কীভাবে যাবেন: মেঘালয়ের সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলে পৌঁছাতে হবে ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে। ফুলবাড়ির চর থেকে গাড়ি যাবে আরও কিছুটা পথ। বাকি গন্তব্যে পৌঁছাতে গেলে হাঁটতে হবে। এই গাড়ির ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখাই শ্রেয়।
কীভাবে যাবেন: মেঘালয়ের সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলে পৌঁছাতে হবে ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে। ফুলবাড়ির চর থেকে গাড়ি যাবে আরও কিছুটা পথ। বাকি গন্তব্যে পৌঁছাতে গেলে হাঁটতে হবে। এই গাড়ির ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখাই শ্রেয়।
যাত্রাটার কথা মাথায় এসেছিল একটা সাধারণ মানচিত্র দেখতে দেখতে। অসমের ধুবড়ি জেলার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, ব্রহ্মপুত্রের ওপারে, মেঘালয়ের সীমান্তঘেঁষা যে সবুজ অঞ্চল মানচিত্রে প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে, সেখানে কী আছে— এই প্রশ্নটাই আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল অনেকদিন ধরে। কেউ কেউ বলেছিল, ওদিকে নাকি পুরানো এক বৌদ্ধস্তূপ আছে, জঙ্গলের গভীরে, যার নাম কোনো পর্যটন মানচিত্রে নেই। কেউ আবার বলেছিল, ওখানে একটা জলপ্রপাতও আছে, যেটা দেখতে গেলে পুরো একটা দিন হাতে নিয়ে বেরতে হয়। এই দুটো গল্প জোড়া লাগিয়ে একদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম— যেতেই হবে।
এক ভোরে, তখনও চারদিক অন্ধকার, ধুবড়ি শহরের ছোট্ট একটা হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। শহরটা তখনও ঘুমিয়ে, শুধু চায়ের দোকানের উনুন থেকে ধোঁয়া উঠছে আর দুয়েকজন রিকশাচালক বসে আছেন। ঘাটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বাতাসে একটা ঠান্ডা টের পেলাম। ঘাটে পৌঁছে দেখি, ব্রহ্মপুত্র তখনও প্রায় অদৃশ্য— শুধু জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা যাচ্ছে অন্ধকারের ভিতর থেকে। একটা ছোট্ট কাঠের নৌকা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। মাঝি বয়স্ক মানুষ, নাম বললেন না, শুধু বললেন ‘চলেন বাবু, দেরি হলে ভালো হবে না, বাতাস বাড়বে দুপুরের দিকে।’
যাত্রা শুরুর আগের রাতে ঘুম আসেনি ঠিকমতো। মনের ভেতর একটা অস্থিরতা কাজ করছিল— এই ধরনের অচেনা পথে বেরনোর আগে যা প্রায় সবারই হয়। মানচিত্রে যতটুকু দেখেছিলাম, তার বাইরে বাস্তবে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। শুধু স্থানীয় দুয়েকজন পরিচিতের মুখে শোনা গল্প আর কিছু অস্পষ্ট বর্ণনা— এটুকু সম্বল করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম।
নৌকায় উঠে বসতেই মনে হল, এই বিশাল জলরাশির সামনে মানুষ কতটা ছোটো। নদীর দুই পাড় এত দূরে যে অন্ধকারে বোঝাই যাচ্ছিল না কোথায় শেষ, কোথায় শুরু। মাঝি নিঃশব্দে বৈঠা চালাচ্ছিলেন, আর আমি চুপ করে বসে সেই নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিলাম। মাঝেমধ্যে দূর থেকে কোনো পাখির ডাক ভেসে আসছিল, নয়তো কোনো মাছধরা নৌকার আবছা আলো দেখা যাচ্ছিল জলের ওপর। প্রায় আধঘণ্টা পর আকাশের রং বদলাতে শুরু করল। প্রথমে ধূসর, তারপর হালকা বেগুনি, তারপর হঠাৎ করেই পুবের আকাশ লাল হয়ে উঠল। মাঝনদীতে পৌঁছে বুঝলাম, ব্রহ্মপুত্র আসলে একটা নদ নয়, বহু জলধারার সমষ্টি— ছোটো ছোটো চর, বালুচর, জলধারা মিলিয়ে যেন একটা জলজ গোলকধাঁধা। মাঝি বললেন, বর্ষার সময় এর রূপ পুরো আলাদা হয়ে যায়, তখন এই চরগুলোর অনেকটাই ডুবে যায়, আর মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেয়। শীতের সময় নদ শান্ত থাকে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা নৌকা চালানোর পর দূরে দেখা গেল ফুলবাড়ির চর। প্রথমে মনে হল একটা লম্বাটে সবুজ রেখা, কাছে যেতেই বোঝা গেল সেটা আসলে একটা গোটা জনপদ— নদীর বুকে জেগে ওঠা বিশাল বালুচর, যেখানে মানুষ ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করে। নৌকা থেকে নেমে পা রাখতেই বালির নরম স্পর্শ টের পেলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, ধানখেত, কুমড়োর মাচা, ছোটো ছোটো বাঁশের ঘর, আর সেসব ঘরের সামনে হাঁস-মুরগি চরে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে দূর থেকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, বোধহয় বহিরাগত মানুষ দেখতে অভ্যস্ত নয় তারা।
চরের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক বৃদ্ধ কৃষকের সঙ্গে দেখা হল। তিনি নিজের উঠোনে বসে জাল বুনছিলেন। চারপাশে এমন নানা দৃশ্য দেখতে দেখতে চর পেরিয়ে দক্ষিণমুখী একটা মেঠো পথ ধরলাম, যেটা ধীরে ধীরে শক্ত মাটির রাস্তায় মিশে গেল। এখানেই আগে থেকে ঠিক করা একটা গাড়ি অপেক্ষা করছিল, স্থানীয় এক চালক নিয়ে যাবেন মেঘালয়ের সীমান্তের দিকে। গাড়িতে উঠে বসতেই বুঝলাম, ভূমির চরিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সমতল জমি আস্তে আস্তে ঢেউ খেলানো টিলায় পরিণত হচ্ছে, রাস্তার দুপাশে সুপারি আর কলাগাছের সারি, আর দূরে দেখা যাচ্ছে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণি— গাঢ় সবুজ, মেঘে ঢাকা, কিছুটা রহস্যময়ও বটে।
গাড়িচালক বেশ কথায় পটু। জিজ্ঞেস করলাম, এই পথে পর্যটক আসে কি? তিনি হেসে বললেন, ‘খুব কম আসে। যারা আসে, তারা বেশিরভাগই গবেষক, নয়তো ছবি তোলার নেশায় আসে। এই জঙ্গলের ভিতরের জিনিসগুলো এখনও অনেকটাই অজানা।’ এই কথাটা শোনার পর বুকের ভিতর একটা চোরা উত্তেজনা কাজ করতে লাগল— অজানার দিকে এগনোর সেই চেনা শিহরন, যেটা প্রতিটা ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালানোর পর রাস্তা সরু হয়ে এল, একসময় গাড়ি নিয়ে আর যাওয়া গেল না— সামনে ঘন জঙ্গল শুরু হয়ে গিয়েছে। গাড়ি একটা গাছের ছায়ায় রেখে চালক বললেন, ‘এখান থেকে হাঁটতে হবে। পথ চেনা লোক ছাড়া যাওয়া ঠিক নয়।’ ভাগ্যক্রমে সঙ্গে একজন স্থানীয় পথপ্রদর্শক ছিলেন, যিনি এই জঙ্গল আর তার আশপাশের গ্রামগুলো হাতের তালুর মতো চেনেন। তিনি সামনে সামনে হাঁটতে শুরু করলেন, আমি পিছনে।
জঙ্গলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের পৃথিবীটা যেন হারিয়ে গেল। মাথার ওপর গাছের ঘন ছাউনি সূর্যের আলোকে ছেঁকে ফেলছিল, শুধু ফাঁকে ফাঁকে সরু আলোর রেখা এসে মাটিতে পড়ছিল। বাতাসে ভেজা মাটি আর পাতাপচা গন্ধ, আর সেই সঙ্গে অচেনা ফুলের মিষ্টি সৌরভ। পায়ের নীচে শুকনো পাতা মচমচ করে ভাঙছিল, আর মাঝেমধ্যে দূর থেকে অজানা পাখির ডাক ভেসে আসছিল, কখনো বা কোনো প্রাণীর নড়াচড়ার শব্দ। পথপ্রদর্শক মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে কান পাতছিলেন, বলছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না, এইখানে হাতি চলাচল করে মাঝেমধ্যে, তবে এখন দিনের বেলা, ভয়ের কিছু নেই।’ কথাটা শুনে সত্যি বলতে খানিকটা রোমাঞ্চ আর খানিকটা সতর্কতা—দুটোই একসঙ্গে কাজ করছিল মনের ভেতর।
প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর পথ আরও দুর্গম হয়ে উঠল। ছোটো ছোটো নালা পেরতে হল, পাথুরে ঢাল বেয়ে উঠতে হল, আর একবার তো একটা পুরানো গাছের গুঁড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হল সরু জলধারা পেরনোর জন্য। ঠিক তখনই, গাছপালার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল এক সাদাটে আভা। প্রথমে ভাবলাম চোখের ভুল, নয়তো কোনো বড়ো পাথর হবে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি, সেটা সত্যিই একটা মানুষের তৈরি কাঠামো— শ্যাওলা আর লতাপাতায় প্রায় ঢাকা পড়া এক প্রাচীন স্তূপ, যার গম্বুজাকৃতি অংশ এখনও স্পষ্ট বোঝা যায়। পথপ্রদর্শক বললেন, স্থানীয় মানুষজন এটাকে ‘পুরাণ স্তূপ’ বলে ডাকে, আর তাদের পূর্বপুরুষদের মুখে শোনা গল্প অনুযায়ী, বহু শতাব্দী আগে এই পথ দিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা যাতায়াত করতেন— তিব্বত আর ব্রহ্মদেশের মধ্যে যে পুরানো বাণিজ্য ও তীর্থপথ ছিল, এই জঙ্গলও তার একটা অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কেউ কেউ বলেন, এই স্তূপ কোনো সন্ন্যাসীর সমাধিস্থল, আবার কেউ বলেন এটা ছিল পথিকদের বিশ্রামস্থল, প্রার্থনার জায়গা।
স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল। এত বছরের পুরানো একটা কাঠামো, অথচ কোনো সংরক্ষণ নেই, কোনো ফলক নেই, কোনো পর্যটক নেই— শুধু জঙ্গল তাকে আগলে রেখেছে নিজের মতো করে। পাথরের গায়ে হাত রাখলাম, ঠান্ডা আর রুক্ষ স্পর্শ, আর তার ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে ওঠা ছোটো ছোটো গাছ। মনে হল, প্রকৃতি আর ইতিহাস এখানে একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, আলাদা করা যায় না। জঙ্গলের নিস্তব্ধতায়, দূরে কোনো পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম স্তূপের সামনে, কোনো কারণ ছাড়াই, শুধু সেই স্তব্ধতাটুকু অনুভব করার জন্য।
কিছুক্ষণ পর পথপ্রদর্শক ইশারা করলেন আরও এগনোর জন্য। বললেন, ‘আরেকটু গেলেই জলপ্রপাত পাবেন, শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?’ কান পাতলাম, আর সত্যিই দূর থেকে একটা গম্ভীর গর্জন শোনা যাচ্ছিল, যেটা এতক্ষণ জঙ্গলের অন্যান্য শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল বলে আলাদা করে খেয়াল করিনি। শব্দ অনুসরণ করে এগতে লাগলাম, আর প্রতি পা এগনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই গর্জন আরও স্পষ্ট হতে লাগল। শেষ কিছুটা পথ প্রায় খাড়া ঢাল, হাত দিয়ে গাছের ডাল ধরে ধরে নামতে হল। আর তারপর, ঝোপঝাড়ের আড়াল সরে যেতেই চোখের সামনে খুলে গেল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।
উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে একটা জলপ্রপাত, সাদা ফেনার মতো জল আছড়ে পড়ছে নীচের গভীর সবুজ জলাধারে। উচ্চতাটা ঠিক মাপা যায় না চোখে, তবে অনুমান করলাম হয়তো পঞ্চাশ-ষাট ফুট হবে। জলের ছিটে বাতাসে ভেসে এসে গায়ে লাগছিল, আর সেই ঠান্ডা স্পর্শে সারাদিনের পথশ্রম নিমেষে যেন উবে গেল। পথপ্রদর্শক জানালেন, এই জলপ্রপাতের কোনো নাম নেই, অন্তত কোনো সরকারি মানচিত্রে নেই। স্থানীয় গ্রামের মানুষজন নিজেদের মতো একটা নাম ব্যবহার করেন, তবে সেটাও এলাকাভেদে বদলে যায়। কোনো পর্যটন ব্রোশিওরে এর উল্লেখ নেই, ইন্টারনেটে খোঁজ করলেও কিছু পাওয়া যাবে না। এই ভাবনাটা আমাকে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিল—আজকের দিনে, যখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটা কোণ ছবি আর মানচিত্রে বন্দি হয়ে গেছে, তখনও এমন একটা জায়গা টিকে আছে যেটা শুধু হেঁটে আসা মানুষদের জন্যই তোলা রাখা এক গোপন উপহারের মতো।
জলাধারের কাছে বসে থাকতে থাকতে খেয়াল করলাম, জলের রং জায়গাভেদে বদলে যাচ্ছে—কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও প্রায় নীলচে, আর যেখানে জল সরাসরি পাথরে আছড়ে পড়ছে, সেখানে সাদা ফেনার একটা পর্দা তৈরি হচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে একটা বড়ো প্রজাপতি উড়ে গেল, ডানায় নীল আর কালোর অদ্ভুত নকশা।
সময় বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি দিল না। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে এগচ্ছিল, আর ফিরতি পথটাও কম দুর্গম নয়। তাই সেই জলপ্রপাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হল। ফেরার পথে আবার সেই স্তূপের সামনে দিয়ে গেলাম, শেষবারের মতো একবার ফিরে তাকালাম তার দিকে—কে জানে, আবার কবে এই পথে আসা হবে, নাকি আর কখনোই হবে না।
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার পথে একবার থমকে দাঁড়াতে হল—পথপ্রদর্শক হাত তুলে চুপ থাকতে বললেন। কিছুটা দূরে, গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল একটা হরিণের দল ঘাস খাচ্ছে, নিঃশব্দে, সতর্ক দৃষ্টিতে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মুহূর্তেই তারা লাফিয়ে জঙ্গলের গভীরে মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যার আলো নরম হয়ে আসছিল যখন গাড়ি আবার চলতে শুরু করল ধুবড়ির দিকে। রাস্তার দুপাশে টিলাগুলো ধীরে ধীরে আবার সমতলে মিশে যাচ্ছিল, আর দূরে ব্রহ্মপুত্রের একটা রুপালি রেখা চোখে পড়ছিল মাঝেমধ্যে। চর পর্যন্ত ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে গেল। নৌকা আবার তৈরি ছিল, মাঝি এবার অন্য একজন, তবে সেই একই নিঃশব্দ দক্ষতায় বৈঠা চালাচ্ছিলেন। ঘাটে যখন নামলাম, রাত তখন বেশ গভীর।
তন্ময় ধর