নৌসেনা, বায়ুসেনা, পদাতিক বাহিনী—ভারতের তিন বাহিনীই শুরু করে দিয়েছে যুদ্ধের মহড়া। ভারতের একের পর এক শক্তিপ্রদর্শনে থরহরি কম্প ধরে গিয়েছে পাকিস্তানের শাসক এবং সেনা বিভাগের। তারা ভিতরে ভিতরে যত ভীত হচ্ছে, তত বেশি করে ছাড়ছে ফাঁকা আওয়াজ। পাক সরকারের কোনও একজন শিশুর মতোই দাবি করেছেন, ‘আমরা সামরিক শক্তিতে ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে!’ তাঁদের আস্ফালন অবশ্য আর্তনাদের মতোই শোনাচ্ছে। আর্তনাদ তো করতেই হবে তাঁদের। কেননা, পহেলগাঁও কাণ্ডের পরই, কাশ্মীরে পাকিস্তানের দোসরদের হাঁড়ির হাল করে ছেড়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বিভাগ। নিরাপত্তা বিভাগের ইলেক্ট্রনিক নজরদারি যন্ত্র পনেরোজন কাশ্মীরি সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করেছে। তারা সেখানে ‘ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার’ এবং/অথবা জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পহেলগাঁও টার্গেট কিলিংয়ের পিছনে তাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। পাক জঙ্গিদের তারা লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছে। এমনকী, পাকিস্তান থেকে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্রের যেসব ‘কনসাইনমেন্ট’ কাশ্মীরে ঢুকেছে সেগুলি ‘রিসিভ’ করেছে তারা। তদন্ত শেষে, ‘সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্স’-এর ভিত্তিতে একাধিক এজেন্সি পাঁচজন সন্দেহভাজন যুবকের ‘কীর্তি’ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। তাদের ভিতরে তিনজনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিস। পহেলগাঁওয়ে গণহত্যা চলাকালে তারা কাছাকাছি এলাকাতেই ছিল। তাদের ফোন ‘চ্যাট’ বিশ্লেষণ বলছে, পাকিস্তানি জঙ্গিদের সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের মধ্যে কথা হয়েছিল। ইতিধ্যে ভারতের নিরাপত্তা বিভাগ দু’শোর বেশি ‘ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার’কে আটক করে জেরা করছে। কারা, কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে সেদিন ‘অ্যাটাক’ করেছিল—তা জানার চেষ্টা চলছে। এনআইএ, স্থানীয় পুলিস, আইবি এবং ‘র’-এর যৌথ টিম বাছাই আরও দশজন ‘ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার’কে জেরা করার উপর জোর দিয়েছে। কাশ্মীরে অতীতে সংঘটিত নষ্টামিতে জড়িত পাক জঙ্গিদের সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের বদনাম রয়েছে এবং ২২ এপ্রিলের ঘটনার দিনও তারা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি সক্রিয় ছিল।
দক্ষিণ কাশ্মীর অঞ্চলের এমন জনা পনেরো যুবককে গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছেন, যারা দু’বছর যাবৎ পাক জঙ্গিদের সাঙাত হিসেবে সক্রিয়। লজিস্টিক সাপোর্ট, জঙ্গল গাইড এবং পাকিস্তানি অস্ত্রের ‘রিসিভভার’ হিসেবে তারা কাজ করে। উল্লেখ্য, পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত জঙ্গির সংখ্যা চার-পাঁচ। তাদের মধ্যে অন্তত দু’জন পাকিস্তানের নাগরিক। গোয়েন্দারা নিশ্চিত যে, স্থানীয় কিছু সহযোগীর প্রত্যক্ষ দোস্তি ছাড়া তারা এত বড় কাণ্ড ঘটাতে পারেনি। উপরে বর্ণিত পনেরোজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আগে, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পেতে গোয়েন্দারা আরও বিস্তারিত খোঁজখবর করছেন। এখানেই শেষ নয়, দক্ষিণ কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে চিহ্নিত জঙ্গিদের একের পর এক বাড়িও। অনন্তনাগ, কুলগাঁও, বন্দিপোরা, পুলওয়ামা, সোপিয়ান প্রভৃতি জায়গায় রবিবার সকাল পর্যন্ত অন্তত এগারোটি বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, এ পর্যন্ত জঙ্গিদের শ’খানেক বাড়ি তারা চিহ্নিত করেছে।
মানবসভ্যতার সমস্ত নিয়মকানুন নস্যাৎ হয়ে গিয়েছে পাকিস্তানের জঙ্গিবাদী শাসকের ষড়যন্ত্রে। কাশ্মীরকে ‘মৃত্যু উপত্য’কায় রূপান্তরিত করেছে তারা। ছায়াযুদ্ধ করলেও, সরাসরি ধর্মপরিচয় জেনে হিন্দুদের বেছে বেছে খুন করার মতো কাণ্ড জঙ্গিরা ইতিপূর্বে করেনি। মানবিকতার সেই ন্যূনতম গণ্ডিও তারা অতিক্রম করেছে পহেলগাঁওতে। স্বভাবতই গণতান্ত্রিক দুনিয়া, মানবিক পৃথিবী পাকিস্তানের নিন্দায় মুখর। দোষীদের চরমতম শাস্তির দাবি উঠেছে তাদের পক্ষ থেকে। আর ভারতের অভ্যন্তর থেকে উঠেছে সরাসরি ‘বদলা’র দাবি। কূটনৈতিক প্রত্যাঘাত দিয়েই শুরু করেছে ভারত। অতঃপর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করে দিয়েছেন, ‘এমন মারব যা ওরা কল্পনাও করতে পারছে না!’ সর্বদল বৈঠকে সব নেতাই এই ব্যাপারে সরকারকে ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সবুজ সঙ্কেতসহ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেতেই পুরো প্রস্তুত প্রতিরক্ষার তিন বিভাগও। কাশ্মীরে নিরাপত্তা বিভাগের বর্তমান সক্রিয়তা যে এই প্রস্তুতিরই অঙ্গ, তা বলাই বাহুল্য। কাশ্মীর যখন বহুলাংশে শান্ত হয়ে এসেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে রাষ্ট্র, জনজীবনে ফিরে এসেছে স্বস্তি, আর্থ-সামাজিক দিক থেকে অবশ্যই খুশি কাশ্মীরি জনগণ—ঠিক সেই মুহূর্তকেই বেছে নিয়েছে পাক শাসকের হাতের পুতুলরা। উদ্দেশ্য একটাই, ভারতকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া। বলা বাহুল্য, চ্যালেঞ্জ হলেও পাকিস্তানের কায়দাটা ফের তস্করের মতোই। স্বভাব-তস্কররা চোরাগোপ্তা ঢুকে অপকম্ম সেরেই পালায় এবং তার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকে। এই জিনিস আর বরদাস্ত করা ঠিক নয়। ভারতের তরফে এবার জবাব হোক সুস্থায়ী, যেন পাকিস্তান আর মাজা সোজা করে কখনোই দাঁড়াতে না পারে। সূচনা পর্বে লোকাল কানেকশন বিচ্ছিন্ন করার যে প্রয়াস জারি রয়েছে তা প্রাসঙ্গিক এবং প্রশংসনীয়।