তন্ময় মল্লিক: বাম আমলে বারবার অশান্ত হয়েছিল পাহাড় ও জঙ্গলমহল। বহু মানুষের প্রাণ গিয়েছে। নষ্ট হয়েছে প্রচুর সম্পত্তি। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির আস্ফালনের মুখে পিছু হটেছে প্রশাসন। তাই রাজ্যে পালাবদলের পর সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল পাহাড় এবং জঙ্গলমহলে শান্তি প্রতিষ্ঠা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, আত্মসমর্পণ নয়, চোখে চোখ রেখে লড়াইয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি। গত এক দশকেরও বেশি সময় পাহাড় ও জঙ্গলমহলে তেমন কোনও অশান্তি হয়নি। তাও কেন্দ্রের সরকার সেই পাহাড়ের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আচমকা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছে। এতে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অক্সিজেন পাবে। বিজেপির এই কৌশল পাহাড়ের কয়েকটি আসন ধরে রাখার লোভে, নাকি অশান্তি পাকানোর উদ্দেশ্যে, সেটা সময় বলবে। তবে বিজেপি যে আগুন নিয়ে খেলছে, সে ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই।
নির্বাচন এলেই গোর্খাল্যান্ডের ইশ্যু মাথাচাড়া দেয়। বলা ভালো, রাজনীতির কারবারিরা ক্ষুদ্র স্বার্থে এই দাবি খুঁচিয়ে তোলে। ২০১৪ সালে নির্বাচনী প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদি সেই উদ্দেশ্যেই বলেছিলেন, ‘গোর্খাদের স্বপ্ন আমার স্বপ্ন। সমস্যা শীঘ্রই মিটবে।’ পাহাড়বাসী বিশ্বাস করেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে গোর্খাল্যান্ডের দাবি পূরণ হবে। সেই আশাতেই প্রতিটি নির্বাচনে তাঁরা বিজেপি প্রার্থীদেরই জিতিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে তা পূরণের সম্ভাবনাও নেই। তাও মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এখন প্রশ্ন হল, দিল্লি বিজেপি কেন এমন একটা কাজ করতে গেল? অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী গোর্খাদের স্বপ্ন পূরণের কথা বলে নির্বাচনে ভোট নিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। তাতে পাহাড়ের দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ এবং অসন্তোষ রয়েছে। সুষ্ঠু ভোট হলে পাহাড়ের সব আসন ধরে রাখা বিজেপির পক্ষে কঠিন হবে। তাই মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে ছাব্বিশের নির্বাচনটা উতরে যেতে চাইছে।
এর আগেও দার্জিলিং ইশ্যুতে একাধিকবার মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করা হয়েছে। তবে সেটা হয়েছে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই। উদ্দেশ্য, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই মুহূর্তে পাহাড়ে কোনও অস্থিরতা বা অশান্তি নেই। প্রচুর পর্যটক দার্জিলিং যাচ্ছেন। তাতে পাহাড়ের ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ বেজায় খুশি। কারণ পর্যটনই পাহাড়ের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। ফলে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের কোনও প্রয়োজনই ছিল না। তা সত্ত্বেও অবসরপ্রাপ্ত আমলা পঙ্কজকুমার সিংকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ অতিবৃষ্টি ও ধসের ধাক্কায় পাহাড়বাসী যখন দিশেহারা তখন কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। পুনর্গঠনের জন্য একটি পয়সাও দেয়নি। এই পরিস্থিতিতে জিটিএ এবং রাজ্য সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় পাহাড় যখন একটু একটু করে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে, ঠিক তখনই মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করল। কারণ অস্থিরতা সৃষ্টি হলেই খোলে ‘দাদাগিরি’র দরজা।
দিল্লি বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, রাজ্যকে না জানিয়ে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুতেই মেনে নেবেন না। তিনি প্রতিবাদ করবেন এবং করেছেনও। মুখ্যমন্ত্রী পরোক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের শান্তি বিঘ্নিত করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, ‘গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের সরকারের অবিচল প্রচেষ্টায় পাহাড়ে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফিরেছে। আমরা সেই শান্তিরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু, এই ধরনের প্রচেষ্টা স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।’ সেই আশঙ্কা থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
পাহাড় অশান্ত হওয়ার ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রীর আশঙ্কা অমূলক নয়। এর আগে পৃথক রাজ্যের দাবিতে অনেক ধ্বংসাত্মক আন্দোলন হয়েছে। সুবাস ঘিসিং আন্দোলনের নামে যখন-তখন পাহাড় অচল করে দিতেন। বহু সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। অনেক রক্ত ঝরেছে। তাতে পাহাড়ের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। সেই রাস্তাতেই হাঁটতে গিয়েছিলেন বিমল গুরুং। ২০১৭ সালে পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়ে রাতারাতি পর্যটকদের পাহাড়ছাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাথা নত করেননি। উল্টে আন্দোলনকারীদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছিলেন। পুলিশ ও প্রশাসনের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বিমল গুরুং পাহাড় ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। একদা পাহাড়ের রাজা বিমল গুরুং এখন ‘কাগুজে বাঘ’। মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করায় বিমল গুরুংদের হম্বিতম্বি এবার বাড়বে। বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা বিমলের সঙ্গে গিয়ে দেখা করায় সেই আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের আবেদনে কেন্দ্রীয় সরকার যে কর্ণপাত করবে না, তাতে কোনও সংশয় নেই। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ করেছে। কী সেই উদ্দেশ্য? বছর ঘুরলেই বাংলা দখলের ভোট। প্রধানমন্ত্রী রুটিন করে বাংলায় আসছেন। এরপর ডেলি প্যাসেঞ্জারি। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন। কোন এলাকায় কী বিষয়ে ভাষণ দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করবেন, তার খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি তাতে যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে।
পরবর্তী ঘটনাক্রম কেমন হবে, তা অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয়। কেন্দ্রীয় সরকার ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকবে। তাতে বিজেপি ঘনিষ্ঠ পাহাড়ের দলগুলি যোগ দেবে। কিন্তু, রাজ্য সরকারের কোনও প্রতিনিধি যাবে না। গেলেও তিনি রাজ্যের আপত্তির কথা জানিয়েই চলে আসবেন। আর তারই সুযোগ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গে প্রচারে এসে তিনি বলবেন, আমরা গোর্খাদের এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। তাঁদের দাবির সঙ্গে আমরা একমত। শান্তিপূর্ণ পথে সমাধানের জন্যই মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করা হয়েছে। তৃণমূল সরকার সেটা চাইছে না। ফলে যতদিন না এই সরকারের পরিবর্তন হবে ততদিন গোর্খাদের এবং উত্তরবঙ্গবাসীর স্বপ্ন পূরণ হবে না।
একথা ঠিক, পাহাড়ের অধিকাংশ দল পৃথক রাজ্যের দাবিকে সমর্থন করে। সেটা না করলে পাহাড়ের রাজনীতিতে তাদের অস্তিত্বই থাকবে না। তা সত্ত্বেও কিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি ভালো চোখে দেখছে না। তাদের সাফ কথা, ‘পাহাড়বাসীর কী দাবি, সেটা বিজেপি সরকারের অজানা নয়। তারজন্য আলোচনা বা রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে কথা বলার কোনও প্রয়োজন হয় না। কেন্দ্র সরাসরি পদক্ষেপ করুক। সেটা না করে কেন্দ্রের সরকার ফের ধাপ্পা দিচ্ছে।’ কার্শিয়াংয়ের বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মাও চাঁচাছোলা ভাষায় কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘পাহাড়বাসীর দাবিপূরণের কোনও ইচ্ছাই কেন্দ্রের নেই। তাই ছাব্বিশের ভোটের আগে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে নাটক শুরু হয়েছে। এটা রাজনৈতিক খেলা ছাড়া কিছুই নয়।’
রাজনীতিতে ‘খেলা’ হয়। তাই বাংলা দখলের আশায় বিজেপি নানান গেমপ্ল্যান সাজাবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারজন্য পাহাড় নিয়ে বিজেপি যা করছে, তা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। মধ্যস্থতাকারী ইশ্যুতে ফের যদি পাহাড় উত্তপ্ত হয়, অশান্তি ছড়ায়, তারজন্য বাংলার মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারকে দুষবে। সবাই একটা কথাই বলবে, কয়েকটি আসন পাওয়ার লোভে পাহাড়কে অশান্ত করল বিজেপি।
গোর্খাল্যান্ডের দাবি নতুন কিছু নয়। বাম আমলেও উঠেছিল। কিন্তু, সিপিএম নেতৃত্ব সেই দাবি মানেনি। কারণ বামেদের পা তখনও ‘মাটি’তে ছিল। তারা জানত, এই দাবি মানলে বাংলার মানুষ তাদের কোনওদিন ক্ষমা করবে না। তৃণমূল কংগ্রেসও বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে। কিন্তু, বিজেপি মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে কার্যত বাংলা ভাগের দাবিকেই মান্যতা দিল। গিমিক ও বিভাজনের রাজনীতির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিজেপির এই বাংলায় পায়ের তলায় মাটি নেই বলেই তারা এমন একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারল।
মধ্যস্থতাকারী কখন দরকার হয়? যখন দু’পক্ষের মধ্যে বিবাদ চরমে ওঠে। বন্ধ হয়ে যায় পারস্পরিক আলোচনার পথ। তখন সম্পর্কের বরফ গলিয়ে বন্ধুত্বের পথ প্রশস্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু এক্ষেত্রে কী হল? এখন
পাহাড়ের কোথাও অশান্তি নেই। নেই কোনও দ্বন্দ্ব। তবুও কেন্দ্রীয় সরকার মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করল। এতেই বোঝা যাচ্ছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়, দ্বন্দ্ব বাধিয়ে বাংলায় নতুন করে অশান্তি পাকানোই দিল্লি বিজেপির লক্ষ্য।