নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: সোমবার সকাল ৮টা বেজে ২৯ মিনিট। সপ্তাহের আর পাঁচটা কাজের দিনের মতোই চূড়ান্ত ব্যস্ত রানাঘাট জংশন। তবে এদিনের ভিড়ের চরিত্র আলাদা। যাত্রীদের হাতে হাতে মোবাইল। ঝাঁচকচকে এসি লোকালকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে চলছে সেলফি তোলার হিড়িক। যাবতীয় উৎসাহ-উচ্ছ্বাস ততক্ষণে উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে। দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ট্রেনে উঠে পড়লেন কলেজ পড়ুয়া থেকে সরকারি কর্মী, নিত্যযাত্রী, ভ্লগাররা। পাছে এসি ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে যায়! তাই তাড়াহুড়োয় সাধারণ ট্রেনের টিকিট কেটে এসি ট্রেনে উঠে জরিমানাও গুনলেন কলেজ পড়ুয়া থেকে নিত্যযাত্রী। ফাইন দিয়েও অবশ্য খুব একটা হা-হুতাশ ছিল না তাঁদের। তাঁরা বলছেন, ‘এই প্রথম এসির ঠান্ডা হাওয়া খেতে খেতে যাচ্ছি লোকাল ট্রেনে। খরচ না হয় একটু বেশিই হল!’ তবে মূল্যবৃদ্ধির গনগনে আঁচে পুড়তে থাকা আম জনতা কতদিন সাধারণ ট্রেনের থেকে প্রায় ছ’গুন বেশি ভাড়া দিয়ে এসি লোকালে উঠতে পারবেন, সেই প্রশ্ন এদিন ওই ট্রেনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে।
মেট্রোর মতোই রেল-সফর! একইভাবে ডিসপ্লে বোর্ডে পরবর্তী স্টেশনের নাম দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে ঘোষণাও। কোন দিকে দরজা খুলবে, তাও বলে দেওয়া হচ্ছে। এসি লোকালে চাপার জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিলেন হাওড়ার তিন কলেজ পড়ুয়া। তাঁরা ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে নৈহাটি যান। বড়মার মন্দিরে পুজো দিয়ে পড়িমড়ি ছুটে আসেন স্টেশনে। হাতে এত কম সময় ছিল যে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটতে গেলে এসি ট্রেনে সফরের ইচ্ছে পূরণ হবে না। অগত্যা ভরসা রেলওয়ে অ্যাপ। কিন্তু চেষ্টা করেও তাঁরা এসি লোকালের টিকিট সেই অ্যাপ থেকে কাটতে পারেননি। এটুকুর জন্য এমন ‘ঐতিহাসিক’ সফর হাতছাড়া হবে, তা কী হয়! অগত্যা অ্যাপ থেকে সাধারণ ট্রেনের টিকিট কেটেই তাঁরা উঠে পড়েন এসিতে।
ট্রেনের ১৭ জন টিকিট পরীক্ষকের কড়া নজর অবশ্য এড়াতে পারেননি তাঁরা। তিন জনের মধ্যে ধরা পড়ে যান বঙ্গবাসী কলেজের বি কমের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রোশন সিং। তাঁকে ৩৩০টাকা জরিমানা দিতে হয়। তাঁর দুই বন্ধু মনীশ মণ্ডল ও অভয় আদক ভিড়ে মিশে যাওয়ায় তাঁদের অবশ্য ফাইন দিতে হয়নি। রোশন বলেন, ‘চেষ্টা করেও আমরা এই ট্রেনের টিকিট পাইনি। ৩৩০ টাকা জরিমানা হয়েছে। তিন বন্ধু ভাগ করে নেব। প্রথম দিনেই এসি ট্রেনে চড়ার পরিকল্পনা তো সফল হল।’
সোদপুর থেকে এই ট্রেনে চেপেছিলেন মাঝবয়সি সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন লোকাল ট্রেনে মারপিট করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এবার বোধ হয় একটু আরামে যেতে পারব। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা অসাধারণ।’ ট্রেনটি যখন দমদম স্টেশন ছাড়ছে, তখন ডাউন রাজধানী এক্সপ্রেসও এগচ্ছে পাশাপাশি। হাসতে হাসতে নৈহাটির সুধাংশু দত্ত বললেন, ‘১২০ টাকাতেই তো আমাদের এখন রাজধানীর মতো ব্যবস্থা।’
তবে ভিন্ন সুরও আছে। রানাঘাট থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী অন্তু সাহা। রানাঘাট-শিয়ালদহ লোকালের নিত্যযাত্রী তিনি। শিয়ালদহ থেকে মেট্রো ধরে নামেন সল্টলেকে। নামী কোম্পানিতে বছরখানেক আগে চাকরি পাওয়া যুবক বলছিলেন, ‘প্রথম দিন বলে এসি লোকালে উঠলাম। কাল থেকে উঠব না। প্রতিদিন ২০ টাকার জায়গায় ১২০ টাকা গুনতে বলে সত্যিই গায়ে লাগবে! তাছাড়া ওই ট্রেনে আমরা নিত্যযাত্রীরা দল বেঁধে মজা করতে করতে যাতায়াত করি। সবার পক্ষে তো প্রায় ছ’গুন বেশি ভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। আমি ওদের
সঙ্গেই আসব।’