স্বদেশী দুর্গা
  • ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: ‘আনন্দমঠ’-এ ভবানন্দ অশ্রুসিক্ত নয়নে যে মায়ের পরিচয় দিয়েছিলেন, তিনি কেবল দেবী নন—তিনি দেশমাতৃকা। জগদ্ধাত্রী রূপে ‘মা যা ছিলেন’, কঙ্কালমালিনী কালিকারূপে ‘মা যা হয়েছেন’ এবং দশভুজা গৌরী-নারায়ণীরূপে ‘মা যা হবেন’—এই ত্রিরূপে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গজননীর এক মহিমান্বিত প্রতিমা নির্মাণ করেছিলেন। শরতের আগমনি-আবহে নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে বসে তাঁর কলমে জন্ম নেয় ‘বন্দে মাতরম’। ১৮৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তা ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এই গানই বাংলার বিপ্লবীদের প্রধান বীজমন্ত্রে পরিণত হয়।

Advertisement

বঙ্কিমের কল্পনার দেশমাতৃকার মধ্যেই বিপ্লবীরা দুর্গার রাজরাজেশ্বরী রূপে স্বাধীন স্বদেশের প্রতিমূর্তি দেখতে চেয়েছিলেন। শ্রীঅরবিন্দ সেই ভাবনাকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেন ‘ভবানী মন্দির’-এর মাধ্যমে। শিবাজির আদর্শে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে মন্দির-আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে দেশমাতৃকার সাধনায় নিবেদিত কর্মী গড়ে তোলাই ছিল উদ্দেশ্য। ‘No Compromise’-এর আদর্শে আত্মনিয়ন্ত্রণ, শরীরচর্চা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্যরক্ষা ও সমাজসেবার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জনশিক্ষা, গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের পরিকল্পনাও ছিল।
বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এই উদ্যোগকে বাস্তব রূপ দিতে ‘ভবানী মন্দির’ ও ‘No Compromise’ গোপনে মুদ্রণ ও প্রচার করেন এবং বিহারের কাইমুর পাহাড়ে আশ্রমস্থল অনুসন্ধান করেন। প্রতিকূল পরিবেশে স্থায়ী মন্দির সম্ভব না হলেও কলকাতার মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি ও নর্মদাতীরের গণ্ডলনাথ আশ্রমে কর্মীদের শিক্ষার ব্যবস্থা হয়। রক্ষণানন্দের পর কেশবানন্দের তত্ত্বাবধানে শ্রীঅরবিন্দ ও দেশপাণ্ডে সেখানে পাঠশালাও গড়ে তোলেন।
শিবাজির ভবানীকে বাংলার হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীঅরবিন্দ তাঁকে কখনো ঘরের মেয়ে উমা, কখনো শত্রুবিনাশিনী দুর্গারূপে কল্পনা করেছিলেন। বঙ্গভঙ্গের সময় অবনীন্দ্রনাথের ‘বঙ্গমাতা’, ভগিনী নিবেদিতার অনুরোধে ‘ভারতমাতা’ হয়ে ওঠে। তাঁর ‘চক্ষু সংস্কৃতি’র ধারণায় সেই চিত্র দেবী দুর্গার প্রতিচ্ছবি ধারণ করে জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়। ব্রিটিশ শাসনের কঠোর নজরদারির যুগে বাংলার ধর্মীয় উৎসবগুলি কেবল আচার-অনুষ্ঠানের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলি হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের জনসংযোগ, সংগঠন ও দেশাত্মবোধ জাগরণের আড়াল। দুর্গাপুজো ও কালীপুজোর জনসমাগমকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লবীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, গোপন বৈঠক এবং স্বাধীনতার বার্তা প্রচারের সুযোগ পেতেন। দেবীর আরাধনার অন্তরালে গড়ে উঠত আত্মশক্তি, শৃঙ্খলা ও স্বদেশ চেতনার এক নতুন পরিসর।
এই ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলের সিমলা ব্যায়াম সমিতি। বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসু ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শরীরচর্চা, কুস্তি, লাঠিখেলা, ছুরিখেলা ও সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের বীজ বপন করা হয়। সেই বছরই শুরু হয় সমিতির সর্বজনীন দুর্গোৎসব। এখানে দুর্গা কেবল পূজিত দেবী নন—তিনি হয়ে ওঠেন দেশমাতৃকা, শক্তি ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। মহাষ্টমীর বীরাষ্টমী উৎসবে লাঠি, ছুরি ও কুস্তির প্রদর্শন তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা ও সাহসের প্রকাশ ঘটাত। জাতি, ধর্ম ও আর্থিক অবস্থার বিভাজন অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এই উৎসবকে আরও তাৎপর্যময় করে তোলে।
সিমলা ব্যায়াম সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধানচন্দ্র রায়, কিরণশঙ্কর রায়, হেমন্তকুমার বসু, রাজেন দেব, রাধারমণ মিত্র, বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়, মদনমোহন বর্মন ও প্রভুদয়াল হিম্মতসিংকা সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। নারী বিপ্লবীদের মধ্যেও উর্মিলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী গঙ্গোপাধ্যায়, ইলা সেন, শান্তি দাস, আশালতা দাস ও কল্পনা দত্তের মতো ব্যক্তিত্ব এই বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী পরিসরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সমিতির বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে ব্রিটিশ সরকারের সন্দেহ ক্রমশ ঘনীভূত হয়। ১৯৩২ সালের ৪ জানুয়ারি সমিতিকে বেআইনি ঘোষণা করা হলে বন্ধ হয়ে যায় পুজো ও অন্যান্য কার্যকলাপ। প্রায় দুই বছর পর, ৭ অক্টোবর, ১৯৩৪ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে পুনরায় শুরু হয় দুর্গোৎসব। নেতাজির প্রত্যক্ষ যোগে এই পুজো পরবর্তীকালে ‘স্বদেশী পুজো’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
একই ধারায় কলকাতার খিদিরপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও পরবর্তীকালে সুভাষচন্দ্র বসুর জাতীয়তাবাদী ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়। মেদিনীপুরের কর্নেলগোলা আদি সর্বজনীন দুর্গোৎসব ছিল বিপ্লবীদের অন্যতম মিলনক্ষেত্র। পুজোকে কেন্দ্র করে চলত লাঠি, তলোয়ার, কুস্তি ও শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ। মালদহের গঙ্গাবাগের ব্যায়াম সমিতিকে ঘিরে প্রচলিত ব্যতিক্রমী কালীপুজোয় দশমাথা ও দশহাত বিশিষ্ট মহাকালীর প্রতিমা যেন বহুগুণ শক্তি, সাহস ও অদম্য প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এইভাবে বাংলার বহু পুজোমণ্ডপে ধর্মীয় সাধনার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল স্বদেশচেতনা ও আত্মশক্তির সাধনা। তাই এই উৎসবগুলি নিছক পুজো ছিল না—পরাধীনতার অন্ধকারে এগুলি হয়ে উঠেছিল সংগঠন, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগানোর পরিসর। আর ১৯২৬ সালের সিমলা ব্যায়াম সমিতির দুর্গোৎসব আজও সেই ইতিহাসের এক স্মরণীয় ‘বিপ্লবতীর্থ’।ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে মলঙ্গা লেন এক নীরব অথচ দীপ্ত অধ্যায়। শরীরচর্চা ও কুস্তির আখড়ার অন্তরালে এখানে গড়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের গোপন সংগঠন ও আত্মোৎসর্গের সাধনা। সতীশ মুখোপাধ্যায় ও নীলবরন ভট্টাচার্যের উদ্যোগে ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত আত্মোন্নতি সমিতি পরে বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সক্রিয় বিপ্লবী সংগঠনে পরিণত হয়। অনুকূল মুখোপাধ্যায়, বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায় ও গিরীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিপ্লবীরা এই পরিসরকে জাতীয়তাবাদী চেতনার কেন্দ্র করে তুলেছিলেন।
অরবিন্দের নির্দেশে বিপ্লবীদের আখড়ায় দেবী আরাধনার সূচনা হয়। ১৯৩৪ বঙ্গাব্দে ৩৪ নম্বর ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পুরসভার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনোদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে দুর্গাপুজো শুরু হয়। অকালবোধনের প্রতিমায় রামচন্দ্রের স্মৃতি জাগিয়ে বিপ্লবীরা ‘বন্দে মাতরম’, ‘গীতা’ ও ‘আনন্দমঠ’ হাতে স্বাধীনতার শপথ নিতেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও এই পুজোর উদ্বোধন করেছিলেন। ১৯৩৫ বঙ্গাব্দে ধরপাকড়ে পুজো বন্ধ হলেও ১৯৩৬ সালে প্রমথনাথ দাশ, সুরঞ্জন পাল, পঞ্চানন দাশ প্রমুখের উদ্যোগে তা পুনরুজ্জীবিত হয়। পরে ‘জলকল পুজো’ নামে পরিচিত এই উৎসব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাভীতির মধ্যেও থামেনি। পুলিশের নজরদারি, খাদ্যসংকট ও বিপদের মধ্যেও স্থানীয় মানুষ, মণিকলাল নাগা এবং সহৃদয় থানার ওসির সহযোগিতায় পুজো টিকে থাকে। দিনে পুলিশের চোখ এড়িয়ে, কখনো রাতের অন্ধকারে বিপ্লবীরা মাতৃমূর্তির সামনে সমবেত হতেন—দেবী তখন তাঁদের কাছে শুধু আরাধ্যা নন, স্বাধীনতার অগ্নিশপথের প্রতীক।