• সারাদিন যেখানেই থাকি না কেন, রাত আটটায় মা ফোন করবে। ‘রাতে কী খাবি?’ প্রতিদিন একই প্রশ্ন। এটাই ছিল আমার বহু বছরের রুটিন। সেদিন আমি শ্যুটিংয়ে। রাত আটটা। মায়ের ফোন। একই প্রশ্ন। তার সঙ্গে জুড়ে দিল, ‘আজ মাছ রান্না করেছি।’ আমি বলেছিলাম, রান্না যখন করেই ফেলেছ, মাছই খেতে হবে। তাহলে আর জিজ্ঞেস করছ কেন? মা বলল, ‘বল না, কী খাবি?’ আমি বলেছিলাম, মটন।
মা তো শুনে অবাক! আমিও শ্যুটিংয়ের তাড়ায় হুড়োহুড়ি করে ফোন রেখে শট দিতে চলে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফিরে দেখি, অল্প সময়ের মধ্যেই কাউকে দিয়ে মটন আনিয়ে মা রান্না করে রেখেছে! এই হলেন আমার মা, মনীষা দে। কিন্তু মায়ের কাছে সবকিছু নিয়ে এই আবদার করার জায়গাটা আর নেই। মা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে অনেক বছর হয়ে গেল।
মাকে নিয়ে কথা বলা তো শেষ হয় না। আমার যত বয়স বাড়ছে তত বুঝতে পারছি ‘মা’ শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে সবথেকে সুন্দর শব্দ হল ‘মা’। যা-ই হয়ে যাক, প্রতিটা মুহূর্তে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। এখনও প্রতিটা পরিস্থিতিতে মায়ের কথা ভাবি। খিদে পেল, মনখারাপ হল— সবেতেই মা। আমি অনুভব করেছি, মানুষ চলে গেলে তার নামটাও মুছে যায়। নাম নিয়ে হয়তো সেই মানুষটার কত ভালোলাগা ছিল। কিন্তু সেসব আর কেউ মনে রাখে না। সেজন্যই আমার নামের সঙ্গে মায়ের নামও আমি ব্যবহার করি। মানালী মনীষা দে।
সদ্য দুর্গাপুজো পেরিয়ে এলাম আমরা। সকলেরই পুজো আসছে, ভাবলেই আনন্দ হয়। আমারও হয় হয়তো। কিন্তু এখনও মহালয়া শুনলে কান্না পায়। কোনও বছর পুরোটা শুনতে পারি না। কারণ মনে হয়, দুর্গাঠাকুর যদি তার পুরো পরিবার নিয়ে বছরে একবার অন্তত বাপের বাড়ি আসতে পারে, তাহলে আমার মা কেন নয়? মা যে আর আসতে পারবে না, এটা ভাবলে অভিমান হয়। এখন আর অঞ্জলি দিই না। কারণ মায়ের সঙ্গে অঞ্জলি দিতে যেতাম। অন্য কারও সঙ্গে গিয়ে অঞ্জলি দিতে ভালো লাগে না। বিজয়ার প্রণামও আলাদা করে কাউকে করতে যাই না। কোনও অনুষ্ঠানে গেলে সিঁদুরখেলা হয় ঠিকই। কিন্তু আগের মতো সিঁদুরও খেলি না। কারণ এসবই মায়ের সঙ্গে করতাম। নতুন করে আর সেই অভ্যাস তৈরি করতে পারব না।
আমাদের এমনই জীবন এখন, একটা বয়সের পর যদি মা, বাবা ফোন করেন, আমরা ভাবি পরে কথা বলব। আগে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে নিই। অথবা যে কাজটা করছি, সেটা শেষ করি। মা, বাবা তো রইলই। এখানেই বড্ড বড় ভুল হয়ে যায়। আসলে মা, বাবাকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ করে নিই হয়তো। সেটা একেবারেই উচিত নয়। এটা আমার সব বন্ধুকে বলি। কারণ মায়ের ফোন এখন আমি মিস করি। সময় থাকতে তো বুঝতে পারিনি। মায়ের সবকিছু ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়লেও মাকে তো আর ছুঁয়ে দেখতে পারি না।
মায়ের ছোট ছোট জিনিসও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আলমারি ভর্তি মায়ের শাড়ি..., আমি ছুঁয়ে দেখি। এ যেন মাকে জড়িয়ে থাকা। সেসময় এই শাড়ি পরে সেজেগুজে মাকে কেমন দেখতে লাগছিল, সেটা ভাবি। দারুণ সুন্দরী ছিল মা। বয়স যতই বাড়ুক, আমার সবকিছু জুড়ে মা। সারা জীবন মা আমাকে জুড়েই থাকবেন। আমার মনে হয় সকলের ক্ষেত্রেই তাই। মায়ের মতো সেরা মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ হতেই পারে না।