শান্তনু দত্ত: ‘কান্তারা’ শব্দের অর্থ ‘ঈশ্বরের মধুবন’। কেন? সরল প্রশ্ন এক শিশুর। উত্তর মেলে, শান্তিতে তপস্যা করার জন্য দেবী পার্বতী তৈরি করেছিলেন এই স্থান। অপার্থিব এই জগতের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, সৌন্দর্য কল্পনাতীত। ২০২২ সালে লেখক, পরিচালক, অভিনেতা ঋষভ শেট্টি ‘কান্তারা’ নামক যে অপূর্ব জগতের সঙ্গে আলাপ করিয়েছিলেন, সেই জগৎ আরও বিস্তৃত পরিসরে ধরা দিয়েছে প্রিক্যুয়েল ‘কান্তারা: চ্যাপ্টার ওয়ান’-এ।
পুরাণ, লোকগাথা, আদিবাসী সংস্কৃতি, কল্পনার মিশেলে প্রথম ছবিটি মুগ্ধ করেছিল। প্রিক্যুয়েলের শিকড় লুকিয়ে তারও গভীরে। জঙ্গলের কয়েকশো বছরের প্রাচীন মিথই নয়, গল্পে সুচারুভাবে মিশেছে সাম্প্রতিক রাজনীতিও। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেখানে নিজস্বতাকে ভুলিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর, সেখানে এই ছবি কেবল সিনেম্যাটিক ভাষ্যে আবদ্ধ নেই। হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের গর্জন। প্রতিবাদ ক্ষমতালোভীদের বিরুদ্ধে। প্রকৃতিকে নিঃশেষ করে দেওয়া, করে দিতে চাওয়া স্বার্থপরদের বিরুদ্ধে।
আনুমানিক ৩৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কর্ণাটকের প্রাচীন রাজবংশ কদম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। ছবির কেন্দ্রে সেই সময়কাল। ঈশ্বরের আপন দেশের সন্ধান পেতে বাঙ্গারার শাসক বিজয়েন্দ্র আক্রমণ করলেন কান্তারা। উদ্দেশ্য একটাই। ভোগ করা। নিজের মধুবনকে রক্ষা করতে ঈশ্বর স্বয়ং আবির্ভূত। মৃত্যু হয় বিজয়েন্দ্রর। এরপর থেকেই কান্তারা লোকচক্ষুর আড়ালে। বাঙ্গারাবাসীর কাছে তা এক নিষিদ্ধ জায়গা। অন্যদিকে, কান্তারার মানুষের জীবনও কাটে জঙ্গলের মধ্যেই। কান্তারার এক বাসিন্দা বারমে (ঋষভ অভিনীত চরিত্র) যেতে চায় বাঙ্গারাতে। পৌঁছেও যায়। বারমে তার সঙ্গীদের নিয়ে বারমেতে নানা কাণ্ড ঘটায়। এই ঘটনাগুলি দিয়ে প্রথম পর্বের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন পরিচালক। এদিকে, অত্যাচারী শাসক কুলশেখর (গুলশন দেবাইয়া) কান্তারা আক্রমণ করেন। বন্দি করে বাবা রাজশেখরকে (জয়রাম)। পাশাপাশি রাজকন্যা কনকবতীর (রুক্মিণী বসন্ত) সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বারমের সম্পর্ক। এমন একাধিক রসায়ন ছবিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তবে কখনও কমেডি, কখনও রোমান্স— মুহুর্মুহু এমন টোন বদল বড্ড চোখে লেগেছে। প্রথম ছবির ক্লাইম্যাক্স দৃশ্য চমকপ্রদ। সে কারণেই ‘কান্তারা’ ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে এত চর্চা। এই ছবিটিতে একাধিকবার তেমন গায়ে কাঁটা দেওয়া দৃশ্য রেখেছেন পরিচালক। বিশেষত বলতে হয়, বিরতির আগের দৃশ্য ও ক্লাইম্যাক্সের ১৫ মিনিট। এই সময় পর্দা থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল। শিব ও শক্তিতত্ত্বের অসাধারণ ব্যাখ্যা রয়েছে শেষে। ভূতা কোলা সংস্কৃতি, দৈবের নানা উপকাহিনিতে ছবি সমৃদ্ধ।
এ ছবির নায়ক একজনই। ঋষভ শেট্টি। পর্দাতেও তিনি যেমন বুঁদ করে রাখতে পারেন। পর্দার বাইরেও। লোক সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গবেষণা, লেখনী, পরিচালনা অনবদ্য। তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বড়পর্দায় না দেখলে, মিস করবেন। যোগ্য সঙ্গত করেছেন অন্য অভিনেতারাও। রুক্মিণী বসন্ত যেভাবে নিজেকে তৈরি করেছেন, অপূর্ব। বলতে হয় ভিএফএক্স-এর কথা। ১২৫ কোটি টাকায় (ঘোষিত বাজেট) বাঘ সহ অন্যান্য প্রাণীদের উপস্থাপনা শিক্ষণীয়। সঙ্গে অরবিন্দ এ কাশ্যপের সিনেমাটোগ্রাফি, বি অজনীশ লোকনাথের মিউজিক এই ছবির সম্পদ। মেকআপ, সম্পাদনাও অসাধারণ।
ছবিটি ঘিরে বিতর্কও দানা বাঁধছে দেশের নানা প্রান্তে। এর মাঝে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম— এসব বিতর্ক বরং তোলা থাক। এ ছবি আসলে ভারতের। দেশের শিকড়ের। তাই এই ছবি নিয়ে বিতর্ক নয়, গর্ব হোক।