Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘চোরাপথে ভারতে আসার মাশুল দিচ্ছি’, ৫ বছর দক্ষিণেশ্বরে, ফেরার অপেক্ষায় হাকিমপুর সীমান্তে অশীতিপর বৃদ্ধা

কারও বয়স ৯০ এর দোরগোড়ায়। কারও আবার আশি পেরিয়েছে। শীতের রাতে তারা থাকতে বাধ্য হয়েছে খোলা আকাশের নীচে। এসআইআর বড় বালাই!

‘চোরাপথে ভারতে আসার মাশুল দিচ্ছি’, ৫ বছর দক্ষিণেশ্বরে, ফেরার অপেক্ষায় হাকিমপুর সীমান্তে অশীতিপর বৃদ্ধা
  • ২০ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: কারও বয়স ৯০ এর দোরগোড়ায়। কারও আবার আশি পেরিয়েছে। শীতের রাতে তারা থাকতে বাধ্য হয়েছে খোলা আকাশের নীচে। এসআইআর বড় বালাই! ধরা পড়লে, তাড়িয়ে দেবে! বাধ্য হয়েই অশক্ত শরীরটাকে কোনওক্রমে হাকিমপুর সীমান্তে টেনে এনে, এখন অপেক্ষা নিজের দেশে ফেরার। দালাল ধরে চোরাপথে  ‘অনুপ্রবেশ’—এখন তার মাশুলই যে গুণতে হচ্ছে, মানছেন এপারে ভারতীয় ‘সেজে’ থাকা বাংলাদেশি বৃদ্ধা  প্রমীলা তালুকদার, রাহিলা বেগমের মতো আরও অনেকে। সে দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে বিএসএফ ক্যাম্পে নাম লেখানোর লাইনটা যেন ‘মিনি বাংলাদেশ’। সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, পাবনা, কুষ্ঠিয়া, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালি মিলে মিশে একাকার। কেউ তিন বছর, কেউ পাঁচ বছর, কেউ আবার ১০ বছর ধরে এপারে ছিল। রাজারহাট, জ্যাংড়া, আটঘরা, সিটি সেন্টারের কাছে, মধ্যমগ্রাম, বারাসত এমনকী দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে পেটের ভাত জোগাড়ের সঙ্গেই ভারতীয় সাজার চেষ্টাও চালাচ্ছিল ইউনুসের দেশের নাগরিকরা। এসআইআরের তাড়নায় এখন নিজেরা‌ই অম্লান বদনে ঘোষণা করছে, আমরা বিদেশি, বাংলাদেশি। ভারতে থাকার কোনও কাগজপত্র নেই। তাই দেশে ফিরে যাচ্ছি।   

Advertisement

স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টের সামনে মঙ্গলবার দুপুরে একটি দোকানের ছাউনিতে বসেছিলেন প্রমীলা তালুকদার। হাতে ধরা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র। তার নথি বলছে, তাঁর বয়স ৮৮, বাড়ি শেখ হাসিনার একসময়ের নির্বাচনী কেন্দ্র গোপালগঞ্জে, কোটলি পাড়ায়। ছাত্র আন্দোলনের জেরে হাসিনা পালিয়ে এসেছেন এপারে। গোপালগঞ্জের আরেক ভূমিকন্যা এসআইআর কোপে ফিরছেন দেশে। বৃদ্ধার প্রমিলার কথায়, আমি করোনার সময় ভারতে এসেছি, স্বামী ছিল। এখানেই মারা গিয়েছেন। ছেলে-মেয়ে বাংলাদেশে। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের কাছে একটি ঝুপড়িতে থাকতাম। প্রতিমাসে হাজার টাকা ভাড়া। ভিক্ষে করে সে টাকা জোগাড় করতাম। এসআইআর শুরু হতেই বাড়িওয়ালা আর থাকতে দিল না। এই বয়সে আর ঝুঁকি না নিয়ে অন্যান্য বাংলাদেশির সঙ্গে বাসে চেপে হাকিমপুর চলে এসেছি। এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায়।’ স্পষ্ট আক্ষেপের সুর বৃদ্ধার গলায়—‘জানি না, সুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরতে পারব কি না! চোরাপথে ভারতে আসার মাশুল দিতে হচ্ছে!’
কিছুটা দূরে দ্বিতীয় অনুপ্রবেশকারীদের জন্য তৈরি অস্থায়ী আরও এক তাঁবুতে বসেছিলেন ৮০ বছরের রাহিলা বেগম। অশক্ত শরীরের সর্বক্ষণের সঙ্গী একটা লাঠি। খুলনার ডুমুরিয়ার বাসিন্দা বৃদ্ধার সঙ্গে ছিল মেয়ে সাজিদা বেওয়াও।  রাহিলার দাবি, করোনার তিন বছর আগে মেয়ের স্বামীর নার্ভের চিকিৎসা করাতে মেডিকেল ভিসা নিয়ে এপারে এসেছিলেন। কলকাতার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা হয়। কিন্তু বাঁচেনি জামাই। এর মধ্যে পাসপোর্টও হারিয়ে যায় বলে সমস্বরে দাবি মা-মেয়ের। সাজিদা ও রাহিলা বাংলাদেশে ফেরেননি। সল্টলেকের করুণাময়ীর কাছে একটি বস্তিতে থাকতেন। এখন ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার ভয়ে ছুটে এসেছেন স্বরূপনগরের হাকিমপুর চেকপোস্টে। পাসপোর্ট খোয়া গেল, বাংলাদেশি নাগরিক, অথচ কলকাতার হাইকমিশনে গেলেন না কেন? একের অপরের মুখে চাওয়াচায়ি করছিলেন খুলনার মা-মেয়ে। ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ পাহারা দিচ্ছিলেন বিএসএফের ১৪৩ নম্বর ব্যাটালিয়নের মারাঠি জওয়ান। মুচকি হেসে বলে ফেললেন—ঝুট বোল রহি হ্যায়। সব ঘুষপেটিয়ো কা একই স্টোরি!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ