নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্রাম: ঝাড়গ্রামের দক্ষিণ অংশ দিয়ে সুবর্ণরেখা নদী বয়ে গিয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠে জনপদ। তার ভগ্নাবশেষ আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকের শ্যামসুন্দরপুর, চিরকালডিহি, আলমপুরে ছোট বড় একাধিক বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। আলমপুরের দু’টি উঁচু ঢিবি সংলগ্ন স্থানটি ‘ঋষিমঠ’ নামে পরিচিত। ঢিবির নীচেই কি কোনও বৌদ্ধমঠ লুকিয়ে রয়েছে? জেলার ইতিহাসবিদ থেকে গবেষকরা এই প্রশ্ন তুলে সেখানে খননের দাবি তুলছেন।
১৯৭২-’৭৩ সালে চিরকালডিহিতে কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে প্রায় সাড়ে তিনফুটের একটি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বর্তমানে ভারতীয় যাদুঘরে রাখা আছে। চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁর গ্রন্থে সমৃদ্ধশালী তাম্রলিপ্ত রাজ্য ও তৎসংলগ্ন ১০টি বৌদ্ধ সঙ্ঘরামের(মঠ) কথা উল্লেখ করেছিলেন। যার বেশিরভাগের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। ঝাড়গ্রাম জেলার পার্শ্ববর্তী দাঁতনের মোগলমারীতে বৌদ্ধমঠের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই মঠটি তৈরি হয়। সেটি থেকে নদীপথে গোপীবল্লভপুরের ঋষিমঠের দূরত্ব খুব বেশি নয়। পুরুলিয়ার পাকবিড়রায় দু’বছর আগে একটি ধ্যানরত বুদ্ধমূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। ঋষিমঠ ঢিবিটি এরপরেই ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের চর্চায় এসেছে।
আঞ্চলিক গবেষক মধুপ দে বলেন, সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী গোপীবল্লভপুর এলাকায় একাধিক বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। জৈন ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার যে ওই এলাকায় ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আলমপুরের ঢিবি দু’টি অনেকখানি জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। খনন করা হলে নতুন তথ্যের সন্ধান পাওয়া যেতে পারেই বলে মনে করছি। নাথধর্মী বৌদ্ধ যুগীদের গ্ৰাম বলে স্থানটি একসময় পরিচিত ছিল। জঙ্গলমহলে সুবর্ণরেখা ও কংসাবতী নদীর তীরে জৈন সম্প্রদায়ের বণিকরা জৈন মন্দির, দেউল নির্মাণ করছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জৈন তীর্থঙ্কররা লৌকিক দেবদেবী হিসেবে পূজিত হন। ঝাড়গ্রাম গার্লস কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সুশীলকুমার বর্মন বলেন, খ্রিস্টপূর্ব থেকেই ঝাড়গ্ৰামে জৈন ধর্মাবলম্বীদের আনাগোনা ছিল। জেলাজুড়ে জৈন মন্দির, দেউল ও তীর্থঙ্করদের বহু মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। জেলায় সহজিয়া বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটেছিল। হিন্দু ধর্মের সঙ্গে যা পরবর্তীতে মিশে যায়। জেলার সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী ভগ্নস্তূপ ও ঢিবিগুলির খনন ও পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান চালালে বৌদ্ধ ধর্মের বহু অজানা তথ্য মিলতে পারে। আলমপুরের গ্ৰাম পঞ্চায়েতের উপ প্রধান স্বপনকুমার সাউ বলেন, স্থানীয় মানুষ ঢিবিতে গিয়ে ফুল দেন, প্রদীপ জ্বালান। সুদূর অতীতে ওই জায়গায় হয়তো কোনও মঠ বা মন্দির ছিল। এলাকার মানুষ সে কথা ভুলে গিয়েছেন। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে ওই ঢিবি দু’টি পবিত্র স্থান হিসেবেই পরিচিত।