নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: না আছে বৈধ কাগজপত্র, না আছে পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র। সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না রাজস্বও। তা সত্ত্বেও পুরুলিয়া জেলাজুড়ে রমরমিয়ে চলছে অবৈধ ইটভাটা। ভাটার জ্বালানির জন্য কাটা পড়ছে গাছ। অবৈধভাবে ব্যবহার হচ্ছে কয়লা। ধোঁয়ায় ঢাকছে এলাকা। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন লোকালয়ের বাসিন্দারা। বিষয়টি অজানা নয় পুলিস-প্রশাসনের আধিকারিকদের। কিন্তু কারও কোনও হেলদোল নেই। পাল্টা, অবৈধ ইটভাটার মালিকদেরই সদর্পে ঘোষণা, পুলিস-প্রশাসন আর নেতাদের আশীর্বাদের হাত যদি মাথায় থাকে, তাহলে অবৈধ কারবারই ‘বৈধ’ হয়ে যায়! যারা যে ফুলে সন্তুষ্ট, সময়মতো তাদের কাছে তা পৌঁছে দিলেই হবে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, যে কোনও ইটভাটার জন্য ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। যে জমিতে ভাটা হবে, তার চরিত্র অ-কৃষি জমি হতে হবে। পরিবেশ দপ্তরের বিভিন্ন ছাড়পত্র থাকতে হবে। ইট তৈরির জন্য মাটি কাটার আগেই সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে হয়। ভাটার আয়তনের উপর নির্ভর করে চিমনি থাকা বাধ্যতামূলক। ন্যূনতম ৭০ ফুট চিমনি থাকতে হবে ভাটায়। যদিও পুরুলিয়া জেলার অধিকাংশ ভাটাতেই সেসবের কোনও বালাই নেই। প্রায় সর্বত্রই রমরমিয়ে চলছে অবৈধ বাংলা ইট ভাটা। এই ধরনের ইটভাটাগুলিতে উঁচু চিমনি না থাকায় আশপাশের লোকালয়ে কাঠ, কয়লা পোড়ানো দূষিত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। তাতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানির মতো রোগ, এমনকী, ফুসফুসের সংক্রমণও বাড়ছে। ভাটা থেকে উড়ে আসা ছাইয়ে কৃষিজমি এবং ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অবৈধ ইটভাটার জেরে নাজেহাল বৈধ ইট ব্যবসায়ীরাও। তাঁদের দাবি, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে বৈধভাবে ইট উৎপাদন করতে গেলে অনেক খরচ পড়ে, বাংলা ভাটায় সেই খরচ অনেক কম। ফলে উৎপাদিত ইটের দামও অনেক কম হয়। বৈধ ভাটা ছেড়ে মানুষও ইট কিনতে অবৈধ ভাটাতেই ভিড় জমাচ্ছেন। সরকারকে রাজস্ব দিয়েও ক্ষতির মুখে পড়তে হয় বৈধ ব্যবসায়ীদের। এনিয়ে বহু অভিযোগও জানিয়েছেন বৈধ ইট ব্যবসায়ীরা।
বেঙ্গল ব্রিক ফিল্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাব্বির আহমেদ বলেন, আমরা বৈধভাবে মর্যাদার সঙ্গে ব্যবসা করছি। প্রত্যেকের কাছে অবৈধ বাংলা ভাটা সত্যিই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের না আছে কোনও কাগজপত্র, না আছে দূষণের ছাড়পত্র। তা সত্ত্বেও পুলিস-প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে এই অবৈধ কারবার চলছে?
সূত্রের খবর, রাজ্যের সঙ্গে এনিয়ে একাধিকবার বৈঠকও করেছে ইটভাটা মালিক সংগঠনগুলি। পদস্থ এক আধিকারিকের মুখে একাধিকবার শুনতে হয়েছে, ‘এইসব ভাটা বন্ধ করার ক্ষমতা আমার একার নেই!’ কেন? এখানেই উঠে আসে ‘রফা কালচার’-এর কথা! বাংলা ভাটা মালিকরা জানাচ্ছেন, কাগজপত্র না থাকায় উপরতলা থেকে নীচতলা অবধি ম্যানেজ করতে হয়। স্থানীয় নেতা, পুলিস থেকে শুরু করে ভূমি রাজস্ব দপ্তর, সব জায়গাতেই নির্দিষ্ট সময় পৌঁছে দিতে হয় ‘খাম’। খাম না পৌঁছলেই বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি আসে। প্রশ্ন উঠছে, এভাবেই কি চলবে? নাকি পরিস্থিতির বদল হবে? দপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, এনিয়ে ব্যবস্থা নিতে গেলেই বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসে। অতিরিক্ত জেলাশাসক(ভূমি ও ভূমি রাজস্ব) রাজেশ রাঠোর বলেন, সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনেই ইটভাটা চালাতে হবে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে। -নিজস্ব চিত্র