বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: বৈচিত্র্যের দেশ ভারত। হিমালয় থেকে থর, আন্দামান থেকে কচ্ছ—বৈচিত্র্যের শেষ নেই। স্কুল, বাড়িতে শোনা গল্পকথা, বইতেও ছোটবয়স থেকে ভারতীয় শিশুরা জেনে আসছে একথা। এও জেনেছে, মানুষ, বিভিন্ন জনজাতি, খাওয়া-দাওয়া, ভাষা, সাংস্কৃতিক ভিন্নতায়ও ভারতের মতো বিশিষ্টতায় সমৃদ্ধ দেশ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
কিন্তু কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতবাসী? দেশের সর্ববৃহৎ জিনগত স্টাডিতে পাওয়া গেল চোখ কপালে তুলে দেওয়া তথ্য! এই প্রথম জানা গেল, ভারতের মানুষের মধ্যে রয়েছে ১৩ কোটি জিনগত বৈচিত্র্য! এর মধ্যে ৪.৪ কোটি বৈশিষ্ট্যের কথা কেউ কোনোদিন জানতই না।
দিল্লি, মাদ্রাজসহ একাধিক আইআইটি, নিমহ্যানস, কল্যাণীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিকেল জেনোমিক্স (এনআইবিএমজি) সহ দেশের ১৩টি সেরা বিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা মিলে সম্প্রতি তৈরি করেছিল ‘জিনোম ইন্ডিয়া কনসর্টিয়াম’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা। উদ্দেশ্য একটাই—দেশের মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য জানা।
কল্যাণীর এনআইবিএমজি’র অধ্যাপক ডঃ অনলাভ বসু বলেন, সমীক্ষার গবেষণালব্ধ ফলাফল বংশগত রোগ নিরাময়, দেশের মানুষের জিনগত নিজস্বতার কথা মাথায় রেখে দেশীয় ওষুধ তৈরি করা সহ বিভিন্ন কাজে লাগবে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ভারতের জনগোষ্ঠীগুলি প্রধানত চারটি ভাষা-উৎপত্তিগত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সেগুলি হল ইন্দো ইউরোপীয়, দ্রাবিড়, অস্ট্রোএশিয়াটিক ও টিবেটোবার্মান। গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট, ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা ও সংস্কৃতি ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জিনগত গঠনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্যের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন।
আদিবাসী বা মূলবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ জিনগত বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা গেছে। পূর্বাঞ্চলের জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে বাঙালিরাও অন্তর্ভুক্ত, তাঁরাও উল্লেখযোগ্য জিনগত বৈচিত্র্য বহন করছে। বাঙালিদের মধ্যে দ্রাবিড়িয়ান বাদে তিন ধরনের সম্প্রদায়ের জিনের মিশ্রণ দেখা গিয়েছে। প্রতিটি মানুষের জিনোমের ৪০০ কোটি শৃঙ্খলা খতিয়ে দেখা গিয়েছে, দেশের একটি বড়ো অংশে একই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় জিনগত বৈচিত্র্য কমেছে।
গবেষকরা এও লক্ষ্য করেছেন, মানব জিনের ৪০০ কোটি শৃঙ্খলার মধ্যে কিছু কিছু শৃঙ্খলা ওষুধ বা ইঞ্জেকশনে মানুষটি কতটা সাড়া দেয়, তা স্থির করে। এগুলিকে বলে ফার্মাকোজেনোমিক অংশ। দেশের মানুষের জিনের এই অংশগুলির সঙ্গে ইতিমধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ওষুধের মার্কার মিলিয়ে দেখে তাঁরা জানিয়েছেন, ভারতের বাজারে দেদার বিক্রীত ইউরোপিয়ান ওষুধগুলি আদৌ কতটা কাজের, তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। ইউরোপিয়ানদের জিনের গঠন আলাদা। যেকোনো অসুখে শরীরের প্রতিক্রিয়াও আলাদা। সেগুলির উপর ভিত্তি করে ভারতের মানুষের জন্য তৈরি ওষুধের কার্যকারিতা মোটেই প্রশ্নাতীত নয়। এক বিশিষ্ট জিন বিজ্ঞানী বলেন, শুধু প্রশ্নাতীতই নয়, ওষুধগুলি ভারতীয়দের শরীরে কোনো ক্ষতি করছে কি না, তাও আমরা জানি না। জানা দরকার।