রাতে শুতে যাওয়ার আগে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মুখে ক্রিম ঘষতে ঘষতে মিনু বলল, ‘তাহলে কী ভাবলে?’ মিনুর এই ধরনের আলটপকা মুখবন্ধগুলোর সঙ্গে দিগন্ত পরিচিত। এর আগে এমন গুগলি বল সামলাতে না পেরে সে ক্লিন বোল্ড হয়েছে। তাই এবার সে সতর্ক। স্টেপ আউট করে না মেরে একটু ডিফেনসিভ মোডে দিগন্ত বলল, ‘পকেটে পয়সা না থাকলে ভাবনায় লাগাম দিতে হয় ম্যাডাম’! চতুর মিনু পতি পরমেশ্বরের দিকে তাকিয়ে একবার মেপে নিল, তারপর বলল, ‘জীবনে আনন্দ পেতে জানাটা একটা কৌশল মশাই। সব আনন্দ উপভোগ করতে টাকা লাগে না।’ খুব সন্তর্পণে এগতে চাইছে মিনু। দিগন্তও সতর্ক। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর মিনু বলল, ‘যাক গে এবার তাহলে আমার অ্যাওয়ে ম্যাচ। গতবার আমার মাঠে হোম ম্যাচ হয়েছিল, তুমি গোহারা হেরেছিলে। মনে আছে তো? এবার ম্যাচ কিন্তু তোমার মাঠে।’
মিনুর কথার মানে দিগন্ত খুঁজে পেল না এবং যথারীতি বল না বুঝে খেলতে গেল। ‘অ্যাওয়ে ম্যাচ মানে? এটা কি আইপিএল নাকি?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এটা আমাদের আইপিএল ম্যাচ। মানে ইন্ডিভিজুয়াল পাওয়ার প্লে লিগ।’
দিগন্ত কী বলবে, কথাই খুঁজে পেল না। তবু মিনুর সামনে মেনি বেড়ালের মতো কুঁই কুঁই করে বলল, ‘পাওয়ার প্লে মানে তো তোমার মনোপলি পাওয়ার অ্যাপ্লাই। এই খেলায় কোনও আম্পায়ার নেই এবং থার্ড আম্পায়ারও নেই। আমি কোনও ডিআরএস নিতে পারব না। তুমি একাই শুধু ফ্রি হিট মারবে।’
‘ওসব জানি না। অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে রেডি হও।’
দিগন্ত বলল, ‘সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু অ্যাওয়ে ম্যাচ মানে কী?’
‘বেশ আমি তোমায় স্পষ্ট করে বলছি।’ বিছানায় দিগন্তর পাশে এসে বসল মিনু। হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘কাজের কথার সময় একদম ফেসবুকবাজি করবে না। যা বলছি শোনো। গত বছর নববর্ষ পালনের যাবতীয় কাজকর্ম আমিই সামলেছিলাম। আফটার অল প্রতি বছর আমিই সামলাই। তুমি আমায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছিলে, আমি নাকি বাঙালি রান্না করতে পারব না। করে দেখিয়ে দিয়েছিলাম তো?’
মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব এনে দিগন্ত বলল, ‘দেখিয়েছিলে বটে, তবে টুকলি করা রান্না।’
ভুরু কুঁচকে মিনু বলল, ‘টুকলি করা মানে!’
‘ওই তো ইউটিউব খুলে বেমালুম একের পর এক রান্না টুকে মেরে দিলে।’
‘ঠিক আছে এবছর তোমাকে চান্স দিচ্ছি ইউটিউব দেখে আমার মতো বানিও তো? আমি করেছিলাম লাউ ঘণ্ট, এঁচোড় রসা, থোড়-কিমা, চিতলের মুইঠ্যা, ছানার পায়েস। আঙুল চেটে চেটে তো আঙুলে হাজা পড়ে গিয়েছিল। এখন বেসুরো গাইছ! এবছর তুমি সব সামলাবে। হালখাতার পুজো থেকে রান্নাবান্না। তবে তোমাকে খুব সহজ রান্নাই দেব। ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন আর ভেটকির পাতুরি। করে দেখাও তখন বুঝব।’
এবার দিগন্ত ব্যাক গিয়ার মারতে শুরু করল। সে বলল, ‘তার মানে আমার দোকান, ব্যবসার কী হবে?’
‘ওসব আমি জানি না। তোমার মিষ্টির দোকানের ওইসব অমিত্তি, গজা আর রসকদম্বের গল্প আমি শুনব না।’
‘আরে শোনো না। পয়লা বৈশাখের দিন প্রায় দু’হাজার মিষ্টির প্যাকেটের অর্ডার আসতে পারে। ক্লায়েন্ট প্রাথমিকভাবে কথা বলে গেছে।’
বেপরোয়া ভাব এনে মিনু বলল, ‘তোমার দোকানে সব মিলিয়ে ১২-১৪ জন কাজ করে, এবার ওরাই সব সামলাবে। তাছাড়া তুমি আগের দিন সবকিছু ঠিক করে আসবে। মনে আছে, এবছর নারী দিবসের দিন হা হুতাশ করে বলেছিলে— হায় রে পুরুষ, তোদের জন্য একটা দিবসও নেই। এবারের পয়লা বৈশাখটা পুরুষ দিবস হিসেবেই পালন কোরো। আমি সারাদিন ‘খেলো খেলো, আই অ্যাম ওয়াচিং’ মুডে থাকব।’
গত দশ বছর ধরে ওদের সংসারের আইপিএল ম্যাচ চলছে। সিঁদুরদানের লগ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল একতরফা পাওয়ার প্লে। আজ পর্যন্ত মিনুর বাক্যবাণের পাওয়ার সামলাতে পারেনি দিগন্ত। হেরে গেলেই দিগন্ত এসকেপিস্টের মতো বাথরুমে ঢুকে জোরে জোরে গান গায়, ‘হার মানা হার পরাব তোমার গলে’। ওটাই যেন তার আত্মগোপনের পার্মানেন্ট প্যাভিলিয়ন। বাইরে থেকে মিনু শোনে আর তৃপ্তির হাসি হাসে। দিগন্ত ভালোমতোই জানে, কী হোম ম্যাচ, কী অ্যাওয়ে ম্যাচ, সবতেই ওর হার অবধারিত! মিনু পারিবারিক আইপিএল ম্যাচে বল বা ব্যাট যাই করুক না কেন, হারের পরিবেশ দেখলেই নবরস মিশিয়ে দেয়। কখনও ভয় দেখিয়ে, কখনও চোখে জল এনে করুণ রসের মাধ্যমে, কখনও আবার অনশনে বসার হুমকি দিয়ে। মাঝে মাঝে মিনুকে তার মনে হয় মাওবাদী, থুড়ি ম্যাওবাদী। নিজের ম্যাও আদায়ের জন্য প্রয়োজনে পতিবাবুর মাইন্ড বিস্ফোরণ করতেও সে পিছপা হয় না। এ যেন তার কাছে এক পতিপীড়ন মিশন।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর দিগন্তের তেরো পার্বণে সাড়ে বত্রিশ আতঙ্ক। সেই তেরো পার্বণের শুরু বাংলা নববর্ষ দিয়ে। বৈশাখ এলেই মিনু গুনগুন করে গান ধরে, ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। দিগন্তের কাছে তো বৈশাখ আবাহনের নয়, বিসর্জনের। দিগন্ত এতদিনে ভালোই বুঝেছে, বৈশাখ এলেই তার বুক করে দুরু দুরু কারণ নানা পার্বণে টাকা খসানোর সময় হয়েছে শুরু। আত্মরক্ষায় তৎপর দিগন্ত কোনওরকমে মিনমিন করে বলল, ‘এরকম করলে আমার ব্যবসা চৌপাট হয়ে যাবে।’
মিনুও নাছোড়। নিরুপায় হয়ে দিগন্তকে চ্যালেঞ্জ নিতেই হল। সে নিজেকে অকুতোভয় প্রমাণ করতে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়। আমাদের কলেজ হস্টেলে যতবার পিকনিক হয়েছে, ততবার আমিই রান্না করেছি। দেখিয়ে দেব।’
‘ধুস, তোমাদের হস্টেলের পিকনিক মানে তো খিচুড়ি আর ডিম ভাজা।’
রুখে দাঁড়াল দিগন্ত। ‘বাজে কথা বোলো না, একবার পোলাও আর বিরিয়ানিও বানিয়েছিলাম।’
‘সে গল্প তো শুনেছি, পোলাও পুরো সিদ্ধ গলা ভাত হয়ে গিয়েছিল। পরে পান্তা পোলাও খেয়েছিলে।’
‘না, না, সেটা ফার্স্ট ইয়ারের গল্প বলছ।’
‘বুঝেছি। তার মানে কলেজে ইয়ার যত বেড়েছে, রান্নার ইয়ার্কি ব্যাপারটা তত কমেছে। এখন তোমার রান্নায় একটা কমার্শিয়াল অ্যাফ্লুয়েন্স এসেছে মনে হয়। সেটাই এবার নববর্ষে প্রমাণ হয়ে যাক।’
‘ঠিক আছে, দুটো একেবারে সামলাতে পারব না। তুমি সকালের পুজোটা সামলে নিও, আমি রান্না করে তাক লাগিয়ে দেব।’
‘কী খাওয়াবে?’
‘যা বলবে। বাঙালি, চাইনিজ, বার্বাডোজ, তুর্কমেনিস্তান, কিরঘিজস্তান, হন্ডুরাস, মন্টেনেগ্রো যেখানকার খাবার খেতে চাও, খাইয়ে দেব।’
‘বুঝলাম, মুখে মারিতং জগৎ। তবে তোমাকে ইন্টারন্যাশনাল ডিশ বানাতে বলছি না। বাঙালিয়ানার কথাও বলছি না। বছরের প্রথম দিনটা সামলাতে গিয়ে লেজে গোবরে হয়ে যাও, সেটা আমি চাই না।’
‘সেরকম হলে তো তোমারই লাভ। শোনোনি, গোবর থেকে সোনা পাওয়া যায়, তেমন হলে গোবরের সেই সোনা দিয়ে সাতনরি হার বানিও।’
নববর্ষের দিন দিগন্ত একেবারে ঘেমে নেয়ে একশা। একদিকে ওর রান্নার ব্যবস্থা, অন্যদিকে দোকান থেকে বারবার ফোন আসে। ‘ও দাদা, কাজু বরফি, আম্রপালি, চন্দ্রপুলি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’ ‘দাদা, কানাইদাকে ছানা পাঠাতে বলে দিন না!’ আবার একটু পরে দোকান থেকে ফোন, ‘দাদা আরও দেড়শো প্যাকেটের অর্ডার এসেছে। রাধাবল্লভী আলুর দম, গজা আর অমিত্তির প্যাকেট হবে। নেব?’ একটু পরেই ভাদুর ফোন, ‘দাদা, পার্টি বলছে আলুর দমে একটু বেশি নুন হয়ে গিয়েছে। কী করব?’
পরক্ষণেই সুধাময়ের ফোন, ‘দাদা, দরবেশটা একটু নরম হয়েছে, পাকানো যাচ্ছে না, কী করব?’
চিলি চিকেনে তখন সয়াস্যস আর ভিনিগার ঢালছিল দিগন্ত। ফোন পেয়ে তার মাথা গরম। চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কী আর করবে, সবাই মিলে গায়ে দরবেশ মেখে দোকানে বসে থাকো।’ মেজাজ গরম থাকায় হড়হড় করে অনেকটা সয়াস্যস আর ভিনিগার পড়ে গেল চিলি চিকেনে। যাঃ!
এইসব করতে গিয়ে রান্নার চোদ্দো অবস্থা হল। সব কিছু আড়ে আড়ে দেখছিল মিনু। এগিয়ে এসে বলল, ‘মুরোদ জানা আছে। আমার সঙ্গে খেলতে এসো না। অনেক হয়েছে। আধঘণ্টা অপেক্ষা করো। আমি অনলাইনে লাঞ্চের
অর্ডার দিচ্ছি।’
দিগন্ত যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে বলল, ‘সেই ভালো।’ বলেই পাঞ্জাবি গলিয়ে দোকানের দিকে ছুট মারল।
এক্ষুণি গিয়ে সামলাতে না পারলে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।
মিনু বলল, ‘এক্ষুণি চলে এসো কিন্তু, একসঙ্গে বসে খাব আর আরও ঝগড়া করব। এখনও আইপিএল ম্যাচ শেষ হয়নি, ইনিংস ব্রেক হল মাত্র।’
সন্দীপন বিশ্বাস