ওপারে দীপু চন্দ্র দাস, এপারে জুয়েল রানা। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার পোশাকশ্রমিক দীপু দাস সেদেশের একজন সংখ্যালঘু হিন্দু। গত ১৮ ডিসেম্বর মুসলিম ধর্ম অবমাননার অসত্য অভিযোগে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একদল উন্মত্ত জনতা। ঠিক দশদিন পর এদেশও সাক্ষী থাকল এক সংখ্যালঘু যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের। প্রহৃত হয় আরও দু’জন। আদতে মুর্শিদাবাদের সূতির বাসিন্দা জুয়েল মাত্র কয়েকদিন আগে রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়ে গিয়েছিল ওড়িশার সম্বলপুরে। গত ২৪ ডিসেম্বরের রাতে হিন্দুত্ববাদী একদল দুষ্কৃতী বাংলাদেশি সন্দেহে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। আধার কার্ড দেখিয়েও এই বর্বরদের হাত থেকে রেহাই পায়নি ২১-এর যুবক। বাংলাদেশ-সহ পড়শি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হচ্ছে বলে উদ্বিগ্ন মোদি সরকার। এর আগে হিন্দুরা এদেশে ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে আশ্রয় নিলে তাদের নাগরিকত্ব দিতে নতুন আইনও করেছে কেন্দ্র। অথচ সেই মোদি সরকারের জমানাতেই এদেশের মুসলিম, খ্রিস্টান সহ অহিন্দু সংখ্যালঘুরা প্রায়শ অত্যাচারিত, আক্রান্ত, হেনস্তার শিকার হচ্ছে! জুয়েল সাম্প্রতিক উদাহরণ। কেন্দ্র ও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির চোখে এরা মূলত বাংলাদেশ থেকে আগত ‘অনুপ্রবেশকারী’! কারণ কথা বলে বাংলাতে। তাই ভিন রাজ্যে বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাদের উপর লাগামছাড়া হামলা চালাচ্ছে শাসকদলের মদতপুষ্ট গুন্ডারা। একদিকে পড়শি রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুদের জন্য মায়াকান্না, অন্যদিকে নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, মুখোশপরা গেরুয়াবাহিনীর এমন ভণ্ডামির নজির অতীতে কোনও ভারতীয় শাসক দল দেখাতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আর নরেন্দ্র মোদি নীরব দর্শক!
গেরুয়াবাহিনীর শত্রুর তালিকায় মুসলমানরা যদি এক নম্বর হয়, তাহলে তারপরেই রয়েছে খ্রিস্টানরা। প্রায় ১৪৩ কোটির ভারতে তাদের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি হবে না। এদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও সাদা চোখে বোঝা যায় না। কিন্তু উগ্রহিন্দুত্বের দর্শন ও আস্ফালন এদেরও রেহাই দিতে নারাজ। ইতিহাস বলে, যেকোনও ধারাবাহিক অত্যাচার সংগঠিত করার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের শাসকের অজুহাত তৈরি করতে হয়। সেই অজুহাতকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যাপক মাত্রায় প্রচার চালাতে হয়। যাতে সংশ্লিষ্ট দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় অত্যাচার, হেনস্তা, ঘৃণা ছড়ানোর একটা কারণ তৈরি করতে পারে। ভারতীয় সংবিধান ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ আদর্শের কথা বলেছে। অর্থাৎ বিবিধের মাঝে মিলন—এই দেশের মূলমন্ত্র। তাতে ভাষা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানকেই হাতে নিয়ে শপথ নিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। অথচ তাঁর জমানাতেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ, বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ বলে প্রচারের ‘অজুহাত’ তৈরি করে অত্যাচার চালানো হচ্ছে! আর জোর করে ধর্মান্তকরণের অভিযোগ তুলে আক্রমণও করা হচ্ছে খ্রিস্টানদের। অথচ ধর্মান্তরিত হওয়ার অধিকার এদেশে সংবিধান স্বীকৃত।
এই সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের নিয়ে মোদিজির আরও এক ভণ্ডামির সাক্ষী থাকল এবারের ২৫ ডিসেম্বর। ‘বড়দিন’-এর সকালে দিল্লির এক চার্চে প্রার্থনায় যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বড়দিনের চেতনা আমাদের সমাজে সম্প্রীতি ও সদিচ্ছার প্রেরণা জোগায়।’ এই প্রার্থনা ভালোবাসা, শান্তি ও সহমর্মিতার বার্তা বলেও জানান তিনি। অথচ এই মহান উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব-কলমে সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত গেরুয়াভেকধারী দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব নিয়ে একটি শব্দও ব্যয় করেননি মোদি! অথচ বড়দিনের আগের দিনগুলিতে উগ্রহিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীরা কোনও কোনও উপাসনালয় ও গির্জাতে দেদার আক্রমণ চালিয়েছে। অসমের নলবাড়িতে একটি স্কুলে ঢুকে সব তছনছ করে দিয়েছে। রায়পুরে একটি মলে উৎসবের যাবতীয় আয়োজন পণ্ড করে দিয়েছে, জব্বলপুরে একটি গির্জায় এক দৃষ্টিহীন মহিলাকে লাঞ্ছিত করেছে, রাজধানী দিল্লিতে সান্তা টুপি পরা মহিলাদের উপর নজরদারি চালিয়েছে। কেরলেও শিশুদের ক্যারল গ্রুপের উপর হামলাও চালিয়েছে! উত্তরপ্রদেশের বেরেলি-সহ বিভিন্ন রাজ্যে বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের কর্মীরা গির্জায় প্রার্থনা ভেস্তে দিতে হনুমান চালিশা পাঠ করে, লখনউতে একটি জায়গায় উৎসবরত মানুষের মাঝে ‘হরি বোল, হরি বোল’ বলে হট্টগোল করা হয়। কোথাও-বা দেয় ‘জয় শ্রীরাম ও জয় হিন্দুরাষ্ট্র’ স্লোগান। ছত্তিশগড়ে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর শেষকৃত্যে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে গির্জা, স্কুল ভাঙচুর থেকে শুরু করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের উপর শারীরিক আক্রমণ করা হয়েছে। অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে। পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকায়। কয়েকদিন ধরে এই তাণ্ডবের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবারই ইউনাইটেড খ্রিস্টান ফোরাম নামে একটি সংগঠন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়ে সব জানায়। সংগঠনের অভিযোগ, ২০২৪ সালে খ্রিস্টানদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি। চলতি বছরে নভেম্বর পর্যন্ত ৭০৬টি। ঘৃণা ছড়াতে মৃত খ্রিস্টানকে কবর দিতে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওই সংগঠনের। তথ্য বলছে, ভারত এখন সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের পক্ষেও বিপজ্জনক দশটি দেশের একটি। ভারত রাষ্ট্র ও হিন্দুধর্ম রক্ষার ‘অজুহাতে’ এই বিভাজন তৈরি করা, আইন-আদালতকে বুড়ো আঙুল দেখানো—এটাই এখন মোদি জমানার ‘নিউ নরম্যাল’! এখানে বিশেষত সংখ্যালঘুদের ‘নিরাপত্তা’ বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়ছে।