বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: ১২২৭টি পদ। আবেদন ৮০৪৯! পদের তুলনায় আবেদন প্রায় ৭ গুণ বেশি। স্বাস্থ্যদপ্তরে জেনারেল ডিউটি মেডিকেল অফিসার (জিডিএমও) পদে গত ১০ বছরে এ চিত্র শেষ কবে দেখা গিয়েছিল, মনে করতে পারছেন না স্মৃতিধর চিকিৎসকরাও। আগস্টে সরকারি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ঠিক এটাই ঘটেছে।
২০২১ সালে শেষবার নিয়োগের সময় মোট পদ পূরণই হয়নি। ৯০-এর দশক থেকে ২০২১ সাল পর্যন্তও এটাই রেওয়াজ ছিল। জিডিএমও মানেই তো প্রত্যন্ত গ্রামে যেতে হবে। কম বেতন, ভাঙাচোরা কোয়ার্টার, ছাদ ফুটো হয়ে জল, নিরাপত্তার বালাই নেই, সর্বোপরি বাড়ি থেকে বহু দূরে বিনা গ্ল্যামারের সরকারি চাকরি! এসব বাস্তব-কল্পনা মেশানো ধ্যানধারণা এবং উন্নততর বিকল্পের সন্ধানে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া দূরস্থান, আবেদনই করতে চাইতেন না সিংহভাগ তরুণ চিকিৎসক।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদস্থ আধিকারিক বলেন, ‘যতজন চাকরি পেতেন, তার মাত্র ৩০ শতাংশ জয়েন করতেন ৯০- ২০০০ পর্যন্ত সময়ে। তারপর তা একটু বেড়ে হল ৪০ শতাংশ। ২০২০-২১ সালে গড়ে ৫০-৬০ শতাংশ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই পরিসংখ্যান, যতজন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেলেন, তার মধ্যে। পদের তুলনায় কম আবেদন জমা পড়েছে, এমনও হয়েছে। মাসে মাসে কিছু চাকরি, তিন মাস অন্তর চাকরি, তারপর ৬ মাস অন্তর নিয়োগ, শেষে বছরে একবার নিয়োগ—সবক্ষেত্রেই এই পরিসংখ্যানের সামান্যই বদল হত।’
এবারে তাহলে হলটা কী? ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বর্তমানে রাজ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৩৫। এমবিবিএস আসন ৬ হাজারেরও বেশি। প্রতি ৫ বছরে ৩০ হাজার নতুন ডাক্তার বের হচ্ছেন। সেই তুলনায় চাকরি কই! সরকারি চাকরি করব না, সেই গুমর দেখানোর জায়গাই আর নেই। দ্বিতীয়ত, চাহিদার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়েছে। তাই যে পেশাজীবীরা এক দশক আগেও অনেকটা নিশ্চিন্তি ও সমৃদ্ধির জীবন অতিবাহিত করতেন, সেই পেশারই তরুণ ও মাঝবয়সি চিকিৎসকদের অনেকে এখন মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকার চাকরির খবর পেলেও ছুট দিচ্ছেন।
দক্ষিণবঙ্গের একাধিক ব্লকে কাজ করে সদ্য এক সরকারি মেডিকেল কলেজে যোগ দেওয়া তরুণ চিকিৎসক বলেন, ‘এখন গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অনেক ভালো। আগের তুলনায় বেতনও ভালো। চাহিদার থেকে এমবিবিএস, এমডি-এমএস, ডিএম-এমসিএইচ সর্বস্তরেই চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়েছে। আগামী ১০ বছরে পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন হবে। তাছাড়া এবারে প্রায় ৪-৫ বছর পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বেরল। এর মধ্যে ২০ হাজার নতুন চিকিৎসক বেরিয়েছেন। আগে চাকরি না পাওয়া আরও ১০ হাজার আছেন। ৩০ হাজার ‘বেকার’ ডাক্তারের মধ্যে ৮ হাজার আবেদন হবেই। ডাক্তারি পেশায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছায়া দেখে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন অনেকেই।’
আগস্টে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড ১২২৭ জন জিডিএমও নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়। ২১ ডিসেম্বর পরীক্ষা হয়। ২৭৮৮ চিকিৎসক ইন্টারভিউতে ডাক পেয়েছেন। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ইন্টারভিউ হতে পারে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এমনই জানিয়েছেন এক বোর্ড কর্তা। পোড়খাওয়া আধিকারিকদের একাংশ জানান, মাসের পর মাস ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া চললে চিকিৎসকদের মধ্যে বিরক্তি বাড়ে। সরকারি চাকরিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে দরকার সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিয়োগ।