নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনের সম্পন্ন ব্যবসায়ীর বাড়ির মাত্র ২৫ হাজার টাকার বেতনভুক পরিচারিকা! সার্ভেন্টস কোয়ার্টারেই থাকতেন। বাড়ির সাতজন কাজের লোকের মধ্যে একমাত্র তাঁরই অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল মালিক-মালকিনের বেডরুমে। দায়িত্ব বেশি, অন্য সবার থেকে বেতনও তাই বেশি। এহেন পরিচারিকার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীর বাড়ির শোওয়ার ঘরের আলমারি থেকে ২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের হিরে ও সোনার ৩৬টি গয়না চুরির অভিযোগ! তদন্তে নেমে ‘চক্ষু চড়কগাছ’ তদন্তকারীদের। মঞ্জু গুপ্তা নামে ওই পরিচারিকার কসবায় বেনামে রয়েছে দু’টি ফ্ল্যাট। চারটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেন রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, ২৩-২৪ এবং ২৪-২৫, পরপর দুটি আর্থিক বছরের প্রতিটিতে ৯ লক্ষ টাকারও বেশি আয়কর জমা দিয়েছেন ওই পরিচারিকা। রিটার্নে নিজেকে ‘সেল্ফ এমপ্লয়েড’ বলে দেখিয়েছিলেন মঞ্জু। দু’টি অর্থ বছর মিলিয়ে প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা আয়কর বাবদ জমা দিয়েছেন, এত অর্থ এল কোথা থেকে? প্রাথমিক তদন্তে তদন্তকারীদের বক্তব্য, ওই ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে চুরি যাওয়া গয়না বিক্রির বিপুল পরিমাণ টাকা নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিতে জমা করেছিলেন মঞ্জু। তার জেরেই আয়কর দিতে হয়েছে তাঁকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে মঞ্জুকে।
তদন্তকারীরা বলছেন, ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনের এক অভিজাত আবাসনে থাকেন ওই সম্পন্ন ব্যবসায়ী, অটোমোবাইলের কারবারি। ছ’বছর আগে ব্যবসায়ীর বাড়িতে পরিচিত একজনের মাধ্যমে কাজে ঢুকেছিলেন মঞ্জু। আধার কার্ড জমা দেওয়া ছিল সেখানে। ওই ব্যবসায়ী পরিবারের তরফে গত ২৭ জুলাই গড়িয়াহাট থানায় লিখিত অভিযোগে জানানো হয়, তাঁদের ফ্ল্যাটের শোওয়ার ঘরের আলমারি থেকে ২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সোনা ও হিরের গয়না চুরি হয়েছে। এপ্রিলের শুরু থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে চুরির ঘটনাগুলি ঘটেছে। কী কী গয়না খোয়া গিয়েছে, তার তালিকাও থানায় জমা দেয় ব্যবসায়ী পরিবার। ২০ তারিখ গয়না চুরির বিষয়টি সামনে আসার পরেও সাতদিন পর অভিযোগ কেন? ব্যবসায়ী পরিবারের তরফে জানানো হয়, প্রথমে নিজেদের মতো করে খোঁজখবর শুরু করেন তাঁরা। কাজের লোকজনকে জেরা করা হয়। সন্দেহ হয় মঞ্জু গুপ্তার উপর। কারণ একমাত্র তাঁর প্রবেশাধিকার ছিল শোওয়ার ঘরে। আলমারির চাবি কোথায় থাকে, সেটাও জানতেন। চুরির মামলা রুজু হয়। তাঁর উপর যাতে সন্দেহ না হয়, সে কারণে মামলা রুজুর পরেও ব্যবসায়ীর বাড়িতে কাজ করে যাচ্ছিলেন মঞ্জু। অবশেষে গত পয়লা আগস্ট ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনে ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৩ আগস্ট মঞ্জুর (বেনামে) কসবার দুটি ফ্ল্যাটে (৭০/৪, শরৎ ঘোষ রোড এবং ৩৪/এন, নবীন কৃষ্ণ ঘোষাল রোড) অভিযান চলে। উদ্ধার হয় চারটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি এবং তাতে জমা পড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের খোঁজ মেলে। প্রতিমাসে লক্ষ লক্ষ টাকা জমা পড়েছে অ্যাকাউন্টে। আয়কর রিটার্ন সংক্রান্ত কাগজপত্রও মেলে। তাতে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ৯ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ৯ লক্ষ টাকার আয়কর মঞ্জু জমা দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে একজন বেতনভুক পরিচারিকা এত টাকা আয়কর দিলেন, তার খোঁজ নিতে গিয়েই গয়না চুরির সংস্রব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে পুলিসের দাবি। কসবায় মঞ্জুর ওই দুটি ফ্ল্যাটের একটির দাম ৫০ লাখ এবং অন্যটির দাম ৬৫ লাখ টাকা। মঞ্জুর আইনজীবী দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মক্কেলের বিরুদ্ধে দু’কোটি টাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী চিত্র।