প্রীতেশ বসু, গড়বেতা: লোকশ্রুতি বলে, মহাভারতের এক জনপ্রিয় কাহিনির সঙ্গে যোগ রয়েছে শিলাবতী-কংসাবতী ঘেরা গড়বেতার। পশ্চিম মেদিনীপুরের এই সুপ্রাচীন জনপদেই নাকি বকরাক্ষস বা বকাসুরকে বধ করেছিলেন ভীম। কথিত আছে, রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল গনগনি আসলে ভীম ও বকরাক্ষসের সেই যুদ্ধের চিহ্ন বহন করে চলেছে। এহেন গড়বেতা বহু রাজনৈতিক উত্থানপতনের সাক্ষী। এসব অঞ্চলে সিপিএমের অত্যাচারের স্মৃতি এখনো অনেকের মনে দগদগে। তবে ২০১৬ থেকে কেন্দ্রটি দখলে রেখেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। এবারও তারা জয় নিয়ে প্রত্যয়ী। প্রচারে তারা এসআইআরের নামে মানুষের উপর অন্যায়-অত্যাচারকে তুলনা করছে বকরাক্ষসের সঙ্গে। আর সেই সূত্রেই তারা এবারের ভোটে বিজেপি ‘বধ’-এর ডাক দিচ্ছে।
বেনাচাপড়া কঙ্কাল কাণ্ড খ্যাত সিপিএম নেতা সুশান্ত ঘোষের দাপট উধাও। তৃণমূলের লড়াই এখন বিজেপির বিরুদ্ধে। তৃণমূলের প্রার্থী উত্তরা সিং হাজরা বলেন, ‘সিপিএমের গুরুত্ব না থাকলেও ওদের অত্যাচারের কথা মানুষ কোনোদিন ভুলবে না। কিন্তু এখন মানুষের লড়াই বিজেপির বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে। এসআইআরের নামে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে। বকরাক্ষস প্রতিদিন নগরবাসীর কাছ থেকে খাদ্য কেড়ে নিত ও একজন মানুষকে খেয়ে ফেলত। আর এরা প্রতিদিন মানুষের ভোটাধিকার, খাদ্যের অধিকার, কথা বলার অধিকারে কোপ দিচ্ছে।’
এক সময় বাগড়ি রাজাদের রাজধানী ছিল গড়বেতা। এখানে তফসিলি উপজাতি এবং সংখ্যালঘু ভোটার যথাক্রমে সাড়ে ৯ শতাংশ এবং ১৪ শতাংশ। মোট ভোটারের মাত্র ৩.৫৭ শতাংশ শহর এলাকার বাসিন্দা। মূলত কৃষিকাজ, কুটির শিল্প, বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং ছোটো ব্যবসার উপর নির্ভরশীল এলাকার বাসিন্দারা। গড়বেতা ময়দান স্কুলের কাছে একটি চায়ের দোকানে দেখা পাওয়া গেল মনোজ হাজরার। পঞ্চাশোর্ধ্ব মনোজনবাবু বলছিলেন, ‘গত পাঁচ বছরে যেমন রাস্তা, বাজার, ঘাট, কালভার্ট, স্কুল ও কলেজ বিল্ডিংয়ের উন্নয়ন দেখেছি। তার আগের জমানায় দৈনন্দিন অশান্তিতে মানুষের প্রাণহানিরও সাক্ষী থেকেছি। মানুষ এখন কোনো অশান্তি চায় না। জঙ্গলমহলের শান্তি যেন বজায় থাকে।’ গড়বেতা বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী মনসুর মিয়াঁরও একই বক্তব্য। কথায় কথায় তিনি জানালেন, এখন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আলো লেগেছে। মানুষ আগের তুলনায় অনেক নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে। এখানে বিক্রিবাটাও বেড়েছে। যার মূল কারণ পর্যটন ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত। এই আমলে পর্যটকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। এলাকার ছেলেমেয়েরা অনেকেই এই পর্যটন কেন্দ্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ১০ হাজার ৫৭২ ভোটে জিতেছিলেন উত্তরা। এবারও তিনি প্রার্থী। তিনি নিশ্চিত যে জয়ের ব্যবধান এবার বাড়বে। মঙ্গলবার গড়বেতায় নির্বাচনি জনসভা করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার ঘণ্টা দুয়েক আগে প্রার্থী হিসাবে প্রদীপ লোধার নাম ঘোষণা করে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণেই নাম ঘোষণায় দেরি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। যদিও বিজেপি প্রার্থী একথা মানতে নারাজ। পালটা তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে কটাক্ষ শোনা গিয়েছে তাঁর গলায়। প্রদীপ জানিয়েছেন, ‘বিগত ৬০ বছরে গড়বেতার কোনো ব্যক্তিকে বিধায়ক হিসাবে পায়নি গড়বেতার মানুষ। হয় মেদিনীপুর, নয়
শালবনির কেউ বিধায়ক হয়েছেন। বিজেপিকে ভোট দিলে বিধানসভার বাসিন্দাই বিধায়ক হবে।’ জয় নিশ্চিত বলে দাবি করছেন তিনিও। সব মিলিয়ে ২৬-এর ভোটযুদ্ধে
গড়বেতার গণদেবতা কার পক্ষে মত দেয়, সেটাই দেখার।