে। তাতে নাকি নাম বাদ গেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে! তাই তাঁর চিন্তা। স্বাধীনতার পর বাপ-ঠাকুরদার হাত ধরে ওই দেশ থেকেই পালিয়ে এসেছিলেন এখানে। এটাই তো তাঁর দেশ। বললেই হল, তাড়িয়ে দেবে? তাই কাগজ নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন নির্মলারা। একটু শিক্ষিত লোকের কাছে। এমন কেউ, যে কাগজটা বুঝবে। যে আশ্বাস দেবে, এই কাগজেই হবে। কেউ তোমাকে দেশছাড়া করতে পারবে না। 

Advertisement

সত্যি! কিছু একটা হচ্ছে বটে। স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন। ভোটার তালিকার শুদ্ধকরণ। যেন মুক্তিযুদ্ধের সেকেন্ড সিজন। যেন আগে কখনও এসআইআর হয়নি। হ্যাঁ হয়েছে। কিন্তু এমনটা হয়নি। এমনভাবে হয়নি। ২০০২ সালেও আমাদের বাড়িতে ‘কমিশন’ থেকে লোক এসেছিল। হাতে দস্তাবেজ। নাম জিজ্ঞেস করেছিল। বাড়িতে কে কে আছে, কার কার ভোটার কার্ড আছে... সেগুলো দেখে, মিলিয়ে এবং টিক দিয়ে ফিরে গিয়েছিল। পরের ভোটার তালিকায় কারও নাম ছিল। কারও ছিল না। যাদের ছিল না, তারা পরে আবার কাগজপত্র দেখিয়ে, ফর্ম ফিল আপ করে নাম তুলে নিয়েছিল। ভোটও দিয়েছিল। তখন আমরা বুঝতেও পারিনি, এর নাম এসআইআর। এখন বুঝছি। হাড়ে হাড়ে। কারণ, প্রশ্ন উঠে গিয়েছে নাগরিকত্ব নিয়ে। এসআইআরে নাম না থাকলে নাগরিকত্ব যাবে না। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। কী হবে? খুব বেশি হলে এ বছর ভোট দিতে পারবেন না। তারপর আবার আবেদন করবেন। নাম তুলবেন। নতুন ভোটার কার্ড হবে। আবার ভোট দেবেন। ভোটার তালিকায় নাম না উঠলে কেউ কোনও নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠাতে পারবে না। এ নিয়ে কোনও সংশয় থাকার কথা নয়। নির্মলাদেবী ১৯৯৫ সালে ভোট দিয়েছিলেন। তারপর  কিন্তু, তারপরও সংশয় থেকে যাচ্ছে। কোথায়? গোটাটা একটা ভানুমতীর খেল। আগে থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া একটা পারসেপশন... ধারণা... ভয়... ঠিক ম্যাজিকের শোয়ের মতো। চোখে চশমাটা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই মতোই দেখতে হবে, মজা পেতে হবে, ভয়ও। চশমাটা কীসের? এনআরসির। আমাদের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে বারবার বলেন, গোটা দেশে এনআরসি করব। কীসের ভিত্তিতে বলেন? পুরোটাই কি ফাঁকা আওয়াজ? না, ফাঁকা আওয়াজ নয়। গোটা দেশে তিনি, অর্থাৎ ভারত সরকার চাইলেই এনআরসি করতে পারে। কেন্দ্র যদি মনে করে, অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা দেশে প্রচুর সংখ্যায় বেড়ে গিয়েছে। তারা এদেশের নাগরিক না হওয়া সত্ত্বেও যাবতীয় প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করছে বলে ট্যাক্স দিচ্ছে না। এবং ভারতীয়দের অধিকারে ভাগ বসাচ্ছে... তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসি করতেই পারে। আইন তাদের এই সংস্থান করে দিয়েছে। কোন আইন? নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০০৩। সেই সময় সংশোধনীর পর ১৪এ ধারা যুক্ত হয়েছিল আইনে। সেখানেই বলা হয়েছিল এনআরসির কথা। সরকারি পরিভাষায় এনআরআইসি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব ইন্ডিয়ান সিটিজেনস (এনআরআইসি)। আর তা কাদের পরিচালনায় হবে? ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অথরিটি, যা গঠন করবে কেন্দ্রীয় সরকারই। 
তখন এই আইন পাশে তো কোনও সমস্যা হয়নি! লোকসভায় বিল পেশ হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটিতে গিয়েছে, সেখানে সায়ও মিলেছে। তখন স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বাধীন স্ট্যান্ডিং কমিটি জানিয়ে দিয়েছিল, অনুপ্রবেশ রুখতে এনআরসি জরুরি। সংসদেও কিন্তু এর বিরোধিতায় মারাত্মক আলোচনা হয়েছিল, তেমনটা নয়। দু’জন মাত্র সাংসদ এই বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন—পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত নির্দল এমপি শঙ্কর রায়চৌধুরী এবং ডঃ মনমোহন সিং। তিনি তখন রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা। পরের বছর প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, এমনটা তাঁর ভয়ানক শুভাকাঙ্ক্ষীও ভাবছিল না। কিন্তু তিনি বলেছিলেন। কারণ, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা মনমোহন সিং বুঝতেন। দেশভাগ দেখেছিলেন তিনি। পাঞ্জাবের সুফলা মাটি রক্তে লাল হতে দেখেছিলেন। ধর্মের নামে, বিভাজনের নামে ধর্ষণ, হত্যালীলার সাক্ষী তিনি। আর রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে অসম থেকে নির্বাচিত। সেখানেও সমস্যা উদ্বাস্তুর। একটুকরো জমির। অস্তিত্বের। বেঁচে থাকার। তাই তিনি বলেছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে। কেউ গা করেনি। তখন বাংলায় বামেদের রাজত্ব। লোকসভায় সিপিএমেরই সাংসদ সংখ্যা ২১। এছাড়া শরিক দলগুলির আরও আট। কেউ কিন্তু রা কাড়েননি সংসদে। তৃণমূল কংগ্রেসেরও তখন এমপি সংখ্যা আট। কেনই বা তাঁরাও প্রতিবাদে গর্জে ওঠেননি? কেন বলেননি উদ্বাস্তুদের সমস্যার কথা? আসলে সেই সময় এনআরসিকে সমস্যা বলে মনেই হয়নি কোনও দলের। কোনও সাংসদের। বরং মনে হয়েছিল, অনুপ্রবেশকারীরা হটে গেলে আমাদের দেশের মানুষ বেশি করে সুযোগ-সুবিধা পাবে। আমাদের করের টাকায় অন্য দেশ থেকে আসা লোকজনকে লালন-পালন করতে হবে না। এবং আর একটা মোক্ষম যুক্তি—তখন বিভাজন ছিল না। হিন্দু-মুসলিম ধর্মের ভিত্তিতে সমাজের মাঝ বরাবর দেওয়াল তোলা হয়নি। তখনও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ পাশ হয়নি। তখন আইনি পরিভাষায় ঘোষণা করা হয়নি যে, অ-মুসলিমরাই শুধু শরণার্থীর মর্যাদা পাবেন। মুসলিম মাত্রেই অনুপ্রবেশকারী। তখনও বিহারের এসআইআর দেশটাকে নরককুণ্ডের মতো আগ্নেয়গিরির উপর বসিয়ে দেয়নি। মানুষের ভরসা ছিল সরকারের উপর। এখন? ভরসা শব্দটাই আর সরকার বা শাসকের জন্য প্রযোজ্য নয়। পুরোটাই বদলে গিয়েছে ভক্তি এবং অভক্তিতে। বিহারে হাজারে হাজারে অভিযোগ জমা পড়েছে... বেঁচে থাকতেও কারও নাম বাদ গিয়েছে, হাজিরা দিয়েও সুরাহা হয়নি। কোনও পরিযায়ী শ্রমিক ওই পর্বে বাড়ি ফিরতে পারেননি বলে তাঁর নাম ওঠেনি। স্ত্রীয়ের কথাও কেউ শোনেনি। কোনও গ্রামে বিলও পৌঁছোননি। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গ্রামীবাসী দেখেছেন, বেরিয়ে গিয়েছে ভোটার তালিকা। সেখানে তাঁদের কারও নাম নেই। কাকতালীয়ভাবে এই বাতিল ভোটারদের অধিকাংশই যদি মুসলমান হয়ে থাকেন? তাহলে কি সত্যিই আর ভক্তি আসবে? ভরসা তো বহু দূরের গ্রহ।  তাই মানুষ যদি মনে করে, এই এসআইআরের তালিকা ধরেই অদূর ভবিষ্যতে এনআরসি হবে! তলে তলে তারই প্রস্তুতি চলছে! এই তালিকার ভিত্তিতেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দেশছাড়া করা হবে সালমা বিবি, কেশব দণ্ডপাটদের... অন্যায় ভাবছেন কি তাঁরা? আরও যুক্তি চাই? সেও আছে। যেমন এসআইআরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা দু’টি বছর—১৯৮৭ এবং ২০০৪। কেন? দেখে নেওয়া যাক।
১) প্রশ্ন: নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ১৯৮৭ সালের আগে যাঁদের জন্ম, তাঁদের কোনও নথি দিতে হবে না। ইনিউমারেশন ফর্ম ফিল আপ করলেই হবে। কেন?
উত্তর: সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন, ২০০৩ অনুযায়ী ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে ভারতের মাটিতে জন্মানো প্রত্যেকেই জন্মসূত্রে নাগরিক। তাই এসআইআরেও তাঁদের থেকে কোনও নথি চাওয়া হচ্ছে না। ধরে নেওয়া হচ্ছে, হয় তাঁদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। না হলে তাঁদের বাবা, মা, ঠাকুরদা, ঠাকুমা... কারও তো রয়েছেই। বস্তুত সেটাই হচ্ছে।
২) প্রশ্ন: ১৯৮৭ সালের পর যাঁদের জন্ম, তাঁদের বাবা অথবা মা, যে কোনও একজনের নাম ২০০২ সালের তালিকায় থাকতে হবে। নির্দেশিত নথিগুলির একটি দেখাতেও হবে। কেন?
উত্তর: আইন অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী পর্যন্ত যাঁরা ভারতে জন্মেছেন, তাঁরা কিন্তু আর জন্মসূত্রে নাগরিক নন। তাঁদের বাবা অথবা মা, যে কোনও একজনকে ওই সময় ভারতের নাগরিক হতেই হবে। তবেই তাঁরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবেন। 
৩) প্রশ্ন: ২০০৪ সালের পর যাঁরা জন্মেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে নিজেদের তো বটেই, বাবা এবং মা দু’জনেরই নাগরিকত্বের নথি পেশ করতে হবে।
উত্তর: নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০০৩ প্রণয়নের পর যাঁরা এদেশে জন্ম নিয়েছেন, তাঁদের বাবা এবং মা দু’জনকেই সেই সময় ভারতের নাগরিক থাকতে হবে। তবেই তাঁরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবেন। নতুবা নয়। 
অর্থাৎ অঙ্কটা স্পষ্ট। গোটা খেলাটাই চলছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০০৩’কে ঘিরে। প্রত্যেকটা নির্দেশিকা, সমীকরণ সেই মতোই সাজানো হয়েছে। এই অনুযায়ী ‘নাগরিক’ চিহ্নিত হয়ে গেলে শুরু হবে পরের রাউন্ড। কারণ মনে রাখতে হবে, ২০০৪ সালেই কিন্তু সংশোধনীতে যুক্ত হয়েছিল ১৪এ ধারা। এনআরসির জন্য সরকারকে ছাড়পত্র। 
নতুন করে লেখা শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিহাস। বিভাজনের। কেউ কিছু বলতে পারবে না। কারণ, সবটাই সংবিধানে আছে। কেউ কিছু বলতে পারবে না। কারণ, সবটাই আইন মাফিক হচ্ছে। কেউ কিছু বলতে পারবে না। কারণ, এই জনপ্রতিনিধিদের আমরাই নির্বাচিত করে পাঠিয়েছি দরবারে। কিন্তু এরা ভুলে যাচ্ছে, উদ্বাস্তু মানেই অনুপ্রবেশকারী নয়। শরণার্থী মানেই অ-মুসলিম নয়। এই কাঁটাতারটুকু বাদ দিলে ওই পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশটাও অচেনা নয়। স্বদেশ মানে শুধু ধর্ম নয়। মানুষও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ