সৌমিত্র দাস, কাঁথি: বর্তমানে অর্কেস্ট্রা, নাচের অনুষ্ঠানের দাপট চলছে। তার উপর টেলিভিশনের মেগা সিরিয়াল অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইউটিউব সহ নানা মাধ্যমের রমরমা। রকমারি আলো, বাদ্যযন্ত্র, ঝকমকে সাজপোশাক, সময়পোযোগী চিত্রনাট্য রয়েছে ঠিকই। কিন্তু যাত্রার সেই রমরমা আজ নেই। গ্রাম্য সংস্কৃতির অঙ্গ এবং বাঙালির বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম এই আঞ্চলিক শিল্প লড়াই করেই টিকে রয়েছে। করোনা-পরিস্থিতিতে যাত্রাশিল্প অনেকটা ধাক্কা খেয়েছিল। এতকিছুর পরও যাত্রার প্রতি একটা অংশের মানুষের টান রয়েছে। তাই তো আজও যাত্রা হলে মানুষের কমবেশি ঢল নামে। তাঁদের জন্যই যাত্রাশিল্প টিকে রয়েছে। রঙিন বিনোদনের মাঝেও আস্তে আস্তে করে যাত্রাশিল্পের সুদিন ফিরছে, বলছেন যাত্রার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন এবং যাত্রানুরাগীরা। এখনও গ্রামেগঞ্জে পুজো উপলক্ষ্যে যাত্রার আসর বসে। বিশেষ করে ফাল্গুন থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত গ্রাম্য পুজোপার্বণ উপলক্ষ্যে বসে যাত্রাপালার আসর। পুজোর মরশুম তো রয়েছেই।
রথযাত্রার সময় থেকেই পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমার, পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা সহ বিভিন্ন বুকিং অফিসে যাত্রার বায়না শুরু হয়ে যায়। রথযাত্রা দেখে বায়না করতে যান পুজো কমিটির লোকজন বা ‘নায়েক’রা। বায়নার জন্য বুকিং অফিস খুলে বসে থাকেন পরিচালকরা। সেখানে বিভিন্ন যাত্রাপালার পোস্টার ঝুলিয়ে রাখা হয়। এখন থেকেই তার প্রস্তুতি চলছে।
এখন অনুষ্ঠান হলেই অর্কেস্ট্রার আয়োজন থাকবেই। অনেক পুজো কমিটির কর্তা যাত্রানুষ্ঠানের বায়না করেন। আবার অনেকে এর ধারেকাছেই যান না। আগের মতো জনপ্রিয়তা নেই। কিছু অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা যাত্রাপালার আয়োজন করলেও অভিনয় শেষে অনেকের নানা বাহানা থাকে। ‘ভৃত্যের রোল ঠিক হয়নি’। ‘নায়ক একটু সুদর্শন হলে ভালো হতো’। ‘নায়িকা ভালো নয়’-এরকম নানা অছিলায় টাকা কমানোর চেষ্টা করে কমিটিগুলি। এগরার নামী ঘোষক হরিপদ পণ্ডা বলেন, আরও একটা সমস্যা হল, যাত্রার জন্য কলাকুশলী পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ বর্তমানে নাটক, অ্যামেচার যাত্রা কমে গিয়েছে। প্রযোজকরা চলচ্চিত্র তারকাদের এনে অভিনয় করাচ্ছেন বটে, কিন্তু মানুষ সেটা বেশিদিন নিচ্ছে না। যাত্রানুরাগী মানুষজন পুরনো দিনের মঞ্চ কাঁপানো কলাকুশলী খোঁজেন। এখানে একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। নানা কারণেই যাত্রার পরিচালক বা প্রযোজকরা আর্থিকভাবে মার খান।
তবুও যাত্রার প্রতি মানুষের আগ্রহকে সম্বল করেই যাত্রাশিল্প একটা জায়গা ধরে রেখেছে। পাশের জেলা পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদায় বুকিং অফিস একশো বছরেরও বেশি। এখানে পশ্চিম মেদিনীপুর তো বটেই, পূর্ব মেদিনীপুর থেকে বুকিং করতে যান নায়েকরা। একটি বুকিং অফিসের পরিচালক চন্দন জানা বলেন, রথযাত্রার দিন বুকিং শুরু হয়। ওইদিনই পাঁচ-সাতটা বুকিং হয়ে যায়। ভগবানপুরের ‘উদবাদাল সপ্তরথী যাত্রাসমাজ’-এর পরিচালক সন্দীপ মাইতি বলেন, যাত্রার প্রতি বহু মানুষের টান রয়েছে। বছরে ২০-২২টা বায়না হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরেই অ্যামেচার যাত্রায় অভিনয় করছেন ভগবানপুর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অরূপসুন্দর পণ্ডা। তিনি বলেন, যাত্রা গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। অর্কেস্ট্রা সহ অন্যান্য জমকালো বিনোদনের রমরমার জন্য যাত্রাশিল্প পিছিয়ে পড়েছিল। আবার মানুষ যাত্রা পছন্দ করছেন। যাত্রা দেখতে ভিড় বাড়ছে। রাজ্য সরকার যাত্রাশিল্পের পুনরুজ্জীবনে এবং আগ্রহ বাড়াতে যাত্রা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। ভগবানপুর-২ ব্লকের পাঁউশির বাসিন্দা বিষ্ণুপদ ভুঁইয়া, প্রশান্ত মাইতি বলেন, আগের মতো যাত্রার জনপ্রিয়তা নেই ঠিকই তবে আমরা দেখতে ভালোবাসি। অদূর ভবিষ্যতে আগের মতো যাত্রাশিল্প জনপ্রিয় হবে, আমরা আশাবাদী।