সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হল পারস্পরিক আলোচনা এবং জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা। কিন্তু টানা ১৩ দিন ধরে সংসদ অচল থাকার পর যখন দেখা যায় সরকারের প্রতিনিধি দূত হয়ে বিরোধী দলনেতার দরজায় কড়া নাড়ছেন, তখন মোদি সরকারের রাজধর্ম পালনের তুলনায় ব্যাকফুটে থাকার বাধ্যবাধকতাই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসলে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ঘরে সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর এক ঘণ্টার গোপন দরকষাকষি কোনো গণতান্ত্রিক উদারতার প্রতিচ্ছবি নয়, এটা নিতান্তই গাণিতিক সমীকরণে মোদি সরকারের বিপাকে পড়ার সম্ভাবনার অশনি সংকেতের ফল। ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসের সংবিধান সংশোধন বিল এবং এফসিআরএ বিল পাস করাতে হলে লোকসভায় প্রয়োজন বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (কমপক্ষে ৩৬২ ভোট)। রাজ্যসভায় ১৬৪। যা বর্তমানে সরকারের হাতে নেই। গত ১৭ এপ্রিল সংসদের বিশেষ অধিবেশনে ২৯৮-৩০ ভোটের ধাক্কায় সরকারের ঝুলিতে পরাজয়ের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা জমেছিল, সেই আতঙ্ক এখনও তাড়া করে চলেছে কেন্দ্রের শাসককে।
মোদি সরকার চেয়েছিল আসন পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে প্রতিটি রাজ্যে লোকসভার আসন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লোভনীয় সুযোগ দেখিয়ে বিরোধীদের ঝুলিতে টোপ ফেলতে। সঙ্গে আটকে থাকা মহিলা সংরক্ষণ বিলের কার্ডও মেজে ঘষে নামানো হয়েছিল। কিন্তু রাজতন্ত্রের ধাঁচে সুবিধা প্রদান করে বিরোধীদের বশ মানানোর সেই কৌশল রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জোড়া শর্তে ধাক্কা খেয়েছে। বিরোধীরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে—সংসদ কোনো মুঘল রাজদরবার নয়। বিরোধীদের সমর্থন পেতে হলে আগে সংসদে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জবাবদিহি করতে হবে। কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ ব্রায়েনও জানিয়েছেন, ডিলিমিটেশন এবং এসসিআরএ—কোনোটিতেই বিরোধীরা সমর্থন দেবে না। আগে সরকার বলুন, কেন সংসদ এড়াচ্ছেন অমিত শাহ? প্রথমত, সিজেপি-র (ককরোচ জনতা পার্টি) সংসদ অভিযান চলাকালীন ছাত্র-যুবদের উপর যে নির্বিচার পুলিশি নিপীড়ন, গুলি ও পেলেট গান চালানো হয়েছিল, তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ সরকারের নেই। কে দিয়েছিল সেই নির্দয় নির্দেশের হুকুম? কেন দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের উপর এমন নৃশংস দমননীতি চালানো হল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষের কাছে এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে। শুধু তাই নয়, নিঃশর্ত ক্ষমাও চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, আস্থা ও ভক্তির স্থান ‘রামমন্দির’-এর প্রণামি চুরির মতো চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা ঢাকাচাপা দিয়ে রাখা যাবে না। সংসদে দাঁড়িয়ে তার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা নিশ্চিত করতে হবে কেন্দ্রকে।
আশ্চর্যের বিষয় হল, আলোচনার পথ খুলে সমস্যা সমাধানের আন্তরিক সদিচ্ছা দেখানোর বদলে সরকার এখনও সংসদ এড়ানোর চোরাগলিতেই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজছে। অর্ডিন্যান্স বা জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে আইন চাপিয়ে দেওয়ার দিন যে ফুরিয়েছে, তা বোঝার সময় এসেছে। আইনসভার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে এবং বিল পাস করাতে হলে কেন্দ্রকে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতেই হবে। স্রেফ বিরোধী শিবিরের ঐক্য ভাঙার কৌশল কিংবা অলীক মেজরিটির অঙ্ক কষে সংসদ চালানোর এহেন প্রয়াস কেবল অপ্রাসঙ্গিকই নয়, চরম দেউলিয়াপনারও বহির্প্রকাশ। আর সেই কারণেই তৃণমূল থেকে শুরু করে মহাজোট ইন্ডিয়ার ঐক্যবদ্ধ সুর আজ এটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মূল ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে স্রেফ বিল পাসের স্বার্থে বিরোধীদের হাত ধরা চলবে না। লোকসভার ওয়েলে নেমে প্রতিবাদ কিংবা গান্ধী মূর্তির পাদদেশ থেকে মকরদ্বার পর্যন্ত বিরোধীদের সম্মিলিত মিছিল কেবল সংখ্যা প্রদর্শনের কৌশল নয়, এটা সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা। রিজিজু স্পিকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন, কিংবা বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরিয়ে ম্যাজিক ফিগার জোগাড়ের অলীক স্বপ্ন দেখতে পারেন, কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় নীতিহীন দম্ভের দিন ফুরিয়েছে। স্বৈরাচারী অবস্থান ত্যাগ করে অমিত শাহ ও মোদি সরকার যতক্ষণ না সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন ও ক্ষমা প্রার্থনা করছেন, ততক্ষণ সংসদ অচল থাকাটাই যেন গণতন্ত্রের জীবন্ত অস্তিত্বের প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।