অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: কেউ পাড়ার রোয়াকে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। কেউ আবার ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে খেলা করছিল। স্কুলে যাওয়ার কথা তারা একরকম ভুলেই গিয়েছিল! আচমকা প্রধান শিক্ষককে আসতে দেখেই দে দৌড়। কেউ কেউ ঘর লাগোয়া দোকানে মুখ লুকানোর চেষ্টা করল। কেউ নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে গেল মাঠ থেকে। সোমবার মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রামে গিয়ে এমনই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন প্রধান শিক্ষক।
স্কুলে পড়ুয়াদের উপস্থিতি বাড়াতে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন প্রধান শিক্ষক প্রসেনজিৎ গুপ্ত। সঙ্গে ছিলেন অন্যান্য শিক্ষকরাও। গ্রামে ঢুকেই তাজ্জব সকলেই। স্কুলে না গিয়ে পাড়ায় আড্ডা মারছে পড়ুয়ারা। বাড়ির পাশের মাঠে চলে গিয়েছে অনেকেই। অগত্যা, অভিভাবকদের পাঠ দিলেন শিক্ষকরা। তাঁদের ছেলেমেয়েরা যাতে নিয়মিত স্কুলে যায়, পড়াশোনার প্রতি যাতে আগ্রহ বাড়ে—এই সব বোঝালেন। অভিভাবকরা সবই শুনলেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁরা কতটা উদ্যোগী হবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।
মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রাম শ্রীযোগাদ্যা বাণীপীঠ স্কুল। মোট পড়ুয়া সংখ্যা ১ হাজার ১০০ জন। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এই স্কুলে ১৬ জন স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন। স্কুলে ১৬০ জন পড়ুয়া জানুয়ারি মাস থেকে মাত্র ১৫ দিন স্কুলে হাজিরা দিয়েছে। কেউ কেউ আবার সরস্বতী পুজোর পর আর স্কুলমুখো হয়নি। তাদের মধ্যে অনেকেই স্কুলের পাশে সতীপীঠ মা যোগাদ্যা মন্দিরের আটচালায় সারাদিন গল্প-গুজবে মশগুল থাকছে। পড়াশোনা করতে হবে, জীবনে বড় হতে হবে, এমন কোনও ইচ্ছাই ওই পড়ুয়াদের মাথাতেই নেই। কাউকে পাড়ায় দেখে পই পই করে বোঝালেন প্রধান শিক্ষক। আবার কাউকে ফোন করে ডাকলেন। বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদেরও বোঝালেন। অন্তত তাঁরা যেন ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি খেয়াল রাখেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রসেনজিৎ গুপ্ত বলছিলেন, ‘সরকার সবকিছু সাহায্যে করছে। একাধিক উৎসাহমূলক স্কলারশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে প্রত্যেকের জন্মদিন পালনের উদ্যোগ নেন শিক্ষকরা। জন্মদিনের উপহারও তুলে দেওয়া হয়। এমনকি, স্কুলে মিড ডে মিল, তিথি ভোজনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও বেশকিছু ছাত্র স্কুল কামাই করে আড্ডা মারছে। মূলত, ওদের স্কুলে ফেরাতেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছি।’ কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট সহ পাঁচ ব্লকেই ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে না যাওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। কেউ কেউ আবার ড্রপ আউট হয়ে যাচ্ছে। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে অনেকে স্কুলে আসছে না। কেউ কেউ অবশ্য কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছে কেরলে। কেউ কেউ আবার একাদশ শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়েই চলে যাচ্ছে ভিন রাজ্যে। মঙ্গলকোটের স্কুলগুলিতে ড্রপ আউটের সংখ্যা কমলেও কামাইয়ের প্রবণতা বেড়েছে। এদিন কৈচর স্টেশনের কাছে পাঁচ আদিবাসী সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদেরও বাড়ি যান প্রসেনজিৎবাবু ছাড়াও শিক্ষক সুজিত ভট্টাচার্য, সুবীর নন্দী, জাহাঙ্গীর মোল্লা। অভিভাবকদের তাঁরা বোঝান, ছেলেমেয়েরা যাতে নিয়মিত স্কুলে যায়। কিন্তু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের কতটা গরজ, সেটাই ভাবাচ্ছে শিক্ষকমহলকে।