সুপ্রিয় নায়েক, ২৩ সেপ্টেম্বর: বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। এমনটাই জানাচ্ছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। ক্রমবর্ধমান আত্মহননের প্রবণতা রোধে ইন্ডিয়ান সাইকিয়াট্রিক সোসাইটি (পশ্চিমবঙ্গ শাখা) এবং ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট সাইকিয়াট্রি (পশ্চিমবঙ্গ শাখা)-এর পক্ষ থেকে যৌথভাবে একটি বিশেষ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল বার্ষিক সম্মেলন ‘সাইকন ২০২৬’। সম্মলনের মূল ভাবনা ছিল, ব্রেন সার্কিটস টু বিহেভিয়ার্স: এক্সপ্যান্ডিং নিউ হরাইজনস। সম্মেলনে আলোচনা হয় আত্মহত্যা করতে চলেছেন এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিপদের লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা, মানসিক সংকটে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তির প্রতি সঠিক প্রতিক্রিয়া জানানো, মানসিক অসুখের সঙ্গে জড়িত কুসংস্কার দূর করা, পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে পেশাদার মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিত্সা পরিষেবা নেওয়ার সুবিধা সহজতর করা।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাচিক শিল্পী ঊর্মিমালা বসু তাঁর আলোচনায় সামাজিক মূল্যবোধের যে ক্রমশ পরিবর্তনগুলি চিহ্নিত করেন। তিনি জানান, আগে মানুষ একে অপরের সঙ্গে একাত্মভাবে বসবাস করতো। এখন বিভিন্ন কারণে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সংখ্যা বেড়েছে। বাচ্চাদের পড়াশোনার চাপে কমেছে মেলামেশা। মধ্যে দূরত্বটা অনেকটাই বেড়ে গেছে। সকলেই সকলকে স্পেস দিতে চাইছেন। ফলে একেকজন মানুষ একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত হয়ে যাচ্ছেন। এই কারণেই যখন আমরা হতাশা বা খুব সিভিয়ার ডিপ্রেশনেরর মধ্যে দিয়ে যাই তখন কোন আমাদের পাশে কাউকে না পেয়ে আমরা আত্মহত্যার কথা ভাবি বা আত্মহত্যা করি।
গায়ক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেলিব্রিটিদের আত্মহত্যা নিয়ে। তিনি জানান, খ্যাতির শীর্ষে থাকার সময় কিছু সেলিব্রিটিদের মধ্যে, তাঁর পুরনো জীবন বা ব্যক্তিগত জীবনে যে একটা মাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রবণতা চলে যায়। একসময় যখন লাইমলাইট থেকে তারা সরে আসেন বা সরে আসতে বাধ্য হন তখন তাদের মধ্যে একটা মারাত্মক হতাশা কাজ করে। তিনি আরও বলেন, পাশের মানুষটা ডিপ্রেশনের মধ্যে থাকলে তাকে শুধুই কথা বলে হতাশা থেকে তুলে আনা সম্ভব নাও হতে পারে। কারো কারো হয়তো সাইকিয়াট্রিক হেল্পও লাগতে পারে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ সব্যসাচী মিত্র। তিনি বলেন, আমরা এখন যে জগতটায় থাকি সেটা একটা টক্সিক ওয়ার্ল্ড এবং ভবিষ্যত ঠিক কেমন সেই বিষয়ে ছেলেমেয়েরা একটা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
ডাঃ জয়রঞ্জন রাম জানান, আমাদের দেশে মারাত্মকভাবে বয়ঃসন্ধিকালে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে। আর এর কারণ মূলত তিনটি। প্রথমটি হল একাডেমিক স্ট্রেস, রোমান্টিক রিলেশনশিপে হতাশা এবং ফিনান্সিয়াল স্ট্রেস। কিন্তু আরও একটা খুব বড় কারণ হল, ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হওয়ার চাপ। বাবা-মা বা শিক্ষকরা ছেলেমেয়েদের জীবনটাকে এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন যে ছেলেমেয়েদের নিজস্ব ইচ্ছে বাসনাগুলো সবসময় পূরণ হয় না। সেখান থেকে একটা চরম হতাশা তাদের মধ্যে আসতে পারে। আবার স্কুল কলেজে একটা নীতি আদর্শ মেনে চলার বিষয়ে পড়াশোনা করলেও জীবনের পথে চলতে গিয়ে দেখি ন্যায় বলে কোন জিনিস নেই! কোশ্চেন পেপার লিক হয়ে যাচ্ছে, খুন, সম্ভ্রমহানির মতো ঘটনা ঘটছে, কিন্তু দোষীরা কোনও সাজা পাচ্ছে না! প্রতিবাদের মুখ বুজিয়ে দেওয়া হচ্ছে! সেখান থেকেও একটা হতাশা জমছে মনে যা থেকে সুইসাইডের জায়গা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া আরও একটা বড় বিষয় হল, আমরা শুধুই সাফল্যের কথা আলোচনা করি। অথচ জীবনে যে হতাশা আসতে পারে, বাধা বিপত্তি আসতে পারে তা একেবারেই ভুলে যাই! তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতেও শিখতে হবে। অনুষ্ঠানের সাংগঠনিক সম্পাদক ডাঃ সৌরভ শংকর কুন্ডু এবং সাংগঠনিক সচিব ডাঃ সৌম্য চট্টোপাধ্যায় জানান, আশা করা যায় আরও বেশি মানুষ সচেতন হবেন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন।