সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: অল্প বয়সে বিয়ে নয়। বরং পড়াশোনা করলে উইং কমান্ডার ব্যোমিকা কিংবা সোফিয়া হওয়া যায়। হওয়া যায় সুনিতা উইলিয়ামসও। বাঙালির দুর্গাপুজো মানে অশুভ শক্তির বিনাশে শুভ শক্তির লড়াই। সেই বঙ্গ-সমাজে বাল্যবিবাহ অনেক ‘অশুভ শক্তি’র মধ্যে একটি। গেড়ে বসা একটা অভিশাপও। তাই, দুর্গতিনাশিনীর আরাধনা শুধু উৎসব আবহেই বাঁধা থেকে যাবে, সেটা চায়নি মঙ্গলকোটের প্রত্যন্ত এলাকা পালিশগ্রামের পুজো কমিটি। বাল্য বিবাহে নানা দুর্গতির সম্ভাবনা তুলে ধরে সচেতনতার পাঠ দিচ্ছে তারা। ফলে, এবার পালিশগ্রামের পুজোমণ্ডপ হয়ে উঠছে নাবালিকাদের ‘আয়না’। আইকন হিসেবে চোখের সামনে ভেসে উঠবেন সোফিয়া-সুনিতারা।
বর্ধমান থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে পালিশগ্রাম। অজয়ের পাড়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা নাবালিকাদের বিয়ে। পড়শি ব্লক কেতুগ্রামেও আকছার ঘটছে বাল্য বিবাহ। জেলার মধ্যে সর্বাধিক। অল্প বয়সে গর্ভবতী হয়ে অনেকে মারাও গিয়েছে। সমাজের এই ব্যাধিকে সারাতে পালিশগ্রামের পুজো উদ্যোক্তাদের থিম ‘আঠারোর আগে বিয়ে নয়’। বরং পড়াশোনা করলে কীভাবে ব্যোমিকা, সোফিয়া হওয়া যায়। আমলা দেশের কাজ করা যায়।
সিন্দুর অপারেশনের সময় থেকে মেয়েদের আইডল হয়ে উঠেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং এবং কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। দু’জনই ভারত-পাক যুদ্ধ পরিস্থিতির আপডেট দিচ্ছিলেন প্রতিদিন। করছিলেন সাংবাদিক বৈঠক। গোটা দেশ তাঁদের কথা শুনেছিল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। এই দুই কন্যার ‘মডেল’ রাখা হবে পালিশগ্রামের মণ্ডপে। এছাড়া থাকছে প্রশাসনের শীর্ষস্তরে থাকা মহিলাদের মডেলও।
পালিশ গ্রামেই বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলাপরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহারের। তিনিও পুজো উদ্যোক্তাদের অন্যতম। সভাধিপতি বলছিলেন, ‘নাবালিকাদের মধ্যে বিয়ে করার প্রবণতা ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। সেটা আমাদের আটকাতে হবে। না হলে একটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়াবে। পুজো মণ্ডপে সব বয়সের মানুষজন আসেন। আমাদের মনে হয়েছে, সমাজকে বার্তা দেওয়ার এটাই মোক্ষম সুযোগ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রীর মতো যুগান্তকারী প্রকল্প চালু করেছেন। শিক্ষাশ্রীর মতো একাধিক প্রকল্পও রয়েছে। পড়াশোনার খরচের জন্য এখন আর কাউকে চিন্তা করতে হয় না। পড়াশোনা শিখে বহু মেয়ে দেশের শীর্ষস্তরে রয়েছেন। তাঁদের মডেলও এলাকার বাসিন্দাদের সামনে তুলে ধরা হবে।’ গ্রামের আর এক পুজো উদ্যোক্তা ঝন্টু অধিকারী বলছিলেন, ‘আমরা চাই পুজো মণ্ডপ থেকে উৎসবের আমেজ নিয়ে দর্শনার্থীরা ইতিবাচক ভাবনা ভাবতে শিখুক। এখন মেয়েরা সবক্ষেত্রেই পুরুষদের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে। কিন্তু, প্রলোভনে হোক বা অন্য কোনও কারণে হোক, এক শ্রেণির ছাত্রী পথভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের মূলস্রোতে ফেরাতে আমাদের এমন অভিনব ভাবনা।’
পূর্ব বর্ধমান জেলাপ্রশাসন নাবালিকাদের বিয়ে রোধে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। খোদ জেলাশাসক আয়েশা রানি এ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সচেতনতারা বার্তা দিচ্ছেন। তিনি নিজে ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলছেন। আর সভাধিপতির গ্রামে এবার পুজোর থিম হয়ে উঠেছে ‘আঠারোর আগে বিয়ে নয়’। বাল্যবিবাহ রোধে এই সাঁড়াশি প্রচেষ্টা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করা হচ্ছে।