Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিম্নগামী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে ভারত!

পরিতাপের বিষয় এই যে, গাজা নিজেই একটি ‘অরাজনৈতিক কমিটির’ অধীনে ‘ভার্চুয়াল কলোনি’ হয়ে থাকবে। সেটির তত্ত্বাবধান করবে ট্রাম্প এবং ব্লেয়ার সাহেবের মতো ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি ‘বোর্ড অফ পিস’। অতএব, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন কার্যত মৃত।

নিম্নগামী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে ভারত!
  • ১৩ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষে চারদিনের ব্যবধানে একবার নয়, দু-দুবার একজন ব্যক্তির প্রশংসা করা অস্বাভাবিক ব্যাপার, আর তিনি করেছিলেন সেটাই! প্রশংসার লক্ষ্য ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প। এর বিষয় ছিল ‘ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে’ ট্রাম্প সাহেবের ২০-দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ সংক্রান্ত প্রস্তাব।

Advertisement

গত ৩০ সেপ্টেম্বর নরেন্দ্র মোদি এটাকে ‘গাজা সংঘাতের অবসানের জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা’ বলে অভিহিত করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মতে, ‘এটি ফিলিস্তিনি এবং ইজরায়েলি জনগণের পক্ষে, পাশাপাশি বৃহত্তর পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং সুস্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের একটি ফলপ্রসূ পথ নির্দেশ।’ নরেন্দ্র মোদি এই বিষয়ে মোট সাতটি ভাষায় একটি বিবৃতি জারি করার অসাধারণ পদক্ষেপও করেন। আরবি, চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান এবং স্প্যানিশ, পাশাপাশি হিব্রু এবং অবশ্যই, হিন্দি ভাষাতেও ওই বিবৃতি জারি করা হয়েছে। ৪ অক্টোবর, মোদিজি বলেছেন, ‘গাজার শান্তি প্রচেষ্টায় নির্ণায়ক অগ্রগতি অর্জন করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বকে আমরা স্বাগত জানাই।’
আমি এই লেখা যখন লিখছি তখন হামাস এবং ইজরায়েল শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায় নিয়ে সম্মত হয়েছে। বন্দিদের মুক্তি দেবে হামাস এবং ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি করবে—সেটা কখন তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে খুব শীঘ্রই বলে অনুমান করা যায়। গাজা এবং ইজরায়েল উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ এই আনন্দমুহূর্ত উদযাপনের জন্য রাস্তায় নেমে আসে। এই পরিকল্পনার বেশ কয়েকটি দিক অবশ্য হামাস এখনও গ্রহণ করেনি, বিশেষ করে কোনও একটি বহিরাগত কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
অশুভ সূচনা
স্বাভাবিকভাবেই, প্রশ্ন উঠেছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা এবং খুশি করার জন্য নরেন্দ্র মোদি কেন চরম উদ্বেগ দেখিয়েছেন, যেখানে গত ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের উপর কেবলই আঘাত হেনে চলেছেন এবং করে চলেছেন অপমান।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২১)  শুল্ক আরোপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের টার্গেট ছিল ভারতসহ কয়েকটি দেশ। তাদের ঘাড়ে ইস্পাত (২৫ শতাংশ) এবং অ্যালুমিনিয়ামের (১০ শতাংশ) উপর শুল্ক বোঝা চাপানো হয়েছিল। এছাড়া ভারতের ক্ষেত্রে বাতিল করা হয়েছিল জিএসপি বেনিফিটস। ভারতীয়রা যেসব ভিসা ব্যবহার করেন, ২০২০ সালে তিনি সেসব ভিসা, বিশেষ করে এইচ-১বি সাসপেন্ডেড করে দেন। তা সত্ত্বেও, ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর টেক্সাসের হিউস্টনে এক সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি বিতর্কিতভাবে ঘোষণা করেন যে, ‘আবকি বার, ট্রাম্প সরকার!’
তাঁর দ্বিতীয় দফার শাসনকালের প্রথম নয় মাসের দিকে কী দেখছি আমরা? ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের (এবং ব্রাজিল) উপর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করেছেন! তার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, টেক্সটাইল, রত্ন ও অলংকার, সামুদ্রিক খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, জুতো, আসবাবপত্র, গাড়ি এবং খেলনা রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাশিয়ার খনিজ তেল কিনে ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থ জোগান দেওয়ার’ অভিযোগ এনেছেন তিনি ভারতের বিরুদ্ধে। আর এই ‘অপরাধে’ ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প সাহেব। তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র, সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ভারতকে বলেছেন যে, ভারত যদি রাশিয়ার তেল কিনতে থাকে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘তোমাদের ধ্বংস করে দেবে এবং আমরা তোমাদের অর্থনীতিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ছাড়ব!’  ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে ‘ট্যারিফ কিং’ নামে দেগে দিয়েছেন এবং তাঁর বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো আরও খারাপ কথা বলেছেন। ভারত-রাশিয়া সম্পর্ককে তীব্র সমালোচনা করে দুটিকেই ‘মৃত অর্থনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। এইচ-১বি ভিসার আবেদনের উপর তিনি ১ লক্ষ মার্কিন ডলারের বিপুল ফি চাপিয়ে দিয়েছেন এবং কঠোরতর করেছেন স্টুডেন্ট ও স্পাউজ ভিসা অনুমোদনের নিয়ম। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে মাসে, ‘অবৈধ অভিবাসী’ দেগে দিয়ে সহস্রাধিক ভারতীয়কে হাতকড়া এবং পায়ে শিকল পরিয়ে সামরিক বিমানে চাপিয়ে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়!
ট্রাম্পের পাকিস্তান-প্রীতি
ইতিমধ্যে ঘটে গিয়েছে পাহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড। স্বভাবতই অনুদানের বিরোধিতা করেছে ভারত। তা সত্ত্বেও, গত মে-জুন মাসে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) এবং বিশ্ব ব্যাংক (৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) থেকে পাকিস্তান বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও। ভারত অস্বীকার করা সত্ত্বেও, ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামাতে তিনি মধ্যস্থতা করেছেন এবং তাঁর এই দাবি উত্থাপন তিনি অব্যাহতও রেখেছেন! ভারতের জন্য অপমানটি চূড়ান্ত হল—১৮ জুন হোয়াইট হাউসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে এক বেনজির মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনায়। এরপর গত ২৫ সেপ্টেম্বর, ট্রাম্প সাহেব একটি যৌথ বৈঠকও করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের সঙ্গে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় পাকিস্তানের ‘মহান নেতারা’ সেখানে ‘ক্রিটিক্যাল রেয়ার আর্থ মিনারেলস’ নামক খনিজপদার্থ সরবরাহের প্রস্তাব দেন। মাত্র ১৯ শতাংশ শুল্কে পাকিস্তানি পণ্য বাণিজ্যের একটি চুক্তিও সই হয় সেদিন। এছাড়া আরব সাগরে একটি বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানান পাকিস্তানের নেতৃত্ব। ৯/১১, ওসামা বিন লাদেন, অ্যাবোটাবাদ এবং পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ আখ্যা প্রদান ট্রাম্প অবশ্য বিস্মৃত হয়েছেন। একই সঙ্গে দুটি ঘোড়ায় (আমেরিকা এবং চীন) চড়ার কৌশল পাকিস্তান শিখেছে বলেই মনে হচ্ছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আমেরিকা এমন একটিও কাজ করেনি যাতে তাদের ভূমিকা ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। ভারত-মার্কিন সম্পর্ক এখন ‘ডাউন’ লেখা একটি এস্কালেটরে চেপেছে। আর নরেন্দ্র মোদি মরিয়া হয়ে সেই নিম্নগামী চলমান সিঁড়ির নীচের দিক থেকে উপরে ওঠার চেষ্টা করে চলেছেন!
একটি স্বপ্নের হত্যা
কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন হল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেন ইজরায়েল-সমর্থিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’র সুযোগ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন? এতে যে ফিলিস্তিনিদের হতাশায় ফেলে দেওয়া হল! ১৯ নম্বর পয়েন্টে লেখা আছে: ‘যখন গাজা পুনর্গঠন এগিয়ে চলেছে, এবং যখন ফিলিস্তিনি অঞ্চলের সংস্কার কর্মসূচি (পিএ রিফর্ম প্রোগ্রাম) বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তখন অবশেষে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে।’
আমার মতে, যুদ্ধ অবশেষে বন্ধ হতে পারে, শীঘ্রই মুক্তি দেওয়া হতে পারে বন্দিদের (অথবা তাঁদের দেহাবশেষ)। পাশাপাশি গাজার অসহায় বাসিন্দাদের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে পারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, গাজা নিজেই একটি ‘অরাজনৈতিক কমিটির’ অধীনে ‘ভার্চুয়াল কলোনি’ হয়ে থাকবে। সেটির তত্ত্বাবধান করবে ট্রাম্প এবং ব্লেয়ার সাহেবের মতো ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি ‘বোর্ড অফ পিস’। অতএব, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন কার্যত মৃত।
স্পষ্টতই, সমস্ত অসার গর্বের পরেও, প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন যে বিশ্বে ভারতের বন্ধুসংখ্যা নগণ্য এবং ভারতীয় অর্থনীতি তার চারপাশের ঝড় মোকাবিলা করার পক্ষে যথেষ্ট স্থিতিশীল নয়। স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি বা বুদ্ধিদীপ্ত কূটনীতি এবং সুদৃঢ় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতির বিকল্প কখনোই তোষামোদ হতে পারে না।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ