Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দুর্নীতির পাঁকে...

সর্ষের মধ্যে ভূতের ছড়াছড়ি। এ দেশে কেন্দ্র অথবা বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি অনেকের ভাষণ শুনলে মনে হবে, এরা সব অন্য গ্রহের বাসিন্দা! আদর্শ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অনুকরণীয় প্রতীক। একটা আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে আপামর জনগণের কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়—তার চলমান ধারাভাষ্য শোনা যায় বছরভর।

দুর্নীতির পাঁকে...
  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সর্ষের মধ্যে ভূতের ছড়াছড়ি। এ দেশে কেন্দ্র অথবা বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি অনেকের ভাষণ শুনলে মনে হবে, এরা সব অন্য গ্রহের বাসিন্দা! আদর্শ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অনুকরণীয় প্রতীক। একটা আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে আপামর জনগণের কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়—তার চলমান ধারাভাষ্য শোনা যায় বছরভর। এসব বোঝাতে আবার ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা আউড়ে চলেন তাঁদের কেউ কেউ। কিন্তু নির্মম সত্য হল, দেশজুড়ে এই মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিদের প্রায় অর্ধেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অপরাধের অভিযোগ হাত ধরাধরি করে চলছে! বাস্তব পরিস্থিতি হল, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার দশা। অথচ ‘দুর্নীতিমুক্ত’ প্রশাসন ও অপরাধমুক্ত দেশই নাকি পাখির চোখ নরেন্দ্র মোদি সরকারের। ক্ষমতায় এসে মোদির সদম্ভ ঘোষণা ছিল, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। তারপর গত এগারো বছরে দেখা গিয়েছে, তাঁর দলে তো বটেই, এমনকী অন্য দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারাও বিজেপি নামক ‘ওয়াশিং মেশিনে’ শুদ্ধ হয়ে দিব্যি কাজ করছেন! একইভাবে সপ্তাহ দুয়েক আগে সংসদে বিল এনে মোদি সরকার বলতে চেয়েছে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে টানা ৩০ দিন জেলে কাটালে প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্র বা রাজ্যের কোনও মন্ত্রী আর পদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু সেই বিল পর্যালোচনার জন্য ১৫ দিনেও যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠন করে উঠতে পারেনি কেন্দ্র! কিন্তু বড় প্রশ্ন এটা নয়। এর থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই মুহূর্তে কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে বিজেপির এক চতুর্থাংশ মন্ত্রীর বিরুদ্ধেই ‘ক্রিমিনাল কেস’ (ফৌজদারি মামলা) চলছে! তালিকায় রয়েছে অনেক রাঘববোয়ালের নাম। তালিকায় খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ছাড়াও রয়েছেন এ রাজ্যের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ও শান্তনু ঠাকুর! একথা ঠিক, অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলে দেগে দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ‘দৈব জন্মপ্রাপ্ত’ নরেন্দ্র মোদি কি জেগে ঘুমান?

Advertisement

এ দেশে ভোটে প্রার্থী হতে গেলে আয়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদির পাশাপাশি কোনও ফৌজদারি মামলা থাকলে তার তথ্যও হলফনামা আকারে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন্দ্র- রাজ্যের মন্ত্রী এবং সাংসদ-বিধায়কদের কারও কারও বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেসের যে ছবি উঠে এসেছে—তা রোমহর্ষক। দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্র-রাজ্য মিলিয়ে দেশের ৪৭ শতাংশ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস রয়েছে। এর মধ্যে ৭২ জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মধ্যে ২৯ জন (৪০ শতাংশ) রয়েছেন! গোটা দেশে বিজেপির মোট ৩৩৬ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১৩৬ জন ‘দাগি’ হিসাবে চিহ্নিত। একইভাবে লোকসভার ৫৪৩ জন সদস্যের মধ্যে ২৫১ (৪৬ শতাংশ) এবং সব রাজ্য মিলিয়ে ১২০০ (২৯ শতাংশ) বিধায়কের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস রয়েছে। এই ‘দাগি’ বলে অভিযুক্তদের একটা বড় অংশের বিরুদ্ধে আবার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। যেমন, খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ, ধর্ষণ, যৌন হেনস্তা ইত্যাদি। রিপোর্ট বলছে, অভিযুক্ত সাংসদদের মধ্যে দোষী প্রমাণিত ২৭ জন, ৪ জনের নাম রয়েছে খুনের চার্জশিটে, ১৫ জনের নাম যৌন হেনস্তার চার্জশিটে এবং ২ জনের নাম ধর্ষণের মামলার চার্জশিটে। ঘটনা হল, প্রায় সবক্ষেত্রেই অপরাধ-অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে বিজেপির মন্ত্রী-সাংসদ-বিধায়কদের নাম। তবে অন্যান্য দলের অভিযুক্ত মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিরাও সকলেই ধোয়া তুলসীপাতা নন। এ রাজ্যেও তৃণমূলের ৪০ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১৩ জনের নামে রয়েছে ফৌজদারি মামলা। এর মধ্যে ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর।
এই তথ্য ও পরিসংখ্যান বলে দেয়, জনগণকে ‘বোকা’ মনে করে এ দেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল প্রতিনিয়ত ‘ভাবের ঘরে চুরি’ করে চলেছে। এটা ঠিক যে, অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্যের শাসক দল কিছু ক্ষেত্রে লঘু অপরাধে বিরোধীদের গুরুতর মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। বিজেপির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে দুর্নীতিগ্রস্ত ও দাগিদের রমারমা অস্বীকার করা যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলির কাছে প্রায়শই এরা হল ‘সম্পদ’। এইসব সম্পদকে ছেঁটে ফেলতে লোকদেখানো আইন করলে হাততালি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হবে না। যদি সত্যি করে দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত দেশ গড়তে হয়, তাহলে অভিযুক্ত দাগিদের প্রার্থী করা থেকে সব দলকে বিরত থাকতে হবে। নিজেদের ঘর থেকেই এই ‘জঞ্জাল’ সাফাই অভিযান শুরু করতে হবে। এজন্য চাই দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত রাজনীতি। সেই হিম্মত কোনও দল দেখাবে, এমন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তাই প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘দুর্নীতিমুক্ত’ ভারত গঠনের বক্তব্যটি আর পাঁচটা প্রতিশ্রুতির মতোই নিছক কথার কথা হয়ে থাকবে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ