বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: বেসরকারি সংস্থার যেসব কর্মচারী পিএফের আওতায় রয়েছেন, তাঁরা তিন ধরনের আর্থিক সুবিধা পান। পিএফের থোক টাকা, পেনশন এবং কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে জীবনবিমার সুবিধা। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশনের (ইপিএফও) এই বিমা প্রকল্পটি হল এমপ্লয়িজ ডিপোজিট লিংকড ইনসিওরেন্স বা ইডিএলআই। কর্মরত অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাঁর পরিবার সর্বোচ্চ সাত লক্ষ টাকা বিমা বাবদ পেতে পারে। এই জীবনবিমাকে কেন্দ্র করেই উঠল নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ। জানা গিয়েছে, ইডিএলআই স্কিমকে হাতিয়ার করে কয়েকশো কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিভাগীয় আধিকারিক ও কর্মীদের একাংশ। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কেষ্টবিষ্টুদের যোগসাজশের প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কেমন সেই দুর্নীতির বহর? অভিযোগ, বহু জীবিত মানুষকে মৃত সাজিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে বিমার টাকা। জীবিত মানুষকে পরপর দু’বার মৃত দেখিয়ে দু’বার বিমার টাকা তুলে নিয়েছে অসাধু কারবারিরা। বিপুল অঙ্কের এই দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী মনসুখ মান্ডব্য থেকে শুরু করে মন্ত্রকের অন্যান্য কর্তাব্যক্তি ও ভিজিলেন্স সহ বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থায়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে কেন্দ্র বিষয়টি নিয়ে চুপ! সূত্রের খবর, এনিয়ে তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এখনও।
দুর্নীতির অভিযোগ মূলত জলপাইগুড়ির আঞ্চলিক পিএফ অফিসকে ঘিরে। এখানে যে দুর্নীতি হচ্ছে, সেই অভিযোগ যায় এক সাংসদের কাছে। বিষয়টি সংসদে ওঠে। তখন পিএফ দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের আধিকারিকদের নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠিত হয়। সূত্রের খবর, কমিটি তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট অফিসার ও কর্মীরা তদন্তে সহায়তা করেননি। যথাযথ নথিও দেওয়া হয়নি কমিটিকে। তারপরও চাপা যায়নি দুর্নীতি। দেখা যায়, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত এই অফিস থেকে ইডিএলআই বাবদ প্রায় ২৩ হাজার ক্লেম মেটানো হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষ থেকে ক্লেম ও টাকা মিটিয়ে দেওয়ার হার অস্বাভাবিক বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে তা পৌঁছায় সর্বোচ্চ স্তরে। তদন্তে উঠে আসে, এই ক্লেমের জন্য যে ডেথ সার্টিফিকেটের কপি জমা করা হয়েছে, বহু ক্ষেত্রেই তা নকল। রাজ্য সরকারের জন্ম-মৃত্যু পোর্টালের মাধ্যমে অনেক ডেথ সার্টিফিকেট যাচাই করা হয়নি। যে ক’টি ‘কেস’ নিয়ে তদন্ত হয়েছিল, তার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ডেথ সার্টিফিকেটগুলি নকল মিলেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সাংসদ- বিধায়ক নিজেরাই লিখিতভাবে কোনো কর্মীর মৃত্যু ‘সার্টিফাই’ করছেন। আর তার ভিত্তিতে মৃত্যুজনিত আর্থিক সুবিধা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনার ইপিএফওর লোগোযুক্ত প্যাডে কর্মীর মৃত্যুর সার্টিফিকেট দিচ্ছেন! একই ব্যক্তির ২০০৬ এবং ২০১৮ সালে দু’বার মৃত্যু দেখিয়ে দু’বার টাকা তোলা হয়েছে। এমনকি, ২০১৮ সালে যে ব্যক্তি কর্মরত অবস্থায় মৃত বলে পিএফে নথিভুক্ত হয়েছেন, পুরসভা তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেছে ২০২৪ সালে! যাঁরা এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের অল্প কিছুদিনের জন্য নিয়মরক্ষার বদলি করে ফের পুরানো জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় রিপোর্টে।
এত কাণ্ডের পরও কেন্দ্রীয় সরকার উদাসীন দেখে তদন্তের দাবিতে ফের চিঠি গিয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে। যে জীবিত কর্মীদের মৃত দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, তাঁরা স্বাভাবিক কারণেই পেনশন পাচ্ছেন না। বিচার চাইতে গেলে উলটে জুটছে ঘাড়ধাক্কা। এক্ষেত্রে চা বাগানের শ্রমিকদেরই মূলত ‘বলির পাঁঠা’ করা হচ্ছে বলে খবর।