Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারত ঝুঁকে পড়েছে বিশ্ব মাতব্বরের দিকে

আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইজরায়েল এর উসকানিদাতা। আর জল্লাদ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইজরায়েল এটা বোঝাতে পেরেছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে কিংবা এই ভয়ংকর কাজটি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে তারা

ভারত ঝুঁকে পড়েছে বিশ্ব মাতব্বরের দিকে
  • ৯ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইজরায়েল এর উসকানিদাতা। আর জল্লাদ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইজরায়েল এটা বোঝাতে পেরেছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে কিংবা এই ভয়ংকর কাজটি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেওয়ার প্ল্যান তৈরি করে ফেলেছে এই দেশটি। তবে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে গোপন তথ্যের অধিকারী মার্কিন কর্মকর্তারা কথিত হুমকিগুলিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবুও, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করেছেন।

Advertisement

অতীতের গুজব
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের কথিত হুমকি পূর্ববর্তী তিনটি গুজবের মতো। ইরাকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ রয়েছে। ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাক আক্রমণ করার জন্য এই গুজবকে হাতিয়ার করেছিলেন। এটি সেই গুজবের মতো যে মুয়াম্মার আল-গদ্দাফি লিবিয়ায় সাধারণ নাগরিকদের উপর গণহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপ ঘটানো হয়েছিল। ওই অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামা ‘মানবিক সংকট রোধ করার’ কথা প্রচার করেছিলেন। মনরো মতবাদ চলতি বছরেই পুনঃউদ্ভাবন করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলায়  ‘শাসন পরিবর্তন’ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার জন্য মতবাদটির প্রসার ঘটিয়েছেন তিনি।
এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ আগেও হয়েছিল এবং এখনও আছে—দুটি ক্ষেত্রেই এই কাণ্ড অবৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন না। এই ধরনের হস্তক্ষেপ রাষ্ট্রসংঘের সনদেরও পরিপন্থী। বেআইনি হওয়ার পাশাপাশি, একটি দেশের মাতব্বরিতে অন্যকোনো সার্বভৌম জাতির শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা অবৈধও। রাশিয়া যেমন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ যুদ্ধ চালাচ্ছে, তেমনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ করাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে অবৈধ ছিল। একইভাবে আয়াতুল্লাহ খামেনেই এবং ইরানে তাঁর সহযোগী নেতাদের নির্মূল করা যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল জুটির একটি অবৈধ পদক্ষেপ। ইরানের নেতৃত্বের মৃত্যুর জন্য ভারত শোক প্রকাশ করেছে ছয়দিন পর! 
ইজরায়েলের সংসদ নেসেটে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েলি পরিবারের প্রতি ভারতের সমবেদনা প্রকাশসহ বলেন, ‘৭ অক্টোবর হামাসের বর্বর আক্রমণে যাঁদের পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারত এই মুহূর্তে পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং ভবিষ্যতেও একইভাবে থাকবে।’ কিন্তু গাজায় ফিলিস্তিনি বসতি ধ্বংসের ঘটনা নিয়ে তিনি একটিও নিন্দাসূচক শব্দ উচ্চারণ করেননি। তবে এটা সত্য যে, কোনো প্ররোচনা ছাড়াই হামাসের আক্রমণে ১,২১৯ জন ইজরায়েলি নাগরিক নিহত হন। পাশাপাশি এই সত্যও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গাজায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইজরায়েল।
নরেন্দ্র মোদি ভাষণ দেন ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে তার মাত্র তিনদিনের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি। তার প্রতিশোধ নিচ্ছে ইরান। একাধিক আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিতে তারা আক্রমণ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ কিংবা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। ইজরায়েলের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের কারণে ভারতের কিছু করার সুযোগ নেই। যুদ্ধ থামাতে কিংবা অন্যান্য আরব দেশে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিপদ রুখতে ভারত যে কোনো ভূমিকা নেবে, সেই সম্ভাবনার দরজা বন্ধ। নিজ নৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়ে ভারত একটি অযোগ্য দর্শকে পরিণত হয়েছে। অথচ এই যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি পৌঁছে গিয়েছে শ্রীলঙ্কার নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায়। 
শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন
মোদ্দা লক্ষ্য হল ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’। একটি দেশের শাসনব্যবস্থা যত খারাপই হোক না কেন, সেই শাসনব্যবস্থা জবরদস্তি পালটে দেওয়াটা অন্যকোনো দেশের কাজ হতে পারে না। সেই মানদণ্ড অনুসারে, এমন ৫০টিরও বেশি দেশ রয়েছে যেখানে বর্তমান সরকার পরিবর্তন করা দরকার। কিন্তু মজার ব্যাপার হল—বাস্তবে এরকম অনেক স্বৈরশাসকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এবং তাদের মক্কেলও।
২০২৫ সালের জুন মাসে ইজরায়েলের ইন্ধনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘মিডনাইট হ্যামার’ চালায় এবং ১২ দিন পর দাবি তারা করে যে, ‘ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’ সেই দাবি সত্য হলে ইরান কীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করতে পারে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ হতে পারে দেশটি? তাছাড়া, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ওমান স্পষ্টভাবে বলেছিল যে ইরান ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত শূন্য রাখতে এবং কখনো পারমাণবিক বোমা না-রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।’ রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ইরানে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রমাণ কোথায়?’ অতীতে আমেরিকা অন্যান্য যুদ্ধগুলি যে কারণ দেখিয়ে শুরু করেছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সেরকমই এক অসত্যের উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হয়েছে।
ইরানের ঘোষিত শত্রু ইজরায়েল এবং বিপরীতক্রমেও তাই। ইরাক এবং লিবিয়ার দিক থেকে ইজরায়েলের প্রতি পরোক্ষ হুমকি যুক্তরাষ্ট্র আগেই দূর করে দিয়েছিল। ইজরায়েল, অন্তত আপাতত, সৌদি আরবের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল একমাত্র এবং প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে মাথা তুলতে মরিয়া। সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরান একাই। ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে দেশটিকে একটি অধীনস্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ইজরায়েল। এটি একটি ঘৃণ্য মতাদর্শ। একটি শাসনব্যবস্থা যত খারাপই হোক না কেন, তার পরিবর্তন করার একমাত্র অধিকার রয়েছে সেই দেশের জনগণের।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল তাদের সাফল্য সম্পর্কে যে দাবি করছে তা অতিরঞ্জিত। বিশিষ্ট ইজরায়েলি সংবাদদাতা অ্যালোন মিজরাহি এই ব্যাপারে যে ন্যারেটিভ দিয়েছেন তাতে কিন্তু অন্য সাক্ষ্য মেলে। এটি সৈন্য ছাড়াই যুদ্ধ। বিভিন্ন যন্ত্রই বিভিন্ন যন্ত্রের সঙ্গে লড়াই করছে। যেসব যন্ত্র সবচেয়ে মারাত্মক এবং যাদের কাছে এগুলির অফুরন্ত জোগান রয়েছে, এই যুদ্ধে জিতবে তারাই। 
ভারতের অবস্থান নেমে গিয়েছে
এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান হিংসা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। সেই মানবিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থের আবহে ভারত আজ বিচ্ছিন্ন। জর্ডন, কুয়েত, বাহরিন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) এবং ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। এই অঞ্চলে এক কোটি ভারতীয় রয়েছেন। সেখানে তেল ও রপ্তানি বাণিজ্য এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে ভারতের। ইরানের চাবাহার বন্দরে ভারতের ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগেরও প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এত বড়ো স্বার্থ সত্ত্বেও ভারতের কোনো ‘ভয়েস’ অথবা ‘ইনফ্লুয়েন্স’ নেই। ইজরায়েলের উদ্দেশ্যের প্রতি ভারতের নীতিহীন সমর্থনের কারণেই এই হাল।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ