সমৃদ্ধ দত্ত: ভারতের রাজনীতি নায়ক-নির্ভর। এখানে নায়ক অর্থ শুধুই পুরুষ নয়, নারীও। নায়ক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় চরিত্র। যার নারী-পুরুষ হয় না। ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে, সেটি নিগূঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে পরিলক্ষিত হয় যে, প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি সাফল্য পেয়েছে একজন কেন্দ্রীয় চরিত্রকে সামনে রেখে। ভারতীয় সমাজ মূলত হিরো ওয়ারশিপে বিশ্বাসী। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক সব ইতিহাসেই যে কোনো সাম্রাজ্যের আলোচনা, স্তুতি, নিন্দা, প্রশংসা আবর্তিত হয় একজন নায়ককে ঘিরে। স্বাধীনতার পরও সেই একই প্রবণতা বিদ্যমান হয়েছে। আজও যে সেই মনোভাব সমানভাবে বহমান ভারতের সমাজে তারই সাম্প্রতিকতম উদাহরণ বিহারের উপ নির্বাচন।
মাত্র আট মাস আগে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের রাজনৈতিক দল জন সুরাজ পার্টি বহু প্রত্যাশা জাগিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছিল। জাতপাত অথবা হিন্দু মুসলিমকে ছাপিয়ে তিনি মূলত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ইস্যুকেই তাঁর রাজনীতির চালিকাশক্তি করেছেন। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের ওই নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী হননি। তাঁর দলের প্রার্থীদের পক্ষে তিনি বিহারজুড়ে প্রচার করলেন। তার পরিণতি কী হল? তাঁর দল একটিও আসনে জয়ী হল না। সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অথচ মাত্র আট মাস পর বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা ভোটে প্রশান্ত কিশোর প্রার্থী হলেন। সর্বশক্তিমান বিজেপি যে আসনে ১৯৯৫ সাল থেকে কখনো পরাজিত হয়নি, সেই আসনে তিনি সাম্প্রতিককালের সেরা প্রেস্টিজ ফাইটে জিতে গেলেন। কেন? কারণ, প্রশান্ত কিশোরের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হল। তাঁর সামনে বিজেপি প্রার্থী অথবা দল তুলনামূলকভাবে হয়ে পড়ল অনেক কম আকর্ষণীয়।
বিজেপির রাজনীতি, জনপ্রিয়তা ও শক্তির ভরকেন্দ্র নরেন্দ্র মোদি। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব। রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদব। তৃণমূল কংগ্রেস ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও ক্ষয়প্রাপ্ত আদি তৃণমূল কংগ্রেসের এখনও সবথেকে সেরা বাজি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহীদের কাছে কোনো একক নায়ক তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই যাঁর বৃহৎ জনপ্রিয়তা আছে। সেই কারণেই তাঁরা তথাকথিত বিদ্রোহ করলেও একক শক্তি কারও নেই। কেউ নরেন্দ্র মোদির আশীর্বাদপ্রার্থী। কেউ শুভেন্দু অধিকারীর ভরসায় রয়েছেন।
তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকে এবং ডিএমকে ছাড়া আর কোনো দলের উত্থান হয়নি এতদিন। কিন্তু যখনই জয়ললিতার মৃত্যু হল, তারপর থেকেই দেখা যায় ধীরে ধীরে এআইএডিএমকের ভাঙন শুরু হয়ে যায়। এখন এআইএডিএমকে ক্রমেই দিশাহীন, নায়কহীন একটি দল। আর নতুন করে যে দল তামিল রাজনীতিতে উঠে এসে সরকার পর্যন্ত গঠন করে নিল, সেই টিভিকের জনপ্রিয়তার কারণও সেই একই, অর্থাৎ একক নায়কের খ্যাতি। সুপারস্টার বিজয়।
যে দলের একক নায়ক নেই, সেই দল ভারতের রাজনীতিতে ক্রমেই ক্ষমতা থেকে সরে যাচ্ছে। নীতীশকুমার অস্তগামী। নিষ্ক্রিয়। তাই তাঁর সংযুক্ত জনতা দলও বিহারের রাজনীতিতে গুরুত্ব হারাচ্ছে। এখনই ভবিষ্যদ্বাণী করে দেওয়া যায় যে, বিজেপি, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের পর তৃতীয় শক্তি হিসাবে আগামী দিনে উঠে আসবে প্রশান্ত কিশোরের দল। নীতীশকুমারের দলের কাছে আর নায়ক নেই। সুতরাং তাদের জনসমর্থনকে আকর্ষণ করার মতো আর অস্ত্র নেই। এই যে কালীঘাট তৃণমূলের কোণঠাসা অবস্থাতেও ২১ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে অপ্রত্যাশিত জনসমাবেশ হল তাদের সভায়, তার কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিই এই দলের নিউক্লিয়াস। বাকি যে দলগুলি সুবিধাবাদী রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়ে দল থেকে চলে গিয়েছে, তাদের ভুলে যাওয়া ভবিষ্যতে সময়ের অপেক্ষা। এটাই স্বাভাবিক। সিপিএম সাধারণত দাবি করে থাকে যে, তাদের দল নেতানেত্রী নির্ভর নয়। তাদের দল কালেকটিভ লিডারশিপের। যদি এরকম তত্ত্ব সাফল্য পায় তাহলে গণতন্ত্রে অবশ্যই সেটি সবথেকে কাম্য। কিন্তু এরকম হচ্ছে না। সিপিএমের মধ্যেও চেষ্টা করা হয়েছিল মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে দলের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিভাত করার। তাঁকে ক্যাপ্টেন উপাধিও দেওয়া হয়। তিনি জনপ্রিয় এবং মাটির কাছে গিয়ে রাজনীতি করছেন। এবং সর্বোপরি তাঁকে শুধুই জনসভা, পথসভা, সমাবেশ, পদযাত্রায় দেখা যায়। টিভির সেমিনারে নয়। সুতরাং অবশ্যই বঙ্গ রাজনীতির আগ্রহ থাকবে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি ক্রমশ জননেত্রী হয়ে উঠতে পারবেন কি না সেটা সময় বলবে।
গত শতকের ত্রিশের দশকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের দুজনই ছিলেন দেশের সবথেকে জনপ্রিয় যুবনেতা। জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসু। সুভাষচন্দ্র বসুকে কংগ্রেস থেকে সুকৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও প্রস্তুতি ছিল আরও আগেই। ১৯৩৩ সালেই বল্লভভাই প্যাটেল সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন। এই অপমানও সহ্য করতে হয়েছে সুভাষচন্দ্র বসুকে। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা প্রতিরোধ করা যায়নি বলেই কিছু বছর পর মহাত্মা গান্ধীর সমর্থন করা প্রার্থীকে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্রকেই জিতিয়েছিলেন দেশের কংগ্রেস কমিটিগুলির সদস্যরা। কিন্তু তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়নি তবুও।
১৯৪৭ সালের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করার সময় কেন বল্লভভাই প্যাটেলকে বাছাই না করে জওহরলাল নেহরুকে পদে বসানো হল? এই প্রশ্নকে ঘিরে আজও চর্চা অন্তহীন। কিন্তু ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বল্লভভাই প্যাটেল কংগ্রেসের দলীয় সংগঠনে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন অনেক বেশি, সন্দেহ নেই। কিন্তু জনসমাজের কাছে নায়ক ছিলেন জওহরলাল নেহরু। ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অসমের একটি গ্রামে এক বৃদ্ধা ভোট দিতে এসে ব্যালট পেপারে খুঁজেছিলেন জওহরলাল নেহরুকে। কিন্তু অসমের কোনো কেন্দ্র থেকে জওহরলাল নেহরু প্রার্থী হননি। তাহলে তাঁকে ওই বৃদ্ধা ভোট দেবেন কীভাবে? একথা শুনে ওই বৃদ্ধা ফিরে যান। তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোট নেহরুকেই দিতে চেয়েছিলেন। এটাই ছিল নেহরুর জনপ্রিয়তা।
গুজরাতে ছাত্রযুবদের নবনির্মাণ সেনার জন্ম হল। তারা অত্যন্ত জোরালো আন্দোলন করল। সেই আন্দোলনের অনুসরণে বিহারেও ছাত্র সংঘর্ষ সমিতি গঠিত হল। কিন্তু সেই সরকার বিরোধী তথা ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী আন্দোলন ততদিন পর্যন্ত সেভাবে দানা দেশে আলোড়ন তুলতে পারল না, যতদিন না পর্যন্ত জয়প্রকাশ নারায়ণ কান্ডারি হলেন। যখনই তিনি নেতৃত্ব হাতে নিলেন তৎক্ষণাৎ সেই আন্দোলনের নাম ইতিহাসে হয়ে গেল জেপি মুভমেন্ট। জয়প্রকাশ নারায়ণ আন্দোলন। আর বৃদ্ধ এক নায়কের নেতৃত্বে সাফল্য পেল সেই বিক্ষোভ। ইন্দিরা গান্ধীর গদি টলমল করল। ভীত হয়ে জীবনের সবথেকে বড়ো
ভুল করলেন। জরুরি অবস্থা। তারপর পরাজিত
হলেন নির্বাচনে।
কিন্তু তিনি ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন। এককভাবে কংগ্রেসের নায়ক ছিলেন। আর তাই ১৯৭৭ সালের ওই ভূলুণ্ঠিত অবস্থা থেকে আবার ফিরে এলেন দ্বিগুণ বিক্রমে। অথচ ১৯৭৭ সালে যে দলগুলির বহু নামজাদা নেতা একজোট হয়ে জনতা দল গঠন করে ইন্দিরা গান্ধীকে পরাস্ত করে সরকারও গঠন করেছিলেন, তাঁরা সরকার টিকিয়েই রাখতে পারলেন না। কারণ তাঁরা এককভাবে বিপুল জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না। তাই সরকারের দুবার পতন ঘটল, আবার তাদের সেই সাধের জনতা দল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। বিস্ময়কর হল, সেই আন্দোলন থেকে উঠে এসে নয়ের দশকে আবার একঝাঁক দলের জন্ম হল রাজনীতিতে। আর সেইসব দলের সাফল্য এল আঞ্চলিকভাবে। কারণ সেই দলগুলির কাছে একজন করে নায়ক ছিল। মুলায়ম সিং যাদব, লালুপ্রসাদ যাদব, নীতীশকুমার, রামবিলাস পাসোয়ান।
সোজা কথায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি ভারতের রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রধানত চালিত করে এসেছে। এই যে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে মল্লিকার্জুন খাড়্গে। কিন্তু তাঁকে কি কেউ কংগ্রেসের চালিকাশক্তি কিংবা সর্বময় কর্তা হিসাবে মনে করে? সকলের কাছে কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক হলেন রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধীরা। বিজেপির সভাপতির নাম জগৎপ্রকাশ নাড্ডাই হোক অথবা নীতিন নবীন। কেউ কি মনে করে যে, তাঁরাই বিজেপির প্রধান আকর্ষণ ও কেন্দ্রীয় চরিত্র? একেবারেই না। বিজেপিকে সকলেই নরেন্দ্র মোদির দল হিসেবে বিবেচনা করে।
ভারতীয় রাজনীতির বিশ্লেষণ করতে হলে সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জরুরি। অর্থাৎ একটি সমাজের রাজনৈতিক চর্চায় কেন সব ক্ষেত্রেই একজন কেন্দ্রীয় চরিত্রকেই প্রয়োজন পড়ছে! একটি দলকে ভোটার যখন সমর্থন করে, সেই দলের সর্বোচ্চ নেতানেত্রীকেই সে পছন্দ করে। তাঁকে দেখে ভোট দেয়। তাঁকে
কেন্দ্র করে চর্চা করে। একজন ব্যক্তি সব সমস্যার সমাধান করে দেবে বলে বিশ্বাস করে। লার্জার দ্যান লাইফ হিসেবে নিজের পছন্দের নেতানেত্রীকে দেখতে পছন্দ করে।
অথচ কী আশ্চর্য? নায়কহীন সরকার দেশের ভাগ্যই বদলে দিতে পারে কখনো-সখনো? নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী। মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী। কেউ নায়ক ছিলেন না। এমনকি সরকারও ছিল সংখ্যালঘু। অথচ স্বাধীন ভারতে ইতিহাসে অর্থনীতি ও সমাজের দিশা বদলে দিয়েছিলেন এই দুজনই।