Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পুজোর এই আনন্দবন্যায় বাকি সব মিছে

বাঙালির দুর্গাপুজো বাধা মানে না। প্রকৃতির হাজারো প্রতিকূলতা, আকাশের মুখভারও দশ গোল খায়। রাজনীতি দুয়োরানি হয়ে যায়।

পুজোর এই আনন্দবন্যায় বাকি সব মিছে
  • ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: বাঙালির দুর্গাপুজো বাধা মানে না। প্রকৃতির হাজারো প্রতিকূলতা, আকাশের মুখভারও দশ গোল খায়। রাজনীতি দুয়োরানি হয়ে যায়। শুক্রবার দুপুরে যখন মুষলধারে বৃষ্টিতে চারদিক অন্ধকার, তখন কলকাতার হাডকো মোড়ে দাঁড়িয়ে কচিকাঁচা, একটু বড় থেকে সদ্য যৌবনে পা দেওয়াদের চলমান মিছিল দেখছিলাম শ্রীভূমির দিকে। আর একটা দল আবার যাচ্ছিল তেলেঙ্গাবাগান ছুঁয়ে আহিরীটোলা, হাতিবাগানের দিকে। এক কিশোর জিজ্ঞেস করল, এখান থেকে এক বাসে একডালিয়ার পুজোয় যাওয়া যাবে? কী অসম্ভব প্রাণশক্তি! ঝড়ঝঞ্ঝা, প্রলয় যাই আসুক কুছ পরোয়া নেই! বৃষ্টিতে ভিজে সদ্য পাট ভেঙে পরা জামাকাপড়ে জলকাদা মেখেই প্যান্ডেল হপিংয়ে আট থেকে আঠাশ। পিছিয়ে নেই বড়রাও। এজন্য কোনও বিজ্ঞাপন, প্রচারের দরকার হয় না কোনওকালে। মাইকে হাঁকতে হয় না বারংবার। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার সাঁটতে হয় না। প্রয়োজন হয় না মিছিলেরও। নতুন ক্যালেন্ডার এলেই যত্নে দাগ দিয়ে রাখে বাঙালি। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে একটা এগরোল, চাউমিনও ভাগ করে খায় তেঁতুল পাতার ৯ সুজন। হিসেব কষে বাকি পয়সায় বিরিয়ানিটাও হবে নাকি! পাশাপাশি বাইক স্কুটিতে হাত ধরাধরি করা যুবক যুবতীর গোল্লাছুটের ছবিও দেখলাম প্রায় মধ্যরাতে অ্যাপোলো হাসপাতালের সামনে বাড়ি ফেরার সময়। যেন চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি! রাজনীতির রেষারেষি, বিভেদের ৮০ ফুট পাঁচিল, ধর্ম-জাতপাত এই মনটাকে এখনও পেড়ে ফেলতে পারেনি। যার কিছু নেই তার চোখেও কেমন আশার ঝিলিক! যার অনেক আছে সেও দামি চারচাকা থেকে নেমে সাধারণের ভিড়ে মিশে গিয়েছে কখন!

Advertisement

বছর কয়েক আগে বর্ষণসিক্ত অষ্টমীর সন্ধ্যায় দামি সিল্ক আর হিলতোলা জুতোয় জনৈক বনেদি বাড়ির মহিলাকে জলকাদার মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম দেশপ্রিয় পার্কে। অন্যসময় ভরা বর্ষণের রাতে ওই বেশে পার্কের ভেতর তাঁকে ভাবাই যায় না। পুজো বলেই কাদা জল গায়ে লাগে না, গায়ে মাখে না। জল ঝরনার চেয়ে আনন্দ বর্ষণের রং যে অনেক গভীর পর্যন্ত যায়। গত সোমবার রাতে সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধকে লাঠি হাতে হালকা বৃষ্টিতে টালা প্রত্যয়ের ঢোকার লাইনে দেখলাম। সুগারের ওষুধটা কাল ফুরচ্ছে কি না, ইসিজিটা আর একবার করার প্রয়োজন কতটা, তার খোঁজ ছেড়ে তিনি কেমন অপলকে ঠাকুর দেখার অন্বেষণে। এটাই স্পিরিট। এই ভুবন ভোলানো অনাবিল অনুভূতির মৃত্যু হয় না যুগ যুগ ধরে। কিংবা যার সঙ্গে খুব ঝগড়া মুখ দেখাদেখি নেই, সেও যখন হাত ধরে বলে ভালো আছ তো! বছরকার দিনে বিরোধ মনে রাখতে নেই। স্থান পরিবর্তনে প্যান্ডেল, থিম বদলে গেলেও একই ছবি শ্রীভূমি, চেতলা অগ্রণী, সুরুচি সংঘ ছাড়িয়ে জেলা শহর, প্রত্যন্ত গ্রামে। ধনী দরিদ্র প্রবীণ নবীন কোনও দাঁড়ি টানা যায় না ঠাকুর দেখার এই আবহমান লাইনে। পুজোর ছোটোবড়োও হয় না। লাল নীল সবুজ হলুদ মিলেমিশে সব এখানে একাকার। বাঙালির চিরকালীন চালচিত্র।
বাঙালির উৎসব রাজনীতি মানে না। সংখ্যাগুরু ও লঘুর দূরত্বে সায় দেয় না। দু’তরফেই হাতে হাত দিয়ে চেটেপুটে নেয় আনন্দ। তোয়াক্কা করে না বিভেদ বিভাজনের অসুরের। এবার ভোট আছে বলেই গেরুয়া মরশুমি পাখিদের আনাগোনা বেড়েছে পুজোর আঙিনাতেও। কুড়িতেও বেড়েছিল। একুশ-বাইশে ভাটা, তেইশ থেকে আবার মাথা তোলা। আবার চলতি মরশুমে হাওয়াই জাহাজ উড়িয়ে এসে উদ্বোধনের ধুম। ভিনদেশি সেই রাখাল ছেলে থুড়ি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! সঙ্গে ফাউ বাংলা দখলের ব্লুপ্রিন্ট। সোনার বাংলার ধূসর খোয়াব। একটার সঙ্গে একটা ফ্রি! কিন্তু বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব এই রাজনীতিকে বড় একটা পাত্তা দেয় না। এই ক’দিন সবার একটাই পরিচয়, আমি বাঙালি। এই উৎসবে অসুর বলুন ভিলেন বলুন একটাই, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি! আপাতত তাকে হারাতেই মরিয়া সবাই। তারপর মোকাবিলা এপ্রিলের ভোটে শুম্ভ-নিশুম্ভের!
গত মঙ্গলবার ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুর দু’টো। রাতভর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি থেমে গিয়েছে ৬ ঘণ্টারও বেশি। জল থইথই গোটা কলকাতা। উত্তর থেকে দক্ষিণ। আগের রাতে প্রায় বিনা নোটিশে কয়েক ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি! মেঘ ভাঙা বৃষ্টির পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ আবহাওয়া দপ্তর। শুধু কলকাতা কেন দেশের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমেরও বহু কুলীন শহরের অবস্থা হতো এমনই। চলতি বর্ষায় একের পর এক ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যের নিকাশি ব্যবস্থার হাল তো টের পেয়েছি আমরা। প্লাবন ধ্বংসলীলা লোকক্ষয়ের গ্রাসে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হিমাচল! দু’হাতে লাড্ডুর দেশে জল ভ্যানিশ করার কোনও যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তাই কোনও ফারাক খুঁজে পাওয়া যায়নি তো। সেই থেকেই আক্কেল গুড়ুম!
গত মঙ্গলবার বিধাননগর স্টেশন থেকে হাডকো মোড়ের দিকে এগোচ্ছি সবে। গোটা রাস্তাটাই একরাতে কেমন অচেনা নদীর চেহারা নিয়েছে। মনে হচ্ছিল, যেন এই প্রথম এজন্মে না দেখা বিস্তীর্ণ কোনও জলভূমির মোহনার বাঁকে এসেছি। মওকা বুঝে ছেলেরা ভ্যানরিকশয় কোমর জল পার করছে মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকায়। পুজোর মুখে দু’পয়সা বাড়তি রোজগারে তারা বেজায় খুশি। এ যদি বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া শহরের কতিপয় ভ্যানচালকের পৌষমাসের চিত্র হয় তবে একের পর এক দোকানে জামাকাপড়, ট্র্যাভেলার ব্যাগ, ওষুধপত্র, বইখাতা ভেসে যাওয়ার সর্বনাশের ছবিও বড় কম নয়। কোনও বুদ্ধিজীবী আশিটা বসন্ত পেরিয়ে এই প্লাবনকে ‘ভেনিস’ বলে কটাক্ষ করতেই পারেন, কেউ আর একটু এগিয়ে ‘দুয়ারে টেমস’ বলেও বিদ্রূপ জুড়তে পারেন। এটা তাদের মৌলিক অধিকার! কেউ বলতেই পারেন, ’৭৮ সালের বাম আমলের বন্যার রিপ্লে যেন! ১৯৮৭ সালেও এমন বানভাসি কলকাতা দেখেছিল এ শহর। প্রবীণদের স্মৃতিতে সেই দুর্ভোগ এখনও টাটকা। প্রকৃতির মারে কারও হাত নেই। সে ধনী দরিদ্র শিক্ষিত অশিক্ষিতও বোঝে না। কিন্তু দু’বারই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সপ্তাহ গড়িয়ে গিয়েছিল কল্লোলিনীর। আটাত্তরের পুজো কেমন কেটেছিল, জল নামতে কতক্ষণ লেগেছিল সবার জানা। 
আর এবার? দ্রুত সব স্বাভাবিক। সেদিন অফিস থেকে মধ্যরাতে যখন বাড়ি ফিরছি উল্টোডাঙার কোমরসমান জল কখন উধাও! বড়ো রাস্তাগুলো অধিকাংশই স্বাভাবিক। চারচাকার গাড়ি আর বাইকে বাইপাস থেকে শ্রীভূমির পুজো দেখার দৌড় শুরু হয়ে গিয়েছে। এত তাড়াতাড়ি কলকাতায় উৎসবের আমেজ ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব দেবেন না প্রশাসন ও পুরসভাকে? এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিম তদারকি করছেন পরিস্থিতির, এই উদ্যোগ বাহবা পাওয়ার যোগ্য নয় কি? আগে কেউ দেখেছে? শুধু তাঁর টিশার্টের দাম নিয়ে বাজার গরমের চেষ্টা চলবে। মেয়র শতছিন্ন গেঞ্জি গায়ে জলে নামলে কলকাতার মর্যাদা বাড়ত? নাকি ৬ মাস পরে ভোট বলে এসবের কোনও মূল্যই নেই। এই হীন রাজনীতিকে ধিক! শুধু আমরা ওরার উতোরচাপানে ডুবে আর কত প্রহর শেষ হবে বাঙালির! সাদাকে সাদা কালোকে কালোও বলা যাবে না! 
এটা ঠিক, নিকাশির সমস্যা আছে। নিয়মিত সাফসুতরো হয় না, তাও সত্যি। পুরসভাকে আরও সক্রিয় হতে হবে, এটাও বাস্তব। কিন্তু একইসঙ্গে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, শত সহস্রবার বারণ করা সত্ত্বেও আমরা রোজ নর্দমায় প্লাস্টিক, আবর্জনা, চায়ের ভাঁড়, ভাঙা বালতি, সবজির খোসা, এমনকি পুরনো গদি তোষক বালিশও ফেলছি বিনা দ্বিধায়। কিছুদিন আগে এক সন্ধেবেলা বিটি রোড দিয়ে যাচ্ছিলাম। সিঁথির মোড় পেরতেই দেখি ওই রাতেও নিকাশি সাফ করছে কয়েকজন। পাশেই কাদা মাখা একটা তোষক পড়ে। যাঁরা সাফ করছিলেন তাঁরা জানালেন, এসব যদি মানুষ নর্দমায় ফেলে তাহলে জল কী করে যাবে বলুন তো দাদা! সব পুরসভার দোষ! রোজ সমস্ত ম্যানহোল খুলে নামা সম্ভব? তা বলে পুরসভার হয়ে মোটেই সাফাই গাইছি না। সাফাই দেওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই কলকাতার একমাত্র বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি’র হয়েও। হঠাৎ আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে জল জমতেই পারে। একসঙ্গে এতগুলো দিনআনা দিনখাওয়া মানুষের মৃত্যুও নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। তার সমালোচনা করুন, কিন্তু সস্তা রাজনীতি করবেন না। কলকাতার জল জমা, লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া, চাকরি না পেয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া, বড় শিল্পের না আসা যদি সত্যি কোনও ইস্যু হতো তাহলে বামেরা গলার শিরা ফুলিয়ে ৩৪ বছর রাজত্ব করতে পারত না। অনেক আগেই বিদায় নিতে হতো। বেকার ভাতা বিলিয়ে আর ক্যাডার পুষে বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকার খোয়াব ভেঙে যেত অন্তত আরও একদশক আগেই। বিশ্বাস বাড়ির বড় ছেলেটা চেন্নাইতে বড় আইটি সংস্থায় কাজ করে। বাড়ি ফেরে শুধু ফি বছর পুজোয়। সে রাজ্য ছেড়েছে দু’হাজার সালে। বুদ্ধদেববাবুর সিঙ্গুর ভাবনার ছ’বছর আগে। তখন কম্পিউটার দেখলেই বামপন্থীরা তাড়া করত। তাহলে এই শিল্পহীনতার দায় কার? 
উৎসব সমাগত। কলকাতা সহ গোটা রাজ্যে সর্বশক্তিমানের আরাধনায় থিমের ছড়াছড়ি। এসময় রাজনীতি চলে না। দল-মত-বিশ্বাস ছাপিয়ে একটা আশ্চর্য মেলবন্ধন। এই আনন্দযজ্ঞে কেউ ধর্ম জাত পরিচয় দেখে না। আবার বলছি, আমাদের একটাই পরিচয় বাঙালি। ঐক্যবদ্ধ থাকুন, শান্তিতে পুজো কাটান। গরিব মানুষের দুর্দশা আর অসহায়তা যে দেশে রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি সেখানে জনগণকে সতর্ক থাকতেই হবে। খুব মজা করুন আর উৎসবের দিনগুলোয় সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্রে ঠাকুরের সামনে বসে মা দুর্গাকে স্মরণ করে ‘শ্রীশ্রী দুর্গা সহায়’ জপ করুন। কথাতেই আছে দুর্গা নাম জপ করলে সব বিপদ কেটে যায়। মা ঠাকুমারা ওই জন্যই বাড়ি থেকে বেরনোর সময় ‘দুগ্গা দুগ্গা’ বলেন। আজও চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। বর্গিরাও ওই নামে পালায়, বাইরে থেকে আসা রাজনীতির অনুপ্রবেশকারীদের লুণ্ঠনও রুখে দেওয়া সম্ভব হয় ওই নামে। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্লাবনের সামনে একদল ক্ষমতালোভী আর একদল ক্ষমতাভোগীর দ্বন্দ্বও হার মানতে বাধ্য। বাঙালির আত্মজাগরণের উচ্চকিত এই অপূর্ব আলোর সামনে প্রাত্যহিক রাজনীতি বড়ই ঠুনকো।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ