Bartaman Logo
২০ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / বিদেশ

সিঁড়ি দিয়ে ৩২ তলা থেকে নামছি, গা ঘেঁষে ভেঙে পড়ছে দেওয়াল

ব্যাংককের স্থানীয় সময় তখন দুপুর দেড়টা। অফিস ডেস্কে বসে কাজ করছিলাম। আচমকাই যেন দুলে উঠল গোটা বাড়ি। মুহূর্তে মনে হল, যেন দোলনায় দোল খাচ্ছি।

সিঁড়ি দিয়ে ৩২ তলা থেকে নামছি, গা ঘেঁষে ভেঙে পড়ছে দেওয়াল
  • ২৯ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌভিক রায়চৌধুরী: ব্যাংককের স্থানীয় সময় তখন দুপুর দেড়টা। অফিস ডেস্কে বসে কাজ করছিলাম। আচমকাই যেন দুলে উঠল গোটা বাড়ি। মুহূর্তে মনে হল, যেন দোলনায় দোল খাচ্ছি। শহরের প্রাণকেন্দ্র সুকুমভিতে আমাদের অফিস। যে বাড়িটিতে আমরা কাজ করি, সেটি ৪২ তলা। আমরা বসি ৩২ তলায়। বুঝলাম, ভয়াবহ ভূমিকম্প। অফিস অ্যালার্মও বেজে উঠল। সবাই নীচে নামার জন্য ছুটলাম। কিন্তু ততক্ষণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে লিফ্ট। ইমার্জেন্সি এগজিটের সিঁড়িতে এসে দেখি, লোকে লোকারণ্য। প্রাণে বাঁচতে সবাই নামতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু চাইলেই কি দুম করে ৩২ তলা নামা যায়? আমাদের সঙ্গেই কাজ করেন এক ভারতীয়, নাম মনোজ শর্মা। তিনি হার্টের রোগী। তিনি যেভাবে কষ্ট করে নামছিলেন, আমাদেরই প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে নামাও যে কী আতঙ্কের টের পাচ্ছিলাম। সিঁড়ির দেওয়ালগুলো ভেঙে ভেঙে পড়ছিল আমাদের গা ঘেঁষে। কিন্তু তখন সেসব দেখার সময় নেই। হয় রেলিং ধরে, অথবা একে অপরের হাত ধরে নামছিলাম আমরা। 

Advertisement

নীচে নেমে দেখি, কাতারে কাতারে মানুষ হাহাকার করছেন। আশপাশের বাড়ি ভেঙে পড়েছে। এখানে উঁচু বাড়িগুলির মাথায় সুইমিং পুল থাকে। তীব্র কম্পনের কারণে সেই পুলগুলি থেকে জল পড়ছিল নীচে। মনে হচ্ছিল, যেন ঝর্ণার নীচে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। নতুন তৈরি হওয়া একটি বহুতলকে চোখের সামনে গুঁড়িয়ে যেতে দেখলাম। আচমকা মনে পড়ল, আজই অফিসে পাসপোর্টটা নিয়ে এসেছিলাম একটা প্রয়োজনে। পাশাপাশি মনে হল, আমাদের অফিসের সবাই কি ঠিকভাবে নামতে পেরেছেন? আটটি তলা মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কর্মী কাজ করেন আমাদের সংস্থায়। কিছুক্ষণ নীচে থেকে ফের উপরে উঠলাম আমি। দেখলাম, তছনছ হয়ে আছে অফিসরুম। যাঁরা রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের নামতে বললাম যতটা দ্রুত সম্ভব। পাসপোর্ট নিয়ে ফের নেমে এলাম নীচে। ততক্ষণে বাড়ি থেকে স্ত্রীর ফোন এসেছে। ৩২ তলা বাড়ির ১১ তলায় আমরা থাকি। জেনে নিয়েছি, সকলেই সুস্থ আছেন ও নীচে নেমেছেন। গোটা বাড়ি পরিদর্শন করে গিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সব ঠিক আছে, এই মর্মে অনুমোদন দেওয়ার পরই আবাসিকদের বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়েছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নিজের ঘরে যেতে পেরেছেন স্ত্রী। এদিকে আমাদের চিন্তা, বাড়ি ফিরব কী করে? রাস্তায় প্রায় নড়ছে না একটিও গাড়ি। স্কাই রেল, আন্ডারগ্রাউন্ড রেল, এয়ারপোর্ট লিঙ্ক বন্ধ। অবশেষে হেঁটে বাড়ি এসেছি। আজই আমার মেয়ের বন্ধু এসেছে লন্ডন থেকে। সে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে বহু ক্ষণ। কীভাবে তাকে আমরা বাড়িতে আনব, জানি না। অফিসকেও জানানো হয়েছে, সোমবার পর্যন্ত কেউ অফিসে আসবে না। সবাই বাড়ি থেকে যেটুকু পারবে কাজ করবে। বিকেলের পর থেকে ব্যাঙ্ককের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু শুক্রবারের দুপুরটা জীবনের একটা অতি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে রইল আমার কাছে। 
(লেখক একটি বহুজাতিক সংস্থার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট)

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ