ঘরোয়া লিগ ঘিরে বাঙালি বরাবরই নস্টালজিক। একটা সময় লিগের ম্যাচে সবুজ ঘাসে স্ফুলিঙ্গ ছুটত। ময়দান জুড়ে উত্থান-পতন, হাসিকান্নার কোলাজ। কলকাতা লিগ বহু তারকার জন্মদাতা। অনেকেরই কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে জলকাদার ফুটবল। তাদের মধ্যে বাছাই করা তারকারা অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুললেন বর্তমানের পাঠকদের জন্য।
১৯৭৩ সাল। ক্যালকাটা জিমখানার হয়ে প্রথম কলকাতা লিগে খেলার সুযোগ পাই। আর প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ মোহন বাগান। বড় দলের বিরুদ্ধে খেলার চাপ তো থাকেই। তবে আমার কাছে সেই ম্যাচ প্রমাণের মঞ্চ ছিল। সফলও হই। এই অধমের গোলেই মোহন বাগানের বিরুদ্ধে হার বাঁচায় জিমখানা। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরে এরিয়ান হয়ে মোহন বাগানের জার্সি গায়ে চাপাই। কেরিয়ারের শেষদিকে মহমেডান স্পোর্টিংয়েও খেলেছি। সত্যি বলতে, ১৯৭৩ সালে সবুজ-মেরুন ক্লাবের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচই আমার কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাই কলকাতা লিগের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন ঘরোয়া লিগের সেই জৌলুস কোথায়? দিনে দিনে বিবর্ণ হচ্ছে প্রতিযোগিতা, যা দেখে সত্যিই কষ্ট হয়। দেশের ফুটবলকে বাঁচাতে কলকাতা লিগের গৌরব ফেরানো খুবই জরুরি।
কলকাতা লিগ শুধু প্রতিভা খোঁজেই না, খেলোয়াড়দের পরিণত করে। ময়দান কখনও কাঠফাটা রোদে পুড়ছে তো আবার কখনও বৃষ্টিতে কাদা মাঠ— এমন বিভিন্ন পরিবেশে খেলার সুবাদে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ে। তাছাড়া আমাদের সময় লিগের প্রতিটা ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। বড় টিমগুলির বিরুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করতে প্লেয়াররা জান লড়িয়ে দিত। সমর্থকদের উন্মাদনাও ছিল দেখার মতো। বড় ম্যাচ থাকলে তো আগের রাত থেকে ময়দানে লাইন পড়ে যেত। এখন সেই উন্মাদনা উধাও। অনেকে বলছেন, বিদেশি খেলানোয় নিষেধাজ্ঞার কারণে নাকি জৌলুস কমছে। আমি তাঁদের সঙ্গে একমত নই। আমাদের সময়ও তো কলকাতা লিগে বিদেশিরা খেলত না। তখন তো উন্মাদনায় ভাঁটা পড়েনি। আসলে, ময়দান থেকে বেশিরভাগ খেলা জেলায় নিয়ে যাওয়াটাই কাল হচ্ছে। তাছাড়া বড় ক্লাবগুলি এখনও জুনিয়র এবং রিজার্ভ বেঞ্চের ফুটবলারদের কলকাতা লিগে খেলায়। আইএসএলের ক’জন ফুটবলার ঘরোয়া লিগে খেলতে দেখা যায়? তাতেও আকর্ষণ কমছে অনুরাগীদের। তাছাড়া আইএসএল শুরু হওয়াতে ভারতীয় ফুটবলের কোনও লাভ হয়নি, বরং পিছচ্ছে। এখন ভারতের র্যাঙ্কিংয়ে চোখ রাখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সুনীল ছেত্রীর পর ভারতে স্ট্রাইকার কোথায়? গোল না করলে জিতবে কী করে? প্লেয়ার তুলতে কলকাতা লিগের জৌলুস ফেরাতে হবে। এখন বিদেশি না খেলিয়ে বঙ্গসন্তানদের বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, এটা ভালো সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি সায়ন, দীপ্যেন্দু, নরহরি শ্রেষ্ঠার মতো তরুণরা নজর কেড়েছে। আর অনুরাগীদের উন্মাদনা ফেরাতে জেলা থেকে ম্যাচ ময়দানে ফেরানো হোক।