সমৃদ্ধ দত্ত: রাষ্ট্রের হঠাৎ ইচ্ছা হয়েছিল পুরোনো নোট বদলে দিয়ে নতুন নোট চালু করব। তাই প্রধানমন্ত্রী কোনও একটি দিনকে মর্জিমাফিক বেছে নিয়ে রাত ৮টার সময় নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করে দিলেন আজ রাত ১২ টা থেকে আর পুরোনো দুটো নোট চলবে না। একথা জানিয়ে তিনি সেদিন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ১৪০ কোটি মানুষকে জাগিয়ে রেখে। সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে এনে ব্যাংকের সামনে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই নোটবাতিল নামক একটি খামখেয়ালি খেলার জেরে ব্যাংকে অথবা এটিএমে টাকা জমা দেওয়া এবং টাকা তোলার লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে দেশজুড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হল। আত্মহত্যা ঘটল একের পর এক। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। স্রেফ কর্মহীন হয়ে চরম অন্ধকার ও অনিশ্চিত জীবনে প্রবেশ করল অসংগঠিত ক্ষেত্রের বহু গরিব নিম্নবিত্ত।
ক্ষুদ্র শিল্প আজ পর্যন্ত আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারল না। এক বছর। দুই বছর। তিন বছর। চার বছর। সেই প্রধানমন্ত্রীকে আর কোনওদিন বলতেও শোনা গেল না যে, আমি ভুল করেছিলাম। ভারত যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গিয়েছে। কালো টাকা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি সব একইভাবে বয়ে চলেছে সমাজে। ওই যে মানুষগুলির মৃত্যু হয়েছিল, তাদের পরিবার ছাড়া কেউই মনে রাখেনি তাদের মূত্যুর কারণ। রাষ্ট্র মনের আনন্দে নিজের বিজয়গাথা গেয়ে চলেছে নানারকম ইশ্যুতে।
আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড সব পেয়ে গিয়েছে যখন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং স্থায়ী নাগরিকের মতো ভোট দেওয়া থেকে সব রাষ্ট্রীয় কার্যে বছরের পর বছর ধরে অংশ নিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন রাষ্ট্রের মনে হয়েছিল, অনেকদিন কিছু করা হয়নি। কেমন যেন জোলো হয়ে গিয়েছে লাইফটা। বোরিং। তাই হঠাৎ করে রাষ্ট্র স্থির করল, সেই নাগরিকদেরই আবার নাগরিকত্ব পেতে হলে আবেদন করতে হবে। অন্য কাজ নেই। তাই গবেষণা করে রাষ্ট্র ঠিক করল ২০১৪ সালের আগে যারা যারা এসেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে, তাদের সিএএ নামক একটি নয়া আইনে নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। প্রবল তোলপাড় হল। দেশের ৯৪টি জেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশ গুলি চালায়। সংঘর্ষ হল। দাঙ্গাও হল। শুধু সিএএ আন্দোলনের জেরে ৩১ জনের মৃত্যু হল। এদের কেন জন্ম হয়েছিল, এদের কেন মূত্যু হল— এসব নিয়ে রাষ্ট্রের ও সরকারের কোনও ভ্রুক্ষেপই আর দেখা গেল না। আবার জীবন নিজের ছন্দে চলল।
২০২০ সালের মার্চ মাসে একদিন মহামান্য রাষ্ট্রনায়কদের মনে হল করোনা নামক রোগের জন্য এখনই সব লকডাউন করে দেওয়া উচিত। সব উন্নত দেশই করছে। আমরাও করব। সব আধুনিক উন্নত দেশের কত জনসংখ্যা, সেসব দেশের সামাজিক অবস্থাটা ঠিক কেমন, কোন কোন জীবিকার উপর কী ধরনের মানুষ নির্ভর করে বেঁচে থাকে দু’বেলা খাওয়ার জন্য, এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করল না সরকার। আবার নাটকীয়ভাবে টিভির পর্দায় এসে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে দিলেন আজ রাত ১২ টার পর সব বন্ধ। সব মানে? সব মানে বাস, ট্রেন, যানবাহন, সব। অর্থাৎ মাটির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক এতই আলগা এবং বিচ্ছিন্ন যে, এইসব উচ্চপদে থাকা মানুষজন জানেই না এই সিদ্ধান্তের জেরে কী কী হতে পারে।
হাজার হাজার মানুষ হাজার কিলোমিটার করে হাঁটতে শুরু করল। এইসব পরিযায়ী শ্রমিক যখন খোলা আকাশের নীচে হাঁটছিল, মৃত্যু হচ্ছিল, খাবার পাচ্ছিল না, অনাহারে হাহাকার করছিল, বিনা আয়ে আত্মহত্যা করছিল, সেই সময় রাষ্ট্র ব্যালকনি সোসাইটিকে নির্দেশ দিয়েছিল ব্যালকনিতে এসে থালা বাসন বাজাও। উচ্চবর্গের বুদ্ধিমান শহুরে নাগরিকরা হাসিমুখে এই অভিনব সার্কাসের অঙ্গ হয়ে থালা বাজাতে বাজাতে সেলফি তুলছিল। মুখে বলেছিল, যা করোনা যা…। একজনও গরিব খেটে মানুষের ওরকম ছবি পাওয়া যাবে না। কারণ প্রথমত তাদের ব্যালকনি নেই, দ্বিতীয়ত এত বুদ্ধিও নেই যে, থালাবাসন বাজিয়ে করোনা তাড়াতে পারবে। উচ্চবুদ্ধির নাগরিকরা আবার কোনওদিন হয়তো রাত ৯ টায় আলো নেভানো জ্বালানোর খেলা খেলেছে।
এক সকালে ব্যালকনিতে এসে দেখেছে আর্মির হেলিকপ্টার আকাশ থেকে ফুল ছড়াচ্ছে। তারা আনন্দ পেয়েছে। কারণ অফিস যেতে হয়নি। ঘরে বসে অফিস। কিন্তু ফুল স্যালারি। এই রাষ্ট্রের হাতের পুতুল নাগরিকরা ভেবেছিল এই আনন্দ চিরস্থায়ী। কিন্তু তারা নিজেরা যখন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, তখন ভেবেছিল যাদের কথায় তারা থালাবাসন বাজিয়েছিল তারা বোধহয় সেই ব্যালকনিতে এসে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেবে। দেয়নি কেউ। তাই করোনায় তো বটেই, অক্সিজেনের অভাবেও অসংখ্য ট্যাক্স দেওয়া, ভোট দেওয়া থালা বাজানোদের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে মূত্যু হয়েছে। আজ আর এদের কারও কথা মনে নেই কারও।
এবার এসেছে ভোটার তালিকা সংশোধন। আমাদের রাজ্যজুড়ে মাঝেমধ্যেই নিয়ম করে শোনা যাচ্ছে এসআইআরের আতঙ্কে মানুষের মৃত্যুর সংবাদ। আত্মহত্যার সংবাদ সবথেকে বেশি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমেও এখন আর সেইসব সংবাদ বিরাট কোনও খবর হয় না। রাজনীতিবিদরা একে অন্যকে দোষারোপ করছে। অথচ কী এক সামান্য কারণে টুপ টুপ করে একের মানুষের, আমাদের আশপাশের নাগরিকদের মৃত্যু হচ্ছে। তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, সেটা অবশ্যই ভুল। কিন্তু রাষ্ট্র কোথায় যে, তাদের পাশে এসে বোঝাচ্ছে? কাঁধে হাত রাখছে? বলছে ঘরে ঘরে গিয়ে যে, এত আতঙ্কের কিছু নেই! আমরা তোমাদের পাশে আছি। এসআইআর ভালো না মন্দ, তার সঙ্গে এই মৃত্যুর সম্পর্ক নেই। শুধু আমাদের মনে রাখা দরকার যে, বিগত বছরগুলিতে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে, পরিকল্পনার অভাবে, প্রশাসনিক ব্যর্থতায় হয়েছে নাগরিকদের মৃত্যুর মিছিল।
ঠিক যখন রাষ্ট্রের একটি প্রান্তে এসআইআর আতঙ্কে মানুষের মূত্যু হচ্ছে, ঠিক তখনই আবার অন্য প্রান্তে খোদ রাজধানীতে একটি বিস্ফোরণ ঘটছে। সন্ধ্যা ৭টার সময় কেউ বাড়ি ফিরছে, কেউ বাজার করছে, কেউ অটোরিকশর সঙ্গে দরাদরি করছে, কেউ স্বজনের হাত ধরে রাস্তা পেরচ্ছিল। একে একে তাদের কেউ প্রাণ হারালো। কেউ হাত হারালো। কেউ পা হারালো। কেউ চোখ হারালো। এই ঘটনা কোথায় ঘটেছে? লালকেল্লার সামনে। ঠিক ১০ মাস আগে এই জায়গাটা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটি ঘোষণা করেছিলেন। সমস্ত পাবলিক প্লেসে দেশজুড়ে কঠোর সিকিউরিটি সিস্টেমে মুড়ে দেওয়া হবে। আমাদের শপথ হল আত্মবিশ্বাসী আত্মরক্ষা। এ হল অন্য ভারত। সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনও আপস নয়..ইত্যাদি। লালকেল্লার বাতাসে কি ওই ভাষণ এখনও ভাসছে?
এইসব নোটবাতিলে, সিএএ আন্দোলনে, দাঙ্গায়, করোনায়, এসআইআরে অথবা বোমা বিস্ফোরণে আমরা যেহেতু বেঁচে আছি, তাই হয়তো মনে হচ্ছে যে, আমরা ভাগ্যবান। বেঁচে আছি। এটা অবশ্যই ভাগ্যের কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা যে, এরকম যে কোনও একটি ঘটনা আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে, স্বজনের সঙ্গে ঘটতে পারে। আমাদের ক্ষতি অথবা আমাদের বেঁচে থাকা না থাকায় রাষ্ট্রের যে কিছুই আসে যায় না, এই অন্তহীন মৃত্যুমিছিল থেকেই প্রমাণিত। এই যে এখন দিল্লিতে দিনের পর দিন ৭০০ থেকে ৯০০ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স চলছে। যা হওয়া উচিত ৫০। অর্থাৎ গ্যাস চেম্বারে মানুষ থাকছে এবং মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। বিষবাতাস নিয়ে বাধ্য হচ্ছে প্রতি বছর বেঁচে থাকতে। রাষ্ট্রকে দেখে মনে হচ্ছে তারা উদ্বিগ্ন? কোনও একটি সভ্য ও আধুনিক দেশে সরকারের এই উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়?
২০২৫ সালে সর্বত্র পালিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের শতবর্ষ। সেই ‘রক্তকরবী’ নাটকে যক্ষপুরীর রাজ্যে কর্মী শ্রমিক গ্রামবাসীদের পরিচয় রাজা বা সর্দারদের কাছে ছিল নেহাত একটি করে সংখ্যা। মানুষের নাম ৪৭ফ। পাড়ার নাম দন্ত্য ন। ১০০ বছর পরও আজ আরও আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সংখ্যা হিসেবেই চিনতে চায়। আধার নম্বর, ভোটার নম্বর, প্যান নম্বর! কখন কোন নম্বরে চিনবে এবং স্বীকৃতি দেবে, সেটাও রাষ্ট্র ঠিক করবে। তাই কখনও বলবে আধারই শেষ কথা। কখনও বলবে আধারের মূল্য নেই। কারণ, আসলে নাগরিকের জীবনের মূল্য নেই! মৃত্যুরও মূল্য নেই।