আতশকাচের সঙ্গে সকলেই পরিচিত। বস্তুকে বড়ো করে দেখায় এই কাচ। কীভাবে আবিষ্কার হল আতশকাচ, সেই গল্পই বললেন কল্যাণকুমার দে।
আতশকাচের সঙ্গে সকলেই পরিচিত। বস্তুকে বড়ো করে দেখায় এই কাচ। কীভাবে আবিষ্কার হল আতশকাচ, সেই গল্পই বললেন কল্যাণকুমার দে।
তশকাচ বা ম্যাগনিফাইং গ্লাস আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কাজে লাগে। আতশ বা আতশি ফার্সি শব্দ। যার মানে ‘আগুন’। সাধারণত আমরা যাকে ‘আতশবাজি’ বলি। এর মানেটা এখন নিশ্চয়ই সহজে বোঝা যাচ্ছে। যারা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে তাদের কাছে আতশকাচ খুবই আকর্ষণীয় একটি বস্তু। খুব ছোটো অক্ষরগুলোকে বড়ো করে দেখতে আমরা সাধারণত আতশকাচ ব্যবহার করি। ঘড়ি সারাইয়ের কারিগররা সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ বড়ো করে দেখতে লেন্স ব্যবহার করেন। এই বিশেষ কাচ আবিষ্কার মানব সভ্যতার জ্ঞানবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই আবিষ্কার মানুষের জ্ঞানকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র থেকে শুরু করে দূরবীক্ষণ যন্ত্র পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তকারী। অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান যেমন অচল, তেমনই দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রসারলাভ সম্ভব হত না। আতশকাচের সাহায্যে সূর্যের আলোকরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে আগুন জ্বালানো যায়। এটি একটি উত্তল লেন্স। আসলে সূর্যের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া আলোকরশ্মির অভ্যন্তরে সমান্তরাল আলোকরশ্মি উত্তল লেন্সের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পথে একত্রিত গুচ্ছরশ্মিতে পরিণত হয়ে একটি আলোকবিন্দু সৃষ্টি করে। আলোকরশ্মি যে তাপ বহন করে, সেগুলোও আতশকাচ বা ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ভেতর দিয়ে গিয়ে একটা নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হয়। ফলে ওই জায়গাটা ক্রমশ গরম হয়ে ওঠে এবং একসময় আগুন ধরে যায়। আতশকাচ ও সূর্যের আলো ব্যবহার করে খেলনা বন্দুকের ক্যাপ ফাটানো বা ধুনুচিতে আগুন ধরানো সম্ভব। জ্যোতিষীরা আতশকাচের সাহায্যে হাতের রেখা পর্যবেক্ষণ করেন এবং মানুষের সম্ভাব্য ভাগ্য নির্ধারণ করেন। বৃদ্ধ বা দুর্বল দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষেরা যে চশমা ব্যবহার করেন, তার মূলেও রয়েছে আতশকাচের ব্যবহার। ক্যামেরা দিয়ে আমরা যে ছবি তুলি, তাতেও লাগে লেন্স।
আতশকাচের আবিষ্কারের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং কৌতূহল উদ্দীপক। এটা একদিনে আবিষ্কার হয়নি। বরং হাজার হাজার বছরের গবেষণার ফসল। আতশকাচের কাহিনি গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের সঙ্গে জড়িত। যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগের ঘটনা। ইতালির সিসিলি দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে ছিল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর সাইরাকিউস। সিসিলি হল ভূমধ্যসাগরের সর্ববৃহৎ দ্বীপ। সিসিলি রাজ্যের অধিকাংশ ভূমি মাউন্ট এটনার, যা ইউরোপের সবচেয়ে উঁচু ও সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। সিসিলির রাজা ছিলেন হায়রো। সুখে শান্তিতে দেশ চালাচ্ছিলেন। রাজা হায়রো একদিন খবর পেলেন যে, রোমানরা তাঁর রাজ্য আক্রমণ করার জন্য সমুদ্রপথ দিয়ে আসছে। রাজার না ছিল অস্ত্রবল, না ছিল সৈন্য। তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন। কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, কীভাবে দেশ ও দেশবাসীকে বাঁচাবেন। অস্থির রাজার মনে পড়ল তাঁর বন্ধুর কথা। রাজার বন্ধু সে যুগের প্রখ্যাত গণিতবিদ, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত আর্কিমিডিস। সাইরাকিউজ নগরীতেই আর্কিমিডিস জন্মগ্রহণ করেন। আর্কিমিডিস বন্ধু রাজার ডাকে হন্তদন্ত হয়ে চলে এলেন রাজদরবারে। রাজা তাঁর বন্ধুকে বিপদের কথা সব খুলে বললেন। রাজার কথায় আর্কিমিডিস শুরু করলেন গবেষণা। অক্লান্ত পরিশ্রম করে আবিষ্কার করলেন এক যুগান্তকারী মারণাস্ত্র। আর্কিমিডিস সমুদ্রের পাড়ে একাধিক বড়ো বড়ো আতশকাচ অর্ধচন্দ্রাকারে সাজিয়ে সূর্যের রশ্মিকে একত্রিত করে রোমানদের যুদ্ধজাহাজের পালে আগুন ধরিয়ে দিলেন। রোমান সৈন্যরা খুব ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলেন। এইভাবে আতশকাচের সাহায্যে দেশ ও সিসিলিবাসীকে বাঁচালেন।
যদিও এই কাহিনিটি পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, বরং বিজ্ঞান আর বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল শত্রুসেনাকে পরাস্ত করার একটি প্রতীকী কাহিনি হিসাবে পরিচিত। তবুও আর্কিমিডিসের এই উদ্ভাবন ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত প্রচলিত কাহিনি। ইতালির জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এই আতশকাচ লম্বা চোঙের মতো একটা নলের দুই মাথায় বসিয়ে দূরের জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণ করে মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা পালটে দিলেন। অন্যদিকে অ্যানটন ভন লিউয়েনহক আতশকাচ দিয়ে বানিয়ে ফেললেন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। যা খালি চোখে দেখা যায় না, এমন ক্ষুদ্র বস্তুকে খুব বড়ো করে স্পষ্টভাবে দেখা যেতে লাগল। সেই থেকেই জীববিজ্ঞানের অজস্র রহস্যকে উদঘাটন করা সহজ হয়েছিল।
আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরে কাচের মতো স্বচ্ছ স্ফটিক দিয়ে তৈরি লেন্সের ব্যবহার ছিল। তবে তা আজকের মতো উন্নত ছিল না। ঐতিহাসিকরা মনে করেন রোমান সম্রাট নিরো গ্লাডিয়েটরদের লড়াই দেখার জন্য এক ধরনের স্বচ্ছ পান্না ব্যবহার করতেন, যা অনেকটা লেন্সের মতো কাজ করত। ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপে একধরনের রিডিং-স্টোন বা পাথর জনপ্রিয় ছিল। এটি ছিল মূলত মাঝখানে মোটা ও দুই পাশে সরু একখণ্ড স্বচ্ছ পাথর। বইয়ের লেখার উপর ধরলে অক্ষরগুলোকে দেখাত। এটিই ছিল আজকের আতশকাচের আদি রূপ।
আতশকাচকে বিজ্ঞানের তকমা দেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইংরেজ বিজ্ঞানী রজার বেকন। ১২৬৮ সালে রজার বেকন আতশকাচ তৈরি করেছিলেন। এজন্য তিনি ব্রিটেনের প্রথম বিজ্ঞানী হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। আরব বিজ্ঞানীদের গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় বেকনের আতশকাচ। তিনি প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা করেন যে, কাচকে নির্দিষ্ট আকারে কাটলে তা আলোর প্রতিসরণ ঘটিয়ে বস্তুকে বড়ো করে দেখাতে পারে। তাঁর এই উদ্ভাবন মূলত দুর্বল দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে আসে। এরপর থেকে ইতালিতে প্রথম চশমা তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৬০০ সালের দিকে ওলন্দাজ চশমা বিক্রেতারা একাধিক লেন্স একসঙ্গে ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেই সময় জন্ম নেয় টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ।