Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সব দোষ তাহলে ছেলেটার? আমরা সবাই সাধু!

‘কনফিডেন্স আর কন্ট্রোল—দুটোই শেখাতে হয়’। সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এই লাইনটি। কেন? গোটা ঘটনাটির নেপথ্যে রয়েছে গুজরাতের গান্ধীনগরের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্র। সম্প্রতি ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি ১৭’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল ঈশিত ভাট।

সব দোষ তাহলে ছেলেটার? আমরা সবাই সাধু!
  • ২২ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ‘কনফিডেন্স আর কন্ট্রোল—দুটোই শেখাতে হয়’। সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এই লাইনটি। কেন? গোটা ঘটনাটির নেপথ্যে রয়েছে গুজরাতের গান্ধীনগরের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্র। সম্প্রতি ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি ১৭’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল ঈশিত ভাট। শো’র সঞ্চালক অমিতাভ বচ্চনের প্রতি তার ‘অতি-আত্মবিশ্বাসী’ এবং কিছুটা ‘জেদি’ আচরণ দর্শকদের একাংশের কাছে অসম্মানজনক বলে মনে হয়েছে। তা থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই হইহই করে উঠেছে নেটদুনিয়ার একাংশ। এইটুকু ছেলে, তার এমন ঔদ্ধত্য! এই ঘটনায় কেউ আঙুল তুলেছেন পারিবারিক শিক্ষার দিকে। কেউ কেউ আবার এই খুদের ‘অ্যাটিটিউড প্রবলেম’ কীভাবে মেটানো যায়, তা নিয়ে নানান পরামর্শও দিয়েছেন। অনেকটা নীতি-পুলিশের ঢঙে। অভিভাবকত্ব ও সৌজন্যবোধ নিয়ে শুরু করেছেন ট্রোলিং। আবার ঈশিতের সমালোচনা করে ট্রোল করার জন্য পাল্টা প্রশ্নের মুখে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার সুশীল সমাজের একাংশও।

Advertisement

শোয়ের শুরুতেই ঈশিতের ‘আচরণ’ চোখে লাগে দর্শকদের। প্রতি এপিসোডের মতো শোয়ের শুরুতে প্রতিযোগী ঈশিতকে খেলার নিয়ম বোঝাতে শুরু করেছিলেন অমিতাভ। তাঁকে থামিয়ে ঈশিত বলে ওঠে, ‘আমি সব নিয়ম জানি। তাই এখন আমাকে নিয়ম বোঝাতে আসবেন না।’ প্রশ্নোত্তর পর্বেও তার এই জেদি মনোভাব বজায় ছিল। অমিতাভ বচ্চন প্রশ্ন বলা শেষ করে অপশন দেওয়ার আগেই উত্তর দিয়ে দেয় সে। কয়েকটা প্রশ্ন শুনেই ‘আরে অপশন দাও’ বলে তাগাদা দিতে শুরু করে। আবার উত্তর ‘লক’ করার সময়েও সে একইরকম উত্তেজিত। বলে, ‘স্যার, একবার নয়, চারটে লক লাগিয়ে দিন।’ কয়েকটা প্রশ্নের পরেই রামায়ণ-সম্পর্কিত একটি প্রশ্নের ভুল উত্তর দেয় সে। কোনও আর্থিক পুরস্কার ছাড়াই শো থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় কেবিসি-র ওই পর্বটি। তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় নেটিজেনদের মধ্যে। তাঁদের একটা বড় অংশই ক্লাস ফাইভের ওই ছাত্রের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ আবার এককদম এগিয়ে তার অভিভাবকের দিকেও আঙুল তোলেন। নেটপাড়ায় বিতর্কের মূল বিষয় হয়ে ওঠে ছোট্ট ঈশিত। একজন লেখেন, ‘শিশুর জ্ঞান থাকা ভালো। কিন্তু তার সঙ্গে সৌজন্যবোধও থাকা উচিত। না হলে ভবিষ্যতে সে কখনও সফল হতে পারবে না।’ কোনও টাকা না জিতেই কেবিসি থেকে তার বিদায়ে খুশি হয়ে কেউ কেউ লিখেছে, ‘নিজের অহংকারের উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে ছেলেটা।’ অনেকে আবার অভিভাবকদের নিশানা করে লেখেন, ‘কীভাবে সন্তান এত উদ্ধত হয়! এটা অভিভাবকত্ব! ছেলেটির পাশাপাশি তার বাবা-মাও উচিত শিক্ষা পেল।’ 
সোশ্যাল মিডিয়া আসলে আয়নার মতো। সেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়া এই ধরনের মন্তব্যগুলি থেকেই আমাদের মন-মানসিকতার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। বোঝা যায়, সামনাসামনি দাঁড়িয়ে মুখে চারটে সহানুভূতির কথা বললেও ভিতরে ভিতরে আসলে আমরা বড্ড হিংস্র। পাশবিক। প্রতিহিংসাপরায়ণ। আমরা আক্রমণ করার সময় ভাবি না, কাকে বলছি, কী বলছি। যাকে বলছি, আদৌ কি এতটা আক্রমণ করা যুক্তিযুক্ত? আমাদের এই সমালোচনার ফলে সত্যিই কী কোনও পরিবর্তন হবে সেই মানুষটির নাকি একের পর এক আক্রমণে ভিতরে ভিতরে আরও গুটিয়ে যাবে সে। হয়ে উঠবে আরও একরোখা-জেদি-অবাধ্য। ঠিক যেমনটা হয় স্কুলের অবাধ্য বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। শিক্ষকরা যতই বকেঝকে বা বেতের লাঠি দিয়ে শোধরাতে চান এই ধরনের ছাত্রদের, তারা তত জেদি হয়ে ওঠে। বেতের লাল দাগ হাত-পায়ে বসে গেলেও ঠোঁটে ঠোঁট চিপে থাকে। সেই ছেলে-মেয়েটা বড় হয়ে কেমন হয়েছে, সেই খোঁজ কেউ নেন না। ঠিক তেমনই একের পর এক ঝাঁঝালো আক্রমণে ঈশিতের শিশুমনে কী প্রভাব পড়ল, সেই ভাবনার খোঁজ নিই না আমরা। আসলে আমাদের ‘মুক্তি’ আলোয় আলোয় নয়, প্রতিহিংসার অতল আঁধারে। সেখানে কে কেমন থাকল, সেসব ঠুনকো ভাবনার কোনও জায়গা নেই।
আমরা কখনও বাচ্চাদের আচরণ বিশ্লেষণ করি না। অত সময় নেই আমাদের। করলে হয়তো দেখা যেত, বাচ্চারা যা দেখে, তাই শেখে। বাবা-মায়ের আচরণ, বিভিন্ন বিষয় বা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষকের কথাবার্তা—সবই তাদের চারিত্রিক এবং মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে। বর্তমান প্রজন্ম অত্যন্ত স্মার্ট। তারা চিন্তা করে অত্যন্ত দ্রুত। কিন্তু ঠিক কোথায় আত্মবিশ্বাস শেষ হয় এবং শ্রদ্ধা শুরু হয়, তা সবসময় বুঝে উঠতে পারে না। ওই বয়সে সেটা বোঝার কথাও নয়। সেটা শেখাতে হয়। যেমন শেখাতে হয়, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস যেন কখনও অহংকারে পরিণত না হয়। এটা শেখানোর দায়িত্ব আমাদের। আমরা আমাদের কাজটা ঠিকমতো করতে পারি না বলেই ঈশিতের মতো শিশুরা কখনও কখনও সীমা লঙ্ঘন করে ফেলে। কেবিসির মতো নামজাদা টিভি শো-এর মঞ্চে যখন একজন শিশু অমিতাভ বচ্চনের মতো হোস্টের সঙ্গে কথা বলছে, তখন সে তো আর একজন প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পরিস্থিতি সামলাতে পারে না। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার অভাব, উত্তেজনা, প্রত্যাশার চাপ—এই সব কারণ একজন শিশুর কথাবার্তাকে কখনও কখনও রূঢ় করে তোলে। কিন্তু আমরা কখনও ভাবি না, শিশুটি কেন এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল। সত্যি কি এটাই তার প্রকৃতি, নাকি চারপাশের পরিবেশ বা শিক্ষার অভাবের ফলে সে এমনটা করছে। 
কোন ধরনের পরিস্থিতিতে কেমন আচরণ করা উচিত, সেটা শেখানোর দায় ও ভার আমাদেরই। ‘শেখানো’ শব্দটা ছোট হলেও আদতে তার ব্যাপ্তি বিশাল। আর এই শেখানোটা সবার কম্ম নয়। সেই কারণেই আমরা অনেক সময় ভাবি, মারধর বা বকাঝকা করলেই বুঝি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ঠিক যেমনটা ভাবতেন ‘তারে জমিন পার’ সিনেমার নন্দকিশোর অবস্থি। ভাবতেন, ছোট ছেলে ইশান বোধহয় ইচ্ছে করেই তাঁর কথা মেনে চলেন না। শাস্তি হিসেবে ছেলেকে হস্টেলে পাঠিয়ে দেন তিনি। সেখানে গিয়েও শিক্ষকদের লাগাতার সমালোচনায় রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল ছোট্ট ইশান। সেই সময়ে তার জীবনে আসে রামশঙ্কর নিকুম্ভ (আমির খান)। তাঁর স্নেহস্পর্শেই বদলে যায় ইশান। খুঁজে পায় জীবনের অভিমুখ। কিন্তু যদি রামশঙ্কর নিকুম্ভ না আসতেন, তাহলে ইশানের কী হতো? সে খবর নেওয়ার দায় অবশ্য আমাদের নেই। আমরা তার বদলে নিত্যনতুন ইস্যুতে সমালোচনার বাঘনখ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি সমাজমাধ্যমে। লক্ষ্যবস্তুকে (পড়ুন ব্যক্তি) ফালা ফালা করে দিতে পারলে তবেই না শান্তি! দেখার প্রয়োজনবোধ করি না ওই শিশুটি ঠিক কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যেমন ‘তারে জমিন পার’ সিনেমায় ইশান ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ছিল। পরিবার বা শিক্ষকরা তা বুঝে উঠতে পারেননি। তেমনই একাধিক মনোবিদ বলছেন, হয়তো ‘সিক্স পকেট সিনড্রোম’-এ আক্রান্ত ঈশিত। সেই কারণেই ওই টিভি শো’তে এই ধরনের আচরণ করে ফেলেছে ছেলেটি। কী এই ‘সিক্স পকেট সিনড্রোম’? ইন্টারভেনশনাল সাইক্রিয়াটিস্ট ডাঃ সমন্ত দারশির কথায়, বর্তমানে অধিকাংশ দম্পতিরই একটি করে সন্তান। বাবা-মা ও দুই বাড়ির দাদু-ঠাকুমা এই ছ’জনের (সিক্স পকেট) মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগের কেন্দ্রে থাকছে তারা। মুখের কথা খসার আগেই তারা সবকিছু পেয়ে যায়। এই মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা ও আহ্লাদের প্রভাব পড়ে শিশুমনে। কোনও জিনিস না পাওয়া, বা কোনও কিছু পেতে যে কষ্ট, তা উপলব্ধি করতে পারে না ওই শিশুটি। এ থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এই ‘সিক্স পকেট সিনড্রোম’। এর ফলে শিশুরা কখনও কখনও সামাজিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে ফেলে। ঈশিতও এই সিনড্রোমের শিকার।
ঈশিতকে যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তা ওর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদরা।  তাঁদের মতে, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে। তাদের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিকতা গুলিয়ে ফেললে সমস্যা। এই বয়সে একটি মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া বা ভুল আচরণ তাদের বিকাশের অত্যন্ত স্বাভাবিক অংশ। তাই আমরা যদি শুধু ওই একটি মুহূর্ত দেখে তার সমালোচনা করি, আঘাত করি, তাহলে সে আর ভবিষ্যতে কখনও নিজের ভুল স্বীকার বা সমালোচনামূলক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে না। বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ পবন মন্দাভিয়ার মতে, আজ ১০ বছরের ছেলেটিকে দেশজুড়ে ট্রোল করা হচ্ছে। কিন্তু যদি আমাদের মধ্যে কেউ অমিতাভ বচ্চনের জায়গায় থাকত এবং একটি শিশু আমাদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলত, তাহলে হয়তো এমন প্রতিক্রিয়া হতো না। কয়েকজন মনোবিদ আবার বলছেন, ঈশিত ভাটের আত্মবিশ্বাস রয়েছে। এখন তাকে ধৈর্য শেখানো প্রয়োজন। কারণ ভুল সবাই করতে পারে। এই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটা প্রয়োজন। সেই শিক্ষা জীবনভর কাজে দেবে।
আর সেই কারণেই ঈশিতের ক্ষেত্রে টিভি শো’র প্রোডাকশন টিম ও অভিভাবকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত ছিল, কীভাবে সবার সামনে কথা বলতে হয়, কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেই সব বিষয়ে ঈশিতকে আগে থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। পাশাপাশি, শিক্ষার প্রয়োজন আমাদেরও। মানে যাঁরা যে কোনও ইস্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় জ্ঞান বিতরণ করতে বসে যাই, সেই বোদ্ধাদের। কারণ বিশেষ কিছু না জেনে, শুধুমাত্র একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেই আমরা ওই শিশুটিকে অত্যন্ত উদ্ধত বা অহংকারী বলে ধরে নিয়ে সমালোচনায় মেতে উঠি। সেই (বদ) অভ্যাসের পরিবর্তন প্রয়োজন।
ঈশিত ভাটের ঘটনাটি আসলে একটা উদাহরণ মাত্র। আমাদের মনে রাখা উচিত, শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব শুধুমাত্র শিক্ষকদের বা পরিবারের সদস্যদের নয়, পুরো সমাজের। সোশ্যাল মিডিয়া, পরিবার, টিভি, স্কুল—সবকিছুই তাদের জন্য শিক্ষার একটা মডেল। আমরা যদি তাদের সামনে যথার্থ একটা মডেল তুলে ধরি, সহানুভূতি-ধৈর্য-শ্রদ্ধা শেখাই, শিশুরা তাই শিখবে। আর যদি শুধুই সমালোচনা করি, ট্রোল করি, তাহলে সেটাই শিখবে। পরে তারা যখন বড় হবে, তখন এই প্রজন্মও আর ধৈর্য্য বা শ্রদ্ধার ধার ধারবে না। তারাও শুধু সমালোচনা আর ট্রোল করতে থাকবে। বিষিয়ে যাবে সম্পর্ক। হারিয়ে যাবে ‘সহানুভূতি’ উপলব্ধিটাই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ