Bartaman Logo
১০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

অমর জেলিফিশ

প্রত্যেক জীবের মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু ঠিক কবে কিংবা কীভাবে আসবে, তা আমরা কেউ জানি না। যখন, যে ভাবেই আসুক, মৃত্যু একদিন আসবেই। ‘জন্মিলে মরিতে হবে’, এমনটাই নিয়ম

অমর জেলিফিশ
  • ৮ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জীব মাত্রই মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু এক বিশেষ প্রজাতির জেলিফিশ বার্ধক্যে পৌঁছেই ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে আবার পৌঁছে যায় শৈশবে। ভূমধ্যসাগরে প্রথম এই জেলিফিশের সন্ধান পান বিজ্ঞানীরা। তাদের জীবনচক্র সম্বন্ধে জানালেন কল্যাণকুমার দে

Advertisement

প্রত্যেক জীবের মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু ঠিক কবে কিংবা কীভাবে আসবে, তা আমরা কেউ জানি না। যখন, যে ভাবেই আসুক, মৃত্যু একদিন আসবেই। ‘জন্মিলে মরিতে হবে’, এমনটাই নিয়ম। কিন্তু কখনো যদি মৃত্যুই না ঘটে! এমনটাও কি হওয়া সম্ভব? তবে পৃথিবীতে জন্ম নিলে মৃত্যুও একসময় অবধারিত, এই ধারণাকে যেন মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে এক সামুদ্রিক প্রাণী। হ্যাঁ, প্রকৃতিতে রয়েছে এক আশ্চর্য প্রাণী, যার জৈবিকভাবে ‘অমর’ হয়ে ওঠার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের চোখে ধরা পড়েছে। আক্ষরিক অর্থেই এরা নিজেদের প্রায় ‘অমর’ করে রেখেছে। মৃত্যুর কোনো রকম আশঙ্কা থাকলে, বার্ধক্যের উলটো পথ ধরে এই প্রাণী। বয়সকে লুকিয়ে ফের যৌবনে ফিরে যাওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এই প্রাণীটির।
সমুদ্রের তলায় রয়েছে এক রহস্যময় জগৎ। সেখানে জানা-অজানা নানা প্রাণীর বাস। সমুদ্রের রহস্যময় অসংখ্য প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল এক ধরনের জেলিফিশ। অতি ক্ষুদ্র এই জেলিফিশটিকে সাধারণত ‘অমর জেলিফিশ’ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাণীটি এমন এক ক্ষমতার অধিকারী, যা পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর নেই। জেলিফিশটির আকার খুবই ছোটো মাত্র ৪-৫ মিলিমিটার। কিন্তু এই ছোট্ট শরীরেই লুকিয়ে রয়েছে আশ্চর্য ক্ষমতা, প্রকৃতির নিয়মকে উলটে দেওয়ার শক্তি। বয়সকে লুকিয়ে ফের যৌবনে ফিরে যাওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এই প্রাণীটির, যাকে দেখতে অনেকটা গোলাপি পেরেকের মতো। এদের দেহটি হয় স্বচ্ছ। যার মাঝখানে একটি উজ্জ্বল-লাল পেট দেখতে পাওয়া যায়। এদের প্রান্তগুলিতে ৯০টি পর্যন্ত সাদা শুঁড় বা কর্ষিকা থাকে। এই জেলিফিশের কথা ১৮৮৩ সালে প্রথম প্রকাশ করেন বিজ্ঞানীরা। ১৮৮০-এ প্রথম আবিষ্কার হলেও এরা যে অমর, সেটা প্রমাণিত হয় প্রায় একশো বছর পর। গত শতাব্দীর ন’য়ের দশকে। এই জেলিফিশ প্রথমবার ভূমধ্যসাগরে পাওয়া যায়। ভূমধ্যসাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে এই গ্রহের সবচেয়ে অসাধারণ প্রাণীদের মধ্যে একটি। কিন্তু এখন এটি বিশ্বের নানা সাগরে দেখা যায়, যেমন—জাপানের উপকূল ও প্রশান্ত মহাসাগরের নানা অংশ। ধারণা করা হয়, বড় বড় জাহাজের চলাচলের মাধ্যমে এরা ছড়িয়ে পড়েছে।
পৃথিবীর একমাত্র ‘চিরজীবী’ 
প্রাণী হল টারিটোপসিস ডোরনি। যাকে ব্যাকওয়ার্ড এজিং জেলিফিশ নামে ডাকেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় এই জেলিফিশের জীবনচক্র অন্যান্য জেলিফিশের মতোই। এটি একটি লার্ভা হিসেবে জীবন শুরু করে পরে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে একটি প্রাপ্তবয়স্ক জেলিফিশে পরিণত হয়। কোনো কারণে পরিবেশগত চাপ বা শারীরিক ক্ষতির মুখোমুখি হলে এই জেলিফিশ বয়সকে উলটে দিয়ে আবার শৈশব পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। যেন এক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হঠাৎ আবার শিশু হয়ে গেল! এই প্রক্রিয়ার নাম ‘লাইফ সার্কেল রিভার্সাল’। তারা জীবনচক্রকে আগের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। জেলিফিশ নিজের ইচ্ছায় তার প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে রূপান্তরিত করতে পারে। এ এক আশ্চর্য সেলুলার পরিবর্তন। বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিরল প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন’। সহজ কথায় বিষয়টি অনেকটা একটি পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি যদি পুনরায় শুঁয়োপোকায় রূপান্তরিত হতে পারত, তাহলে এমনটা ঘটত। এই প্রক্রিয়ায় জেলিফিশগুলি নিজেদের কোষের গঠন পরিবর্তন করে আবার নতুন জীবন শুরু করে এবং এই চক্র তারা বারবার ঘটাতে পারে, যা তাদের তাত্ত্বিকভাবে ‘অমর’ করে তুলেছে।
বেশিরভাগ জেলিফিশের জীবন শুরু হয় লার্ভা হিসেবে। যাকে বলা হয় প্লানুলা। প্লানুলা সাঁতরে সাগরের আরও গভীরে ডুবতে থাকে এবং একসময় সাগরতলে পৌঁছে যায় এবং কোনো পাথরের গায়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়। এরপর প্লানুলার আকার-আকৃতি পরিবর্তিত হয়ে বহু শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট পলিপে রূপ নেয়। পলিপ থেকে জন্ম হয় ছোটো ছাতার মতো শরীর আর অনেকগুলো কর্ষিকাযুক্ত পূর্ণাঙ্গ জেলিফিশের। সপ্তাহখানেক পর এই জেলিফিশগুলো পরিপক্বতা লাভ করে। এই দশাকে বলা হয় মেডুসা দশা। এদের স্বচ্ছ শরীরের ভেতর দিয়ে লাল পাকস্থলী দেখা যায়। এরা প্ল্যাংকটন, ছোট মলাস্ক, মাছের ডিম প্রভৃতি খেয়ে জীবনধারণ করে। পরিপক্ক মেডুসারা একসময় মারাও যায়।
এবার ‘অমর জেলিফিশে’র জীবনচক্রের দিকে 
তাকানো যাক।
অমর জেলিফিশও বংশবিস্তার করে। এরাও সাধারণ জেলিফিশের মতো প্রথমে লার্ভা, তারপর পলিপ এবং সবশেষে মেডুসা দশায় পদার্পণ করে। মেডুসা দশায় এদের আকার হয় মাত্র ৪.৫ মিলিমিটার। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, অমর জেলিফিশ মেডুসা দশা থেকে পলিপ দশায় ফিরে আসতে পারে। যেন মুরগির ছানা আবার ডিম হয়ে গেল! এভাবে মেডুসা থেকে পলিপ হতে গেলে জেলিফিশের শরীর আর কর্ষিকা দুটোই সংকুচিত হয়ে বলের মতো চারপাশে মিউকাস মেমব্রেন তৈরি করে গুটি বা সিস্ট বাঁধে পলিপের আকারে। এই পলিপ অবস্থায় এরা তিনদিন পর্যন্ত থাকে। ভেতরে ভেতরে চলে ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন প্রক্রিয়া। আর এভাবেই কমিয়ে দেয় বয়স। তারপর সাগরের তলদেশে আস্তানা গাড়ে এবং স্বাভাবিক পলিপের মতোই মেডুসার জন্ম দিতে পারে। সাধারণ কোনো পরিস্থিতিতে কিন্তু এই রূপান্তর হয় না। যখন মেডুসা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রতিকূল হলে, খাবারের অভাবে পড়লে কেবল এই রূপান্তর সম্ভব। অসংখ্যবার তারা এভাবে রূপান্তরিত হতে পারে। তাহলে, কোনোভাবেই কি এদের মৃত্যু হয় না? অবশ্যই হয়। প্রকৃতিতে শিকারি প্রাণীর আক্রমণে, রোগ কিংবা পরিবেশগত দুর্যোগে বা দূষণে ‘অমর জেলিফিশে’র মৃত্যু ঘটতে পারে। অন্যান্য জেলিফিশ প্রজাতির দ্বারাও এরা আক্রান্ত হয়। এছাড়া টুনা, সোর্ডফিশ, কচ্ছপ ও পেঙ্গুইন রয়েছে এদের শিকারির তালিকায়। তবে বয়সজনিত মৃত্যু থেকে এরা রক্ষা পায়, যা অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষে সম্ভব নয়। আর এই ক্ষমতাই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল জাগিয়েছে টারিটোপসিস ডোরনি। তাই বয়স যতই বাড়ুক না কেন, এরা বারবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে। অর্থাৎ কখনোই বার্ধক্য আসে না এদের জীবনে। 
সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’-এ উধো বুড়ো তার সঙ্গী বুধোকে বলেছিল, ‘তোমার যেমন বুদ্ধি! আশি বছর বয়েস হবে কেন? চল্লিশ বছর হলেই আমরা বয়েস ঘুরিয়ে দিই। তখন আর একচল্লিশ বেয়াল্লিশ হয় না, ঊনচল্লিশ, আটত্রিশ, সাঁইত্রিশ করে বয়েস নামতে থাকে। এমনি করে যখন দশ পর্যন্ত নামে তখন আবার বয়েস বাড়তে দেওয়া হয়। আমার বয়েস তো কত উঠল নামল, আবার উঠল, এখন আমার বয়েস হয়েছে তেরো।’
অমর জেলিফিশের এই রহস্যময় ও অদ্ভুত জীবনচক্র নিয়ে গবেষণা অদূর ভবিষ্যতে মানুষকে দীর্ঘজীবন উপহার দিতে সক্ষম হবে। টারিটোপসিস গবেষণা ওষুধ শিল্পে বিপ্লব আনবে বা চিকিৎসাশাস্ত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে। টারিটোপসিস ডোরনি প্রজাতির জেলিফিশের জিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, এর সাহায্যে মানুষেরও অমরত্ব প্রাপ্তির পথের সন্ধান মিলতে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ