Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নানা কল্পনায় বঙ্গধাত্রী জগদ্ধাত্রী

সময়টা ১৮৭৫। দেড়শো বছর পিছিয়ে দেবী জগদ্ধাত্রীর বিশেষ অর্চনাকালে আমরা পৌঁছে যেতে চাইছি। বাঁকুড়ার জয়রামবাটীর সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী মা সারদা দেবীর বাড়িতে সেই বছর প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো হয়।

নানা কল্পনায় বঙ্গধাত্রী জগদ্ধাত্রী
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: সময়টা ১৮৭৫। দেড়শো বছর পিছিয়ে দেবী জগদ্ধাত্রীর বিশেষ অর্চনাকালে আমরা পৌঁছে যেতে চাইছি। বাঁকুড়ার জয়রামবাটীর সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী মা সারদা দেবীর বাড়িতে সেই বছর প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। এই পুজোর প্রচলক ছিলেন মায়ের মা শ্যামাসুন্দরী দেবী, যাঁর কাছে জগদ্ধাত্রী হয়ে গিয়েছিলেন জগাই। জামাই শ্রীরামকৃষ্ণ পুজোর কথা জানতে পেরে আনন্দিত মনে মঙ্গল কামনা করেছিলেন। পুজোর সংকল্প প্রথম চার বছর শ্যামাসুন্দরী দেবী, পরবর্তী চার বছর সারদা মায়ের নামে করা হয়েছিল। টানাটানির সংসারে দুইবার শ্রীমা এই পুজো বন্ধ করে দিতে চাইলেও শেষপর্যন্ত স্বয়ং দেবী জগদ্ধাত্রীর জন্যই তা সম্ভব হয়নি। ১৯০৮ সালে মায়ের একটি চিঠি থেকে জানা যায় যে, তাঁর পাওয়া পাঁচ টাকা তিনি পুজোয় দিয়েছিলেন। পুজোর রান্নাসহ নানা বিষয়ে তদারকির পাশাপাশি দীক্ষাদানের কার্যও সমাধা করতেন সারদা মা। তিনদিনের পুজোতে যাত্রা অভিনয়ও হতো। ব্রহ্মচারীরা এসে জগদ্ধাত্রীকে গান শোনাতেন, শ্রীমায়ের ইচ্ছা অনুসারে।    

Advertisement

সারদা মায়ের পুজোর পরে একজন রত্নগর্ভা মায়ের জগদ্ধাত্রী পুজোর কথায় আসি। নামে তিনিও জগদ্ধাত্রী, শ্রীরামকৃষ্ণ যাঁকে ক্ষীরসমুদ্র বলতেন, তিনি বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী। একবার বীরসিংহ গ্রামে তাঁর বাড়িতে সিংহবাহিনী জগদ্ধাত্রীর পুজো হচ্ছে। গুণসাগর পুত্র বাবার কথামতো পুজোয় বাদ্যসহ আড়ম্বর, জাঁকজমক, ধুমধামের কমতি রাখলেন না। আবার মায়ের ইচ্ছায় ভরপুর কাঙালিভোজনও করালেন। যদিও এই ভগবতী দেবীই একবার ছেলের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, রোজ অন্নহীনদের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারলে বছর বছর ছয়-সাতশো টাকা ব্যয় করে পুজো করার কোনও প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে বিশ্বকবি একথা জানতে পেরে পরম আশ্চর্য হন। আসলে সেই অসাধারণ গ্রামীণ কন্যা-জায়া-জননী মানুষের হাতে গড়া বাঁশ-খড়-দড়ি-মাটির প্রতিমাকে জীব-উদ্ধারকারী বলে হয়তো পরিস্থিতির কারণে ভাবতে পারতেন না।
দুই মায়ের ইচ্ছায় জগদ্ধাত্রী পুজো পালনের কথা আমরা জানলাম। এইবার এক কন্যার জন্য জগদ্ধাত্রী পুজো বন্ধ হওয়ার কথা জানব। মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরবাসী সাবজজ রাধাকৃষ্ণ সেনের বাড়িতে বহু বছর ধরে জগদ্ধাত্রী পুজো হতো। তাঁর বাল্যবিধবা কন্যা বিন্দুবাসিনীর ইচ্ছা অনুসারে ১৮৯৬ সাল নাগাদ বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয় এবং জগদ্ধাত্রী পুজো বন্ধ হয়ে যায়। একে কন্যার ইচ্ছায় রূপভেদে মায়ের এক মাস আগেই আগমন বলা যেতে পারে। জগদ্ধাত্রীর পুজো সেই বাড়িতে তখন না হলেও তাঁর জন্য পালিত একটি প্রথা দুর্গাপুজোয় আজও রয়ে গিয়েছে। অতীতের পারিবারিক রেশমের কারবারের কারণে বিসর্জনের আগে মায়ের পায়ের সিঁদুর তোলার সাধের কৌটোয় আজও রাখা হয় এক টুকরো রেশমি কাপড়।  
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে দুইজন বাঙালি, জগদ্ধাত্রীকে মাধ্যম করে ধর্মের বেড়াজাল যেন কেটে দিয়েছিলেন। প্রথমজন বিদ্যাসাগরের প্রিয় পাত্র মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং দ্বিতীয়জন বিশ্বকবির আপনজন কাজী নজরুল ইসলাম। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম মধুকাব্য ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’-র অন্তিম তথা চতুর্থ সর্গে দেবী তিলোত্তমা প্রসঙ্গে তিনি জগদ্ধাত্রীর উপমা ব্যবহার করেছেন। কবিলেখনী আমাদের জানিয়েছে,‘যেন জগদ্ধাত্রী আদ্যাশক্তি মহামায়ে!’
কাজী নজরুলের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের শেষ গীতিসংকলন হল ‘গানের মালা’ বই। তার ৪৪ সংখ্যক গানে জন্মভূমি দেশমাতার সঙ্গে দেবীকে মিলিয়ে গীতিকার লিখেছেন,‘আদি জগদ্ধাত্রী তুমি জগতের প্রথম প্রাতে/শিক্ষা দিলে দীক্ষা দিলে করলে মানুষ আপন হাতে।’ কোথাও যেন এর সঙ্গে বঙ্কিমী ‘বন্দেমাতরম্’ গানের ধারক ‘আনন্দমঠ’-র মন্দিরে প্রথম মাতৃমূর্তি দর্শনের প্রতিক্রিয়া সম্মিলিত হয়ে যায়। ভোলা যায় না ব্রহ্মচারীর সেই অমোঘ উক্তি,‘মা—যা ছিলেন।’ 
আসি ঠাকুরবাড়ির কথায়। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির নাটমন্দিরে তখন জগদ্ধাত্রী পুজো হতো। সেই প্রতিমার মুখ বানানো হতো রবীন্দ্র-পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরী দেবীর আদলে। লোকে তাঁকে সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী বলত। তাঁর মুখের পাশাপাশি পদযুগলও উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে পুত্র ব্রাহ্ম-মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ অপৌত্তলিক হয়ে গেলেও নাতি রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বোন’(১৯৩৩) উপন্যাসে আমরা হঠাৎ করে দেবী জগদ্ধাত্রীর দেখা পেয়ে যাই। জগৎ ও তার ধাত্রী জগদ্ধাত্রীর নিদর্শন ঔপন্যাসিক ব্যবহার করেছেন শশাঙ্ক এবং তার অসুস্থ স্ত্রী শর্মিলা প্রসঙ্গে—‘আজ ভয় হচ্ছে মৃত্যুর দূত এসে জগৎ আর জগদ্ধাত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায় বুঝি বা।’
এই জগদ্ধাত্রী নিয়ে লেখার শুরুতেও দেড়শো, শেষেও সেই দেড়শো। হৈমন্তিক এই আরাধনার সূত্রে আরতি হোক সার্ধশতবর্ষীয় শরৎস্মৃতির। ভাগলপুরে ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মামার বাড়ি। সেখানে ধুমধাম করে জগদ্ধাত্রী পুজো হতো। সেই উপলক্ষ্যে বসত সাহিত্যবাসর। একবার শারদশেষের সে উৎসবে রবীন্দ্রনাটক ‘শারদোৎসব’ অভিনীত হলে শরৎচন্দ্র মুগ্ধ হয়ে যান। আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯২৫ সালে বৃদ্ধ ভোলাকে নিয়ে পুজোয় গিয়ে তিনি আটকে পড়েছিলেন। পুজোবাড়ির ‘খাদ্য ও অখাদ্য’ খেয়ে ভোলার জ্বর আর পিলের ‘শ্রীবৃদ্ধি’ ঘটে হয়েছিল কালাজ্বর। 
মামার বাড়ির এই পুজোতেই শরৎবাবুর সঙ্গে একবার একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তিনি নিমন্ত্রিতদের খাবার পরিবেশন করতে গেলে হঠাৎ নিমন্ত্রিতরা আপত্তি তোলেন। যেহেতু বিলাতফেরতা স্থানীয় রাজার সঙ্গে শরৎচন্দ্র মিশতেন ও ক্লাব করতেন, তাই তাঁর হাত থেকে খাদ্য গ্রহণে অতিথিদের মধ্যে আপত্তি উঠেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যথিত হয়ে তিনি নাকি কিছুদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যান। 
যাই হোক, শরৎজীবনের সেই ঘটনার প্রতিচ্ছবি শরৎসাহিত্যেও আমরা পাই। জগদ্ধাত্রীও সেখানে রয়েছেন, তবে দেবীরূপে নয়, রক্তমাংসের চরিত্ররূপে। ১৯২০ সালে প্রকাশিত ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসে জগদ্ধাত্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে কালাপানি পার করা বিলাতযাত্রী অরুণ চক্রবর্তীর আসা-যাওয়াকে ভালো চোখে দেখেননি গোঁড়া রাসমণি। অরুণবাবুর বৈঠকে জগদ্ধাত্রীর স্বামীর যোগদানকেও তিনি নিন্দা করেছেন। শরৎচন্দ্রের এই জগদ্ধাত্রী কিন্তু দেবীরূপা হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর সংস্কারাচ্ছন্নতা ও নানা পশ্চাদধর্মী মনোভাবের কারণে কন্যা ও স্বামী শেষপর্যন্ত তাঁকে ত্যাগ করেন। অর্থাৎ এই জগদ্ধাত্রী কারও ধাত্রী হতে পারেননি। এই নাম ব্যবহার করে যেন এক বিপ্রতীপ বৈশিষ্ট্যের জগদ্ধাত্রীকে এঁকেছিলেন শরৎচন্দ্র। এভাবেই কি জগদ্ধাত্রী পুজোয় অল্প বয়সে পাওয়া অপমানের ভার লাঘব করেছিলেন তিনি?
 লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ