তন্ময় মল্লিক: ‘অপারেশন সিন্দুরে’র সাফল্য নিয়ে দেশজুড়ে প্রচারে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উদ্দেশ্য, ভারত-পাকিস্তান লড়াই নিয়ে মানুষের মনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করা। তারজন্য সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডেকে সত্যিটা জানিয়ে দিলেই ল্যাটা চুকে যেত। তা না করে দেশভ্রমণ কেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সবটাই হচ্ছে পরিকল্পনা করে। সিনেমার আদলে পোস্টার বানিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিন্দুর’। লক্ষ্য, দেশজুড়ে জাতীয় ভাবাবেগ তৈরির আড়ালে হিন্দু ধর্মের মানুষকে এককাট্টা করা। কিন্তু মোদিজি, খালি পেটে তো ধর্ম হয় না। এই কথাটা আমাদের শিখিয়েছেন আর এক নরেন। স্বামী বিবেকানন্দ। তাই ধর্মের কথা ছেড়ে এবার একটু কর্মের কথা হোক।
১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করার পরেও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সরকারের সাফল্যের কথা ঘুরে ঘুরে প্রচার করতে হয়নি। কারণ গণহত্যার জবাব কীভাবে দিতে হয়, সেটা তিনি গোটা বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের লালচোখ উপেক্ষা করে ইয়াহিয়া খানের অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে। জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের। তাঁর মুকুটে উঠেছিল ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্যে’র সম্মান। তারজন্য তাঁকে ঢাক পেটাতে হয়নি। কিন্তু নরেন্দ্র মোদিকে পেটাতে হচ্ছে। কারণ ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে দেশবাসী গর্বিত হলেও মনে প্রশ্ন আছে বিস্তর।
পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর প্রত্যাঘাতের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল গোটা দেশ। পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিতে ‘এয়ার স্ট্রাইক’ করতে যত সময় গিয়েছে দেশবাসীর অস্থিরতা ততই বেড়েছে। পাকিস্তানকে জবাব দিতে কেন এত দেরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নই ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। তবে, বিলম্বের কারণ এখন অনেকে বুঝতে পারছেন। অপারেশনের নামকরণ থেকে সাফল্যের প্রচারে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ, সবেতেই পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট। প্রতিটি জনসভায় এমনভাবে নিজেকে তিনি তুলে ধরছেন যাতে মনে হচ্ছে, লড়াইটা পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের নয়, হয়েছে তাঁর সঙ্গেই। ভাবখানা এমন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইটা ভারতীয় সেনারা নয়, করেছেন স্বয়ং মোদিজি। এতদিন আমরা জানতাম, ব্যর্থতাই সাফল্যের সোপান। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ স্বঘোষিত ‘চৌকিদার’ দেখিয়ে দিচ্ছেন, ব্যর্থতাই তাঁর ‘সাফল্য’।
কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনাকেও কত সুন্দরভাবে ভোটের কাজে ব্যবহার করতে হয়, সেটা আরও একবার বাংলায় এসে নরেন্দ্র মোদি দেখিয়ে দিলেন। চার বছর ধরে বাংলায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে রেখে গরিব মানুষের পেটে লাথি মারছেন। আবাস যোজনার টাকাও বন্ধ করে দিয়েছেন। বিজেপি সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে বাংলা তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার প্রতিবাদে বাংলার মানুষ একের পর এক নির্বাচনে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছে। কিন্তু তাতেও সম্বিত ফিরছে না। তাই একুশের নির্বাচনে যে কথা বলেছিলেন, পঁচিশে দাঁড়িয়ে সেই একই কথা বলে চলেছেন। ছাব্বিশেও তার অন্যথা হবে না। তিনি বোঝাতে চাইছেন, রাজ্য সরকারের জন্যই বাংলার মানুষ কেন্দ্রের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই সরকার বদলে দাও।
বাংলার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর এই সব কথা বিশ্বাস করত যদি রেল, সেনাবাহিনী, ব্যাঙ্ক সহ বিভিন্ন
কেন্দ্রীয় সংস্থায় লক্ষ লক্ষ পদ ফাঁকা না থাকত। যদি বছরে দু’কোটি বেকারের কর্মসংস্থানের আশ্বাস পূরণ হতো, যদি সুইস ব্যাঙ্কের ‘কালাধন’ ফিরিয়ে আনা হতো, যদি মেহুল চোকসি, নীরব মোদিদের কোমরে দড়ি বেঁধে ভারতে ফিরিয়ে আনা যেত, তাহলে
বাংলার মানুষও বিজেপিকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করত। কিন্তু একটি কথাও রাখেনি বিজেপি। উল্টে মোদিজির আমলেই বেকারত্ব বৃদ্ধির হার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সুইস ব্যাঙ্কে ভারতীয়দের আমানত বেড়েই চলেছে। এটাই কি মোদিজির ‘আচ্ছে দিন’? এর উত্তর তাঁর কাছে নেই। তাই বিরোধীদের দিকে আঙুল তুলে নিজের ত্রুটি আড়াল করার চেষ্টা করছেন। আর এটা তিনি বছরের পর বছর করে আসছেন। এটাই ‘মোদি- ট্যাকটিস’।
আলিপুরদুয়ারে প্রধানমন্ত্রীর একটা সরকারি কর্মসূচি ছিল। তবে, সেটা ছিল নিছকই ছুতো। আসল উদ্দেশ্য ছিল ‘অপারেশন সিন্দুর’কে সামনে রেখে নিজের মাহাত্ম্য প্রচার। অনেকেই ভেবেছিলেন, হিন্দুভোটকে এককাট্টা করার জন্য গরম গরম কথা বলবেন। তাঁর শরীরে রক্তের বদলে গরম সিন্দুর বইছে জাতীয় আরও কিছু নতুন ডায়ালগ শোনা যাবে। কিন্তু বছর ঘুরলেই বাংলা দখলের ভোট। তাই পাল্টে গিয়েছে স্ক্রিপ্ট। তাঁর ভাষণে স্পষ্ট, পাক অধিকৃত কাশ্মীর নয়, তাঁর লক্ষ্য বাংলা দখল। সেই কারণেই জাতীয় ভাবাবেগে উদ্বুদ্ধ করার মতো রক্ত গরম করা ভাষণ না দিয়ে আক্রমণের ফলা ঘুরিয়ে দিয়েছেন বাংলার তৃণমূল সরকারের দিকে। চাকরিহারা শিক্ষকদের জন্য চোখের জলও ফেললেন। কিন্তু তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করলেন না। কারণ প্রতিকার তিনি চান না। সমস্যা জিইয়ে রাখলেই লাভ। আর এসব করতে গিয়েই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে যে ঐক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তার
টুঁটি টিপে ধরলেন।
প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অপারেশন সিন্দুর’ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে বেশকিছু প্রশ্ন থাকলেও তিনি তা তোলেননি। দেশের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। সেই কারণেই কেন্দ্রের প্রস্তাব মেনে দলীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভারত সরকারের সমর্থনে প্রচার করতে বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি ‘অপারেশন সিন্দুর’কে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেই কড়া জবাব দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের ময়দানে বিজেপি যে তাঁর সামনে ‘খড়কুটো’, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, যে কোনও সময় ভোটের জন্য তিনি প্রস্তুত। প্রয়োজনে কালই।
এতদিন যে সমস্ত কথা সাধারণ মানুষের মনে জাগছিল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সেগুলিই প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটা কথায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী চুপ করে যান? কেন সেদিন পহেলগাঁওয়ে নিরাপত্তারক্ষী ছিল না? এমনই অনেক অপ্রিয় প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রী তুলেছেন যা এতদিন দেশের ঐক্যের স্বার্থে তুলে রেখেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধকে দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেই রুখে দাঁড়িয়েছেন মমতা।
এখনও পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানায় মৃত পর্যটকদের পরিবারের ক্ষত শুকায়নি। এখনও সংসদের সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল দেশে-দেশে ঘুরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছেন। সকলে একযোগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে যথাযথ প্রমাণ করে যাচ্ছেন। এখনও যুদ্ধের আশঙ্কার মেঘ দূর হয়নি। রাজ্যে রাজ্যে জোর কদমে চলছে যুদ্ধ মোকাবিলার মক ড্রিলের প্রস্তুতি। এটা নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ির সময় নয়।
গোটা দেশকে একটা সুতোয় বাঁধা খুব জরুরি। সেই কাজটা দেশের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীরই করার কথা। কিন্তু তিনি কী করলেন? ‘অপারেশন সিন্দুরে’র সাফল্যের প্রচারের নামে এ রাজ্যে এসে বিদ্বেষের
বিষ ছড়িয়ে গেলেন।
বাংলায় এসে নরেন্দ্র মোদি যত না পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরব হলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি বিষোদ্গার করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে। কারণ তিনি বুঝেছেন, পাকিস্তানের মোকাবিলায় কোনও না কোনও ‘বড় দাদা’কে পেয়ে যাবেন, কিন্তু বাংলা দখলের জন্য পাশে কাউকে পাবেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লড়াইটা তাঁকেই লড়তে হবে। আর প্রতিপক্ষ হিসেবে তৃণমূল সুপ্রিমো যে কতটা ভয়ঙ্কর, সেটা একুশের নির্বাচনেই তিনি টের পেয়েছেন। তাই ঐক্যের আলখাল্লা খুলে নেমে এসেছেন সেই অতি পছন্দের বিভাজনের
পথে। উদ্দেশ্য, মুসলিম আতঙ্ক তৈরি করে হিন্দুভোট এককাট্টা করা।
সেই লক্ষ্যেই মুর্শিদাবাদের গোষ্ঠী সংঘর্ষের প্রসঙ্গ উস্কে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে যখন তাঁর ঐক্যের বার্তা দেওয়ার কথা, তখন তিনি খেলে দিলেন বিভাজনের তাস। তাতেই বোঝা গেল, সোফিয়া কুরেশিকে সামনে রেখে ‘অপারেশন সিন্দুরে’র সাফল্যের ফিরিস্তি দেওয়ানোটা আন্তরিক ছিল না, তা ছিল একটা পরিকল্পিত চিত্রনাট্যের অঙ্গ। বোঝা গেল, গোধরা কাণ্ডের পর অটলবিহারী বাজপেয়ির রাজধর্ম পালনের শিক্ষাটা পঁচাত্তরে পৌঁছেও মোদিজি নিতে পারেননি। তবে বোঝা গেল না একটি বিষয়, নরেন্দ্র মোদির আসল টার্গেট পাক অধিকৃত কাশ্মীর, নাকি বাংলা!