নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: নেই প্রাথমিক চিকিৎসার ন্যূনতম উপকরণ। নেই আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়া কোনও যাত্রীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কোনও পরিকাঠামো। যার ফল হল মর্মান্তিক! বিনা চিকিৎসায় প্রায় ৪৫ মিনিট হাওড়া মেট্রো স্টেশনের ভিতরেই পড়ে রইলেন বিদ্যুৎ দপ্তরের এক আধিকারিক। বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে যখন তাঁকে হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, চিকিৎসক জানিয়ে দিলেন, দেরি হয়ে গিয়েছে! হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণ আগেই মারা গিয়েছেন ওই ব্যক্তি। মৃতের নাম বিশ্বজিৎ পাকড়াশি (৫১)। বাড়ি হুগলির ত্রিবেণীর বাসুদেবপুর কাঁঠালতলা এলাকায়। সল্টলেকের বিদ্যুৎ ভবনে ইএমডি সেলে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন তিনি।
ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ৯টা। অন্যান্য দিনের মতো মঙ্গলবারও ট্রেন থেকে নেমে মেট্রো ধরতে ছুটছিলেন তিনি। লিফটে উঠতে যাওয়ার মুহূর্তে সংঞ্জাহীন হয়ে পড়ে যান তিনি। তখনই মেট্রো ধরার জন্য আসছিলেন তাঁর তিন সহকর্মী। তাঁরা সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে কেউ এগিয়ে আসেননি বলে অভিযোগ। অবশেষে এক কনস্টেবলের তৎপরতায় ট্যাক্সি ভাড়া করে বিশ্বজিৎবাবুকে হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এই ঘটনায় মেট্রো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত উদাসীনতার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মৃতের পরিবার ও তাঁর সহকর্মীরা।
বিশ্বজিৎবাবু সংঞ্জাহীন হয়ে পড়লে কয়েকজন যাত্রী ও স্টেশনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশকর্মী চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দেন। তখন তাঁর শ্বাস চললেও দাঁতে দাঁত লেগে গিয়েছিল। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে বুঝতে পেরে সহকর্মীরা মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছে সহায়তা চান। কিন্তু পুলিশকর্মীরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি ছাড়া আর কোনও তৎপরতা দেখাননি বলে অভিযোগ। সঞ্জয় চক্রবর্তী নামে তাঁর এক সহকর্মী বলেন, ‘বুঝতে পারছিলাম, তখনই সিপিআর না দিলে ওঁকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু কারও কোনও হেলদোল ছিল না। প্রায় ২০ মিনিট পর স্টেশনের ভিতরে একটি ঘরে বিশ্বজিৎবাবুকে নিয়ে যান সহকর্মীরা। সেখানে এসি না থাকায় রীতিমতো গরম ছিল। একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও অসুস্থকে অক্সিজেন দেওয়ার জন্য যে মাস্ক প্রয়োজন, সেটাই ছিল না।’
এসবের মধ্যেই কেটে যায় ৪৫ মিনিট। তখন শাহজাহান মণ্ডল নামে এক পুলিশকর্মী দৌড়ে বাইরে গিয়ে একটি ট্যাক্সি ডেকে আনেন। সবাই ধরাধরি করে বিশ্বজিৎবাবুকে ট্যাক্সিতে তুলে দ্রুত হাওড়া হাসপাতালে ছোটেন। খবর পেয়ে চলে আসেন মৃতের পরিবারের তিন সদস্য। অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক আত্মীয় বলেন, ‘প্রতিদিনের মতোই সকাল সাড়ে ৭টায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। মেট্রো কর্তৃপক্ষ একটু তৎপর হলে মানুষটাকে হারাতে হতো না।’ মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, এখনও পর্যন্ত কোনও লিখিত অভিযোগ হয়নি। তবে ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। মেট্রো কর্তৃপক্ষ একটু মানবিক ও আন্তরিক হলে হয়তো আমাদের এই কর্মীকে বাঁচানো যেত। রাজ্য সরকার পরিবারের পাশে আছে।’ -নিজস্ব চিত্র