বিজেপির দুই দিকপাল নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বড়োই পছন্দের শব্দ ‘ঘুসপেটিয়া’। বাংলা করলে দাঁড়ায় অনুপ্রবেশকারী। চলতি বিধানসভার ভোটে এই হিন্দি শব্দবন্ধ যে বাঙালির ঘরে জায়গা করে নিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘুসপেটিয়ার জুজুকে প্রায় ‘থিম সং’-এর মতো করে আওড়ে চলেছেন গেরুয়া শিবিরের নেতারা। চলতি মাসে যে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোট, তার মধ্যে কেরলম, পুদুচেরি ও তামিলনাড়ুতে অনুপ্রবেশের সমস্যা কার্যত নেই। বাকি দুই রাজ্য অসম ও পশ্চিমবঙ্গে আগত ‘অনুপ্রবেশকারীরা’ মূলত বাংলাভাষী এবং অনেকেই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের। এদের দেশছাড়া করার বার্তা দিতে চলতি বিধানসভা নির্বাচনকেই হাতিয়ার করেছে কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী। রাজ্যের কোণে কোণে বিজেপি-আরএসএস-এর প্রচার চলছে, পশ্চিমবঙ্গকে নাকি কবজা করে নিচ্ছে মুসলিমরা। হিন্দু বাঙালিরা ফের উদ্বাস্তু হয়ে যাবে! ইত্যাদি। সংখ্যালঘু জুজু দেখিয়ে হিন্দুদের বলা হচ্ছে, বিজেপি না জিতলে সব নাকি খতম হয়ে যাবে। রাজ্যের এক দলবদলু নেতার হুঁশিয়ারি ছিল, বাংলার ভোটার তালিকায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মুসলিম, রোহিঙ্গা রয়েছে। এঁদের তাড়ানো হবে। খোদ অমিত শাহ মমতা সরকারের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ পেশ করতে গিয়ে বুঝিয়েছেন, এই ঘুসপেটিয়া এবারের ভোটে বড়ো ইস্যু। তারা ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধান করে ফেলবেন। প্রশ্ন হল, এতদিন করেননি কেন? অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করছেন, এটি সবচেয়ে বড়ো সমস্যা, এর ফলে সীমান্ত জেলাগুলির জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীরা বাংলার লোকেদের কাজ-মাটি সব ছিনিয়ে নিচ্ছে।
সন্দেহ নেই, এদেশে অনুপ্রবেশ একটা সমস্যা এবং তা দীর্ঘকালের। পড়শি রাষ্ট্র থেকে বেআইনিভাবে এদেশে ঢুকে পড়লে তাকে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোই যেকোনো সরকারের আশু দায়িত্ব হওয়া উচিত। ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার অঞ্চলে এখনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। বলাই বাহুল্য, এই দীর্ঘ এলাকাই অনুপ্রবেশকারীদের কাছে মুক্তাঞ্চল। কিন্তু সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিএসএফ-এর চোখকে ধুলো দিয়ে একজন ব্যক্তিও কী করে পশ্চিমবঙ্গে, অসম বা ত্রিপুরায় ঢুকে পড়ছে— তার সুস্পষ্ট জবাব দেওয়ার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরই। কারণ, অনুপ্রবেশের প্রধান দায় বিএসএফ-এরই। অমিত শাহ এর দায় ঢোঁক গিলে কিছুটা স্বীকার করে নিয়েও অভিযোগ করেছেন, অনুপ্রবেশকারীরা যেভাবে ভোটার কার্ড পেয়ে যাচ্ছেন, তাতে রাজ্য সরকারের ভূমিকাই নাকি প্রধান! এই অভিযোগের পালটা অভিযোগ হল, অনুপ্রবেশকারীরা অনেক সহজেই কী করে আধার কার্ড পেয়ে যাচ্ছে? অনুপ্রবেশকারীর কাছে পাসপোর্টও বিরল নয়। আর নাগরিকত্ব প্রমাণের এমন সব তথ্য হাতে থাকলে ভোটার কার্ড বা রেশন কার্ড পাওয়া যে খুব কষ্টসাধ্য নয় তা সকলেই বোঝে।
আসলে প্রশ্ন অনুপ্রবেশকারী আছে কি নেই তা নিয়ে নয়। এই ইস্যুতে মোদি-শাহরা যে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন, তা বিপজ্জনক। উপরন্তু জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার দাবি শুধু অসত্য নয়, একটা অংশের মানুষকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টাও, যা রীতিমতো অন্যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্যই বলছে, দেশে ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী, ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৭.৭ শতাংশ হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা ১৩.৯ শতাংশ। আবার বাংলায় যেসব জেলায় মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রাজ্যের গড়ের চেয়ে বেশি, সেখানে হিন্দুদের বৃদ্ধির হারও বেশি। তার মানে, বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক অনুপ্রবেশ হলে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হিন্দুদের থেকে বেশি হত। গোটা দেশের ছবিটাও হল, গত চল্লিশ বছরে হিন্দুদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে ৬ শতাংশ, মুসলিমদের ৯ শতাংশ। সন্তান সম্ভাবনার হার (ফার্টিলিটি রেট)-এর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ২.১, মুসলিমদের ২.৬, খ্রিস্টানদের ২। যে অনুপ্রবেশ নিয়ে ‘ঘৃণার’ প্রচার চলছে, গবেষণায় তা বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, ৯৯ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক এ দেশেই জন্মেছেন। ভারতে যতজন বাইরে থেকে আসছেন, তার তিনগুণ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। চোখ ঘোরানো যাক সংসদে পেশ করা রিপোর্টের দিকে। দেখা যাচ্ছে, মোদি জমানায় গত বারো বছরে বাংলাদেশ সীমান্তে ৮৬৩২টি অনুপ্রবেশ আটকানো গিয়েছে। এই সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ২১ হাজার ৪০৭ জন। কেন্দ্রের দেওয়া এই তথ্য কি সীমান্তের জেলাগুলিতে জনবিন্যাস বদলে দিতে পারে? বিজেপির ঘোষিত প্রচার হল, রাজ্যে রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ‘পুশব্যাক’ করা হবে। কিন্তু বিহারে এসআইআর-এর পর অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা আজও জানাতে পারেনি কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গেও এসআইআর-এ এখনও পর্যন্ত কত অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পাওয়া গেল— তারও কোনো হিসাব নেই! এর আগে অসমে ৬৪ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী থাকার গল্প শোনানো হলেও একটি বড়ো ডিটেনশন ক্যাম্পে এখন রয়েছেন মাত্র ১১ জন। আসলে এসব উপলক্ষ। আসল লক্ষ্য সংখ্যালঘুদের বিতাড়িত করে হিন্দুরাষ্ট্র গঠন। তাই গল্পের গোরু মগডালে উঠলেও বাস্তব অন্য কথা বলছে।