Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

তৃতীয় লিঙ্গের বলে অপমান, মূর্তি গড়া নিজেই শিখলেন বনগাঁর বর্ষা

শিল্পসামগ্রীর উপর ঝোঁক দেখা দিয়েছিল ছোটবেলাতেই। নিজে নিজেই মাটি দিয়ে বানাতেন পুতুল।

তৃতীয় লিঙ্গের বলে অপমান, মূর্তি গড়া নিজেই শিখলেন বনগাঁর বর্ষা
  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, বনগাঁ: শিল্পসামগ্রীর উপর ঝোঁক দেখা দিয়েছিল ছোটবেলাতেই। নিজে নিজেই মাটি দিয়ে বানাতেন পুতুল। একটু বড় হয়ে কুমোরঘরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। দূর থেকে দেখতেন মৃৎশিল্পীর ঠাকুর গড়া। একজনের কাছে গিয়েও ছিলেন কাছ শিখতে। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের কারও ছোঁয়া থাকলে কেউ ঠাকুর নেবে না বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন ওই শিল্পী। অপমানিত হয়ে ফিরে আসেন বর্ষা মণ্ডল। তবে জেদ ছাড়েননি। নিজেই শুরু করেন ঠাকুর গড়া। সেই বর্ষা এখন পুরোদস্তুর শিল্পী। তাঁরই হাতের ছোঁয়ায় সেজে উঠছেন দেবী দুর্গা। 

Advertisement

স্কুলেই পড়তে পড়তে পড়াশোনাকে ইতি জানিয়ে বাড়িতে ঠাকুর তৈরি শুরু করেছিলেন বনগাঁ থানার সভাইপুর মেদের মাঠের বাসিন্দা বর্ষা। কিন্তু এখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ান পাড়া প্রতিবেশীরা। কটূক্তি করতেন। অপমানে জর্জরিত বর্ষা কাজ ছেড়ে দেন। কিন্তু শিল্পী হওয়ার তাগিদ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। একদিন ফের হাতে তুলে নেন খড়-মাটি। আবার ঠাকুর তৈরি শুরু। একটি দোকান ভাড়া নেন। গতবছর থেকে সেখানেই বানাচ্ছেন প্রতিমা। এবছর প্রথম দুর্গা বানালেন। কারখানায় তৈরি করেছেন চারখানি দুর্গামূর্তি। ‘সবকটির বায়না হয়ে গিয়েছে’-হাসিমুখে বললেন বর্ষা। 
কাঠামো তৈরি, বিচুলি বাঁধা, মাটি লেপা থেকে চক্ষুদান, বর্ষা সবকিছু নিজের হাতেই করেন। আর তাঁকে সাহায্য করেন বৃদ্ধা ঠাকুমা। এই মৃৎশিল্পী প্রথমে প্লাস্টার অব প্যারিস দিয়ে কালী, সরস্বতী, দুর্গার মুখের ছাঁচ বানান। তারপর কাঠামো তৈরি করে তৈরি হয় গোটা প্রতিমা। বর্ষা বাসে, ট্রেনে কিংবা লোকের বাড়ি গিয়ে টাকা চাইতে অপছন্দ করেন। তিনি মনে করেন সেটি একপ্রকার ভিক্ষাবৃত্তি। তাঁর জীবনদর্শন হল, ‘ভিক্ষা করতে যেমন দু’টি হাত লাগে। কাজ করতেও তেমন দু’টি হাতই প্রয়োজন। তাহলে ভিক্ষে কেন?’ বর্ষা সংসারে রান্না করেন। বাড়ির মন্দিরে পুজো দেন। মাঠে নেমে বাবাকে চাষের কাজেও সাহায্য করেন। কার্যত জীবন্ত দশভুজার মতো দশহাতে সামলান সবকিছু। বলেন, ‘আমি ভিক্ষা করে কারও সহানুভূতি নিয়ে বাঁচতে চাই না।’ ছোটবেলায় যে শিল্পীর কাছে চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে কেঁদেছিলেন, সে মৃৎশিল্পীকে আজও ভুলতে পারেননি। তবে বর্ষা সে শিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞ। বলেন, ‘ওঁর কাছে অপমানিত না হলে আমার মধ্যে এই জেদ তৈরি হতো না।’ আশা করেন, একদিন তাঁর তৈরি প্রতিমার সুনাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে।  নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ