নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ইউনেস্কোর সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ২০২৫ সালে। চুক্তির শর্ত ছিল, দুর্গাপুজো নিয়ে প্রচার করা যাবে, বাণিজ্যিক কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনের সংস্থা মাস আর্ট পুজোর পাস বিক্রির নামে টাকা তুলেছে ২০২২ সাল থেকে। যা দেখে তাজ্জব লালবাজারের সিট। বৃহস্পতিবার ব্যাঙ্কশাল আদালতে এই তথ্যও তুলে ধরেছে তারা। পাশাপাশি মমতা সরকারের আমলে খেলা-মেলার টেন্ডার ঘনিষ্ঠদের পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা কাটমানি পেয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক। লেনদেনের নথি বিশ্লেষণ করে এই প্রমাণ মিলেছে বলে লালবাজার দাবি করেছে। বৃহস্পতিবার ইন্দ্রনীল সেনকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হয়। তাঁকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠায় আদালত। দুর্গাপুজো পাস বিক্রি কাণ্ডে বুধবারই গ্রেপ্তার হন ইন্দ্রনীল সেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে মমতা ঘনিষ্ঠ প্রাক্তন মন্ত্রীকে আদালতে তোলা হয়। বিচারক তদন্তকারী অফিসারের কাছে মামলার বিষয়ে জানতে চান। সিটের তদন্তকারী অফিসার জানান, ২০২২ সাল থেকে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির নাম করে টাকা তুলেছে অভিযুক্তের কোম্পানি মাস আর্ট। ওই পাসে ইউনেস্কোর লোগো লাগানো ছিল। প্রায় এক লক্ষের বেশি পাস বিক্রি করা হয়েছে। ইন্দ্রনীলবাবুর স্ত্রী ওই মাস আর্টের সঙ্গে যুক্ত। সেই সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রী সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের টেন্ডার দিয়েছিলেন একাধিক কোম্পানিকে। সেই দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াতে গরমিল রয়েছে।
এরপরই মুখ্য সরকারি আইনজীবী অভিজিত চট্টোপাধ্যায় বলেন, এই মামলা আসলে প্রতারণা ও জালিয়াতির। ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে পূজোর পাস বিক্রি করে টাকা তুলেছে মাস আর্ট। সরকারি আইনজীবী সওয়াল করতে গিয়ে বলেন, ইন্দ্রনীলের স্ত্রী তথা মাস আর্টের অ্যাকাউন্টে যে দিন টাকা জমা পড়েছে, ওই একই দিনে প্রাক্তন মন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনজনের গোপন জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন . ইন্দ্রনীল সেন সরাসরি এই দুর্নীতিতে যুক্ত। সব তথ্য কেস ডায়েরিতে রয়েছে। তাই জামিনের বিরোধিতা করছি। ইন্দ্রনীলের আইনজীবী বলেন, তাঁর মক্কেল মাস আর্টের কেউ নন। টিকিট বিক্রি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অথচ তাদের এই তদন্তে যুক্ত করা হয়নি। সেই সঙ্গে মাস আর্ট বা টেন্ডার দুর্নীতিতে নাম জড়ানো কোম্পানিগুলির সঙ্গে তিনি যুক্ত নন। দরপত্র লুকিয়ে করা হয়নি।
লালবাজার তদন্তে নেমে জেনেছে, মন্ত্রী থাকাকালীন বইমেলা, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, রেড রোড কার্ণিভাল সহ বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানের টেন্ডার পরিচিত তিনটি সংস্থাকে পাইয়ে দেন ইন্দ্রনীল। এই কোম্পানিগুলির ডিরেক্টররা ছিলেন মাস আর্টের বিভিন্ন পদাধিকারিরা। বাল্যবন্ধুর সংস্থা জিডি ক্রিয়েশনকে ৫৩.৪৬ কোটি টাকার টেন্ডার পাইয়ে দেন প্রাক্তন মন্ত্রী। অথচ বড় মাপের মেলা বা উৎসব আয়োজন করার অতীত অভিজ্ঞতা ছিল না সংস্থার। এই সংস্থা টেন্ডার পাওয়ার পর কাজের দায়িত্ব হস্তান্তর করে থার্ড লাইন ক্রিয়েশন নামে অপর একটি কোম্পানিকে। তাদের অ্যাকাউন্টে ৫০.৩১ কোটি টাকা জমা পড়ে। সেই টাকা থেকে থার্ড লাইন ক্রিয়েশন সরাসরি ১.২৮ কোটি টাকা জমা করে ইন্দ্রনীল সেনের অ্যাকাউন্টে। সেটাই টেন্ডারের ‘কাটমানি’ বলে দাবি সিটের।



