Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শুনি বঙ্গে বসন্তোৎসবের ধ্বনি

বাংলার বহু স্থানে অচিন নামে এক বিশেষ গাছ দেখা যায়। অপরিচয়ের দৌলতেই এরকম নাম। অনেক ক্ষেত্রেই যে গাছটি পাওয়া যায় তার নাম হল তমাল।

শুনি বঙ্গে বসন্তোৎসবের ধ্বনি
  • ১৪ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: বাংলার বহু স্থানে অচিন নামে এক বিশেষ গাছ দেখা যায়। অপরিচয়ের দৌলতেই এরকম নাম। অনেক ক্ষেত্রেই যে গাছটি পাওয়া যায় তার নাম হল তমাল। এখন বসন্ত উৎসবের কথায় হঠাৎ কেন এই সবুজের অভিযান? কারণ এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে দোলযাত্রা। রাধাকৃষ্ণ এই গাছের তলেই রঙের খেলায় মেতে উঠতেন বলে কথিত। আবার অতীতে যে রং নিয়ে খেলা হতো তা সংগৃহীত হতো গাছ থেকেই। এখন অতীতপানে গিয়ে আমাদের মধ্যে সেই হার্বাল রং বা আবিরের কদর বেড়েছে।

Advertisement

আজ দোল উৎসবে গোটা দেশের সঙ্গে বাঙালি মেতে উঠেছে। এই উৎসবের পৌরাণিক কেন্দ্রবিন্দু রাধাকৃষ্ণ। কবি জয়দেবই প্রায় আটশো বছর আগে লিখেছিলেন ‘গীতগোবিন্দ’। এর প্রথমেই রয়েছে রাধাগোবিন্দের বসন্তরাস বর্ণনা। সেখানেও রয়েছে তমালগাছের কথা। রাসায়নিক রং বা আবির নয়; চারপাশে ফুটে থাকা বকুল, পলাশ, নাগেশ্বর, পারুল, কেতকী, মাধবী যেন কাব্যে রঙের আসর জমিয়ে দিয়েছিল। প্রতি বৃহস্পতিবারে বাঙালির ঘরে ঘরে পাঠ করা হয় লক্ষ্মীর পাঁচালি। তিনি শারদলক্ষ্মী হলেও তাঁর বন্দনার শুরুটা লক্ষ করার মতো—‘দোল পূর্ণিমা নিশি নির্মল আকাশ।’ পয়ার ছন্দের সেই বেড়ি ভেঙে বঙ্গসাহিত্যে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের পত্তন করেন দুশো বছর পেরনো  মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনিও লিখেছিলেন চতুর্দশপদী কবিতা ‘দে-দোল’। সেখানে এই দিনে দোলাসনে বসা রাখালরাজের পুজোয় কিন্নরবীণার মতো মধুকররা গুনগুন করছে, পৃথিবী ধারণ করেছে ফুলসজ্জা। আকাশ মুখরিত হয়েছে কোকিলের গানে,বাতাস ভরে উঠেছে নন্দনকাননের সৌরভে। 
উনিশ শতকীয় মধুকবির মতো বিশ শতকের কবি বিষ্ণু দে-র ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত’-এ মিশে রয়েছে ‘বন্য দোল’। যে দোলের জন্য পলাশপিয়াসী বাঙালি এই সময় ছুটে যায় পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমে পুরুলিয়ায়। সেখানে তারা চাক্ষুষ মিলিয়ে নিতে পারে কবির ও কবিতার কথাকে—‘প্রাচীন রক্তে কিংশুকে লাল ফাগুন।’কবি একদিকে দূরের বসতিতে মাতোয়ালা ফাল্গুনী ও নাগড়াবাঁশিতে সারারাত বসন্তপূর্ণিমায় প্রেমকে ভাঙতে গড়তে দেখেছিলেন। অন্যদিকে সেই অরণ্যদোলের মধ্যে তিনি মিলিয়ে দিয়েছিলেন ‘দেশের দশের প্রাকৃত তুলনা’-কে। 
দত্ত এবং দে কবিদ্বয়ের মাঝে বাংলাদেশের ভাওয়ালের স্বভাবকবি গোবিন্দচন্দ্র দাসের ‘বসন্ত-পূর্ণিমা’কবিতার কথা এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়। জীবিতকালে ভাওয়াল হতে নির্বাসিত হয়েছিলেন তিনি। আর আজ সাগরদাঁড়ির মধুসূদনকেও বাংলাদেশ ঠাঁই দিচ্ছে না! যাই হোক ১৮৮৫ সালের সেই কবিতায় গোবিন্দদাস পূর্ণিমার চাঁদকে দারুণভাবে দুষেছিলেন, তাকে জ্যোৎস্না বিলিয়ে হাসতে মানা করেছিলেন। কারণ বাংলার ঘরে ঘরে, বাঙালি সমাজে এমনকী বঙ্গদেশ সহ পরাধীন ভারতবর্ষে তখন চলছিল এক নিদারুণ অবস্থা। তাই চাঁদকে দূর হয়ে যেতে বলেছেন। তবে সিন্ধু-বঙ্গ এক ঠাঁই ও সকলে ভাইভাই হলে আবার চাঁদের উদয় কামনা করেছেন তিনি। আজ এই দুই পড়শি ভারত-বাংলাদেশকে দেখলে এই কথাগুলি নিঃসন্দেহে কবির কলমে আরও দুর্বার হয়ে উঠত। আমরা যে তিন কবির কথা আলোচনা করলাম তাঁরা কিন্তু নামের দিক থেকে দোলের দিনের আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণের সমার্থক। 
এখন হিন্দি ভাষার আধিপত্য ও আগ্রাসনের পাশাপাশি আত্মবিস্মৃতির দরুন বাঙালির মুখে দোলের বোল যেন অনেকটাই উড়ে গিয়ে হোলির বুলি ফুটে উঠেছে। তাই হয়তো ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত ‘দুই কাননের পাখি’গল্পগ্রন্থে ‘হোলি’গল্প লিখেছিলেন শ্রদ্ধেয় সন্তোষকুমার ঘোষ। আজ দোলের সঙ্গে হোলি মিলিয়ে বাঙালি দুই দিন ছুটি উপভোগ করে। যাই হোক গল্পকার স্বয়ং গল্পকথক হয়ে তাঁর হোলিযাপনের কথা লিখেছেন।  গল্পের আবহে ফুটে ওঠে ক্যানেস্তারা পিটানো উল্লাস রব—হো-ও-লি-ই  হ্যা-আ-আ-য়।
এর ঠিক এক বছর আগে প্রকাশিত হয় চিত্রকর শৌরীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘বাঁশীর আগুন’ কাব্য। তাতে ছিল ‘অগ্নিহোলি’ও ‘রক্তহোলি’ নামে দুটি কবিতা। সেখানে কবি দুর্নীতির ধ্বংসকে দোলের দোসর করতে চেয়েছেন। চারিদিকে খুনখারাবি, স্বেচ্ছাচার, বেইজ্জতি, দাঙ্গার রংরসিয়ায় অতিষ্ঠ শ্রীহরি যেন বন্দুক দিয়ে পিচকারি ও বোমার কুমকুম ছেড়েছেন। মানুষের হৃদরক্তকে আবির ও কুমকুম বানিয়ে, রক্তহোলির মাদল তুলে তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘নতুন হোলির বাজাই বাঁশী গুড়ুম গুড়ুম গুড়ুম গুম্।’ 
এখনকার এই অমানবিক বিদ্বেষের বাতাবরণে প্রকৃতি কিন্তু সম্প্রীতির বার্তা দিতে ভোলেনি। পবিত্র রমজান মাসে উদযাপিত হচ্ছে ও হবে দোলপার্বণ ও ঈদ পরব। দুই ধর্মের দুটি উৎসবই কিন্তু নির্ভর করে থাকে চাঁদের উপর। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে দোলপূর্ণিমার দিনেই বাঙালি হিয়ার অমিয় মন্থন করে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য। যিনি সুলতান হোসেন শাহ থেকে রাজমন্ত্রী রূপ-সনাতন, যবন হরিদাস ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-জাতি নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যসূত্রে বেঁধেছিলেন। আজও দেশে দেশে তাঁর মতো মহামানব বা তাঁর ভাবধারার ভীষণ প্রয়োজন। কেমন ছিল ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে নিমতলায় নিমাইয়ের জন্মক্ষণের সেই বসন্তপূর্ণিমা? বাংলা ভাষায় প্রথম চৈতন্যজীবনীকাব্য ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত’-কার বৃন্দাবন দাস এবং পরবর্তীতে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’-কার কৃষ্ণদাস কবিরাজও বলেছেন যে, নবদ্বীপচন্দ্র গৌরাঙ্গের আবির্ভাবের দিনে ছিল চন্দ্রগ্রহণ—‘ফাল্গুন পূর্ণিমা সন্ধ্যায় প্রভুর জন্মোদয়।/সেই কালে দৈবযোগে চন্দ্র গ্রহণ হয়।।’
প্রেমপ্রীতির দোলের দোলাতে অনায়াসেই সম্মিলিত হয়ে যান বিদ্রোহীচেতনিক নজরুলও। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গানের বই ‘বুলবুল’-এ একটি গান রয়েছে—‘আজই দোলপূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়।/দখিনার দোল লেগেছে দোলন-চাঁপায়।।’দুখু মিয়াঁর এই অমর গানে আজও দুলে ওঠে দোলফাগুনের ফুল, মধুর ব্যথায় বিধুর হিয়া, বধূর মেখলা-বেণী, বঁধুর গলার মালা। সেইসঙ্গে দোলে মাধবীলতায় দোয়েল, জোয়ারে নদীর জল, পলাশরঙে বসন্তরানি, নীলিমার কোলে চাঁদ এবং অতি অবশ্যই শ্যাম-পিয়ারী। আবার ১৯৩২ সালে প্রকাশিত পঞ্চম নজরুলগীতিগ্রন্থ ‘সুর-সাকী’তে একই গান দুই বার করে রয়েছে—সামান্য কথা ও পংক্তিবিন্যাসের ফারাকে। সেই ‘আজি দোল-ফাগুনের দোল লেগেছে’—গানে তিনি দুলিয়ে দিয়েছেন আমের বোল, দোলনচাঁপা, কৃষ্ণচূড়ার দোয়েল-শ্যামা, শ্যামলগাছের আবিররাঙা ফুল, ভাটফুলে উড়ে এসে বসা প্রজাপতিকে। ছন্দ,বর্ণ, গন্ধের দোলায় কবির মন ছুটে গিয়েছে সুদূর গোকুলে—বৃন্দাবনের প্রেমযমুনায়। এই বইয়েরই ‘আজকে দোলের হিন্দোলায়’ গানে সাংগীতিক  সকলকে দোল দেওয়ার জন্য ডেকেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতোই দ্বার খুলে সকলকে দেখতে বলেছেন অশোকের রক্তিমা, ফুলে ফুলে ডামাডোল ফুলেল রাত। সবাইকে শুনতে বলেছেন হেনা বা মেহেন্দিকুঁড়ির ডাক।
বাংলায় বসে বাঙালির কলমে রাজপুতানিয়া রাজস্থানের হোলি দেখতে হলে পড়তে হবে রবীন্দ্র‘কথা’-র ‘হোরিখেলা’ কবিতা। পাঠান কেসর খাঁয়ের আক্রমণে কোটা ছেড়ে কেতুনে এসে তখন বসবাস করছেন ভূনাগ রাজার রানি। প্রতিপক্ষ কেসর খাঁকে হোলি খেলার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি নিয়ে এসেছিলেন বকুলবাগানে। রানির একশোজন সখী কোমরে পিচকারি, হাতে ফাগ ও গোলাপজল নিয়ে প্রথমে পাঠানদের সঙ্গে খেলেছেন দোল। ফল হয়েছিল —‘কোথা হতে রাঙা কুজ্ঝটিকা/লাগল যেন রাঙা সন্ধ্যাকাশে।’একসময় রানি ফাগের থালা নিয়ে এসে কেসর খাঁয়ের মাথায় সেই থালা দিয়ে সজোরে করলেন আঘাত। নতুন ভাবে রাঙা হয়ে উঠল কেসর। কিন্তু তার কারণ রং নয়—রক্ত। ঠিক তখনই সখীরা ছদ্মবেশ ঘুচিয়ে রাজপুত বীররূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। বসন্তদূত কোকিলের বিরামহীন কলকাকলির মধ্যেই পাঠানরক্তে সেই বছরের হোরি খেলা সাঙ্গ করেছিলেন রাজপুতানীরা।
বসন্ত শব্দটি কিন্তু শুধুমাত্র ঋতু বা উৎসবকে সূচিত করে না। পাশাপাশি বসন্তকালে আচমকা হওয়া বসন্ত রোগের কথা কি ভুলে থাকা যায়! দ্বার খুলে এ স্থলে জলে বনতলে দোল লাগানোর বহু গানের গীতিকার চিরবসন্তের প্রতীক রবি ঠাকুরকে আমরা এক্ষেত্রেও অনায়াসে পেয়ে যেতে পারি। মনে পড়ে যায় সেই ‘চিত্রা’ কাব্যের ফাল্গুনে লেখা কবিতার ‘পুরাতন ভৃত্য’ কেষ্টাকে। যার প্রভু বৃন্দাবনে গিয়ে এই রোগের কবলে পড়ে বলেছিলেন,‘কোথা হা হন্ত চিরবসন্ত! আমি বসন্তে মরি।’শেষ পর্যন্ত সেবার মাধ্যমে প্রভুকে বাঁচিয়ে তার রোগ দেহে নিয়ে চিরতরে প্রভুকে ছেড়ে জগৎপ্রভুর কাছে চলে যায় কেষ্টা ভৃত্য। রবির নতুন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা লিখেছিলেন ‘বসন্ত-রোগ’ নামে একটি প্রবন্ধ। তাঁর সেই লেখা থেকে আমরা গো-বসন্ত ও ইচ্ছা-বসন্তের কথা জানতে পারি। বসন্তের নাম প্রাচীন আয়ুর্বেদে ছিল মসূরিকা। বোঝাই যায় যে মসুর ডালের মতো দেখতে দানা গায়ে বেরনোর জন্যই এই নাম। ইস্তানবুল, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আফ্রিকায় বসন্তটীকার নানা পরিসংখ্যানযোগে ফলাফল সম্পর্কে তিনি আলোচনা করেছিলেন। মনটেগ, গয়, জেনর, পার্ক, প্রিঙ্গল প্রমুখ টীকাবিশেষজ্ঞের কর্মকাণ্ডও ব্যাখ্যা করেছেন। বিলাতে বসন্তরোগীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বা নোটিস,পৃথকীকরণ বা কোয়ারেন্টাইন, ক্লোরিন-সালফারের মাধ্যমে বায়ুশোধন ও জীবাণুনাশ ইত্যাদির পন্থাগুলোর বিশদে ব্যাখ্যা করেছিলেন প্রাবন্ধিক।
সবশেষে কথা বলব দোল নিয়ে আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে রচিত একটি লেখা নিয়ে।‘নবযুগ’ পত্রিকায় ১৯২৫ সালের ৩০ ফাল্গুন ‘দোল’নামের প্রবন্ধটি লিখেছিলেন অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ। ছাব্বিশটি ভাষা জানা এই অধ্যাপক,পত্রিকাসম্পাদক ভারতের প্রথম বিদেশি ভাষাশিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তা আবার একশো পঁচিশ বছর আগে। তৎকালীন অনাবিষ্কৃত ইন্টারনেটের যুগে তিনি যেভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও জনজাতির মধ্যে প্রচলিত বসন্ত উৎসবের নানা নাম, রীতি, মুঘলসম্রাট বা নবাবদের দোলপ্রীতি, পৌরাণিক ব্যাখ্যা, সাহিত্য-অনুষঙ্গের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন তা অধুনাচলিত গুগলকেও হয়তো হার মানাবে। তাঁর কথা দিয়েই সকলকে জানাই বসন্ত উৎসবের হার্দিক অভিনন্দন—‘দোল বসন্তের উৎসব।... আজিকার দোললীলাও সেই বাসন্তী রুচির এক অভিনব লীলায়িত ক্রম।’
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক। মতামত নিজস্ব

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ