দুর্গাপুজোর পর দীপাবলি, আরও এক ভারতীয় উৎসবকে বিশেষ স্বীকৃতি দিল ইউনেস্কো। এই উজ্জ্বল মুহূর্ত ভারতবাসীকে অপার আনন্দ দিয়েছে এবং গর্বিত করেছে। আপ্লুত স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ইউনেস্কোর ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হল দীপাবলি। অর্থাৎ ভারতের এই উৎসব এখন থেকে ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনবদ্য অংশ হিসেবে গুরুত্বলাভ করল। বাঙালির শ্রেষ্ঠপুজো দুর্গাপুজো এই আন্তর্জাতিক সম্মান আদায় করে নিয়েছিল ২০২১ সালে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচবছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এল আরও এক বিরাট স্বীকৃতি। এবার সংবর্ধিত হল ভারতবর্ষের আলোর উৎসব দীপাবলি। ইউনেস্কো তাদের ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির যে তালিকা এবার প্রকাশ করেছে তাতেই রয়েছে দীপাবলির উজ্জ্বল উপস্থিতি। এ যেন বর্তমান সহস্রাব্দের প্রথম সিকি শতক পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ। বস্তুত বিষয়টি ভারতবাসীকে বড়োদিনের উপহারও হয়ে উঠল। এমন সুসংবাদ অবশ্যই দেশবাসীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ারই কথা। প্রধানমন্ত্রী সেটাই করেছেন এক্ষেত্রে। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজের তালিকায় দীপাবলির জায়গা পাওয়াটা আনন্দের। সারা বিশ্বে এই উৎসবের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যাবে।’
বঙ্গদেশে যা দীপাবলি, তা হিন্দিবলয় এবং অন্য অনেক স্থানে দিওয়ালি বা দেওয়ালি নামে পরিচিত। এই উজ্জ্বল আলোর উৎসব প্রতিবছর ভারতব্যাপী সাড়ম্বরে পালিত হয়। সুগন্ধ, আনন্দ, প্রেম-প্রীতি প্রভৃতি চার দেওয়াল, এমনকি মানচিত্রের সীমাবদ্ধতা মানে না। আলোর উৎসবও তা মানেনি। ভারতের পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকাসহ প্রায় সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে এই উৎসবের ছটা। বহির্ভারতের বিভিন্ন দেশ এখন সরকারিভাবেই দীপাবলি পালন করে এবং সেইসব রাষ্ট্রপ্রধান এই উপলক্ষ্যে ভারতবাসী ও বিশ্ববাসীকে শুভেচ্ছা জানান। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর। ইউনেস্কো যথার্থই বলেছে, দীপাবলি আশা, পুনর্নবীকরণ এবং খারাপের উপর ভালো, অন্ধকারের উপর আলোর জয়ের প্রতীক হিসেবে পালন করা হয়। এইসময়ে ভারতীয়রা, নিজেদের বাড়ি সুন্দর করে সাজিয়ে তোলেন। এমনকি জনবহুল এলাকাগুলিতেও মোমবাতি, প্রদীপ প্রভৃতি জ্বালানো হয়। পোড়ানো হয় রকমারি বাজি। এইসময়েই সমৃদ্ধি এবং নতুন কিছুর শুভ সূচনার জন্য প্রার্থনা করেন ভারতীয়রা। মনে রাখতে হবে, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ যে দেশের অন্তরে খোদাই হয়ে আছে সেই ভারতবর্ষ কখনও কেবল নিজের সুখ সমৃদ্ধি প্রার্থনা করেনি। এই দেশ যেসব প্রাচীন শাস্ত্র দ্বারা চালিত তারই নির্দেশ, ‘সর্বে ভবন্তু সুখিন/ সবের্ব সন্তু নিরাময়ঃ/ সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু/ মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ্ভবেৎ/ ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ’। অর্থাৎ সকলেই সুখী হোক। সকলেই রোগমুক্ত থাকুক। সকলেই মঙ্গল দর্শন করুক। কারওরই যেন দুঃখ না-হয়। শুধুই যেন পরম শান্তি বিরাজ করে সর্বত্র। এই প্রার্থনার লক্ষ্য সকলে, যাঁরা আমাদের মিত্র জ্ঞান করতে কুণ্ঠিত তাঁরাও।
শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা আমাদের বিরাট সম্মান জানিয়েছে, আমাদের গর্বিত করেছে। এই মুহূর্ত অবশ্যই উদযাপনের। কিন্তু শুধু উদযাপনেই কি আমাদের দায়-দায়িত্ব সাঙ্গ হবে? না, বস্তুত ইউনেস্কো আমাদের দায়িত্বও বৃদ্ধি করল। আমরা যে এই পুরস্কারের সত্যিই যোগ্য, তাদের এই মহান দান যে অপাত্রে হয়নি, তার প্রমাণ দিতে হবে আমাদের। সেটা একবার নয়, বারবার। আমাদের দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় আগামীদিনে কেবল দুর্গাপুজো বা দীপাবলিতেই সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন কাম্য। দীপাবলির আলো একটি প্রতীকী বিষয়। আসলে জীবনের সবক্ষেত্র থেকে অন্ধকার দূর করাতেই এই উৎসবের সার্থকতা। এজন্য আমাদের লড়াই জারি রাখতে হবে সমস্ত ধরনের অজ্ঞান, কুসংস্কার এবং দূষণের বিরুদ্ধে। দীপাবলির উৎসবের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধির জন্য আমরা অনেকে আতশবাজি পুড়িয়ে থাকি। কিন্তু তার জন্য বিধির তোয়াক্কা করা হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এমনকি শব্দবাজিও পোড়ানো হয় সমস্ত আইনি নিষেধাজ্ঞা জলাঞ্জলি দিয়ে। তাতে একদিনে যে পরিমাণ বায়ু ও শব্দদূষণ হয়, এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ, তা মারাত্মক। অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষতি অপূরণীয় চিহ্নিত হয়ে থাকে। তাই আগামীদিনে দীপাবলিসহ সমস্ত আনন্দানুষ্ঠান পালনে আমাদের যথেষ্ট দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিতে হবে। আলোর উৎসবকে সার্থক করে তুলতে হলে আমাদের বহুত্বের সাধনাকে আরও অর্থবহ করে তোলা চাই। সামান্যতম সংকীর্ণতাও আমাদের আলোয় উত্তরণের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে।