নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যপালের সম্মতির পর সোমবারই সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং সংগঠিত অপরাধ রুখতে রাজ্যে কার্যকর হয়েছে ‘গুন্ডাদমন আইন’। আর এদিনই কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হল জনস্বার্থ মামলা। প্রশ্ন একটাই—এই আইনের আওতায় গুন্ডার সংজ্ঞা কী হবে?
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যপালের সম্মতির পর সোমবারই সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং সংগঠিত অপরাধ রুখতে রাজ্যে কার্যকর হয়েছে ‘গুন্ডাদমন আইন’। আর এদিনই কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হল জনস্বার্থ মামলা। প্রশ্ন একটাই—এই আইনের আওতায় গুন্ডার সংজ্ঞা কী হবে?
এদিন বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, এই ‘গুন্ডাদমন আইন’ মানুষের অধিকার খর্ব করতে পারে। গুন্ডা হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার মাপকাঠি কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পাশাপাশি এই আইন কার্যকর হওয়ার ফলে পুলিশি ‘অতিসক্রিয়তার’ আশঙ্কাও করেছেন তিনি। আদালত মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে। একইসঙ্গে সব পক্ষকে নোটিস জারির পর নির্ধারিত সময়ে মামলার শুনানি হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।
‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্ট, ২০২৬’ বা ‘গুন্ডাদমন আইন’ অনুযায়ী, প্রশাসন যদি মনে করে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ‘জন নিরাপত্তা’র জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন কিংবা কোনো বড়োসড়ো সমাজবিরোধী অপরাধের চক্রান্ত করছেন, তাহলে অপরাধ ঘটানোর আগেই তাঁকে বিনা বিচারে সর্বাধিক ১২ মাস অর্থাৎ এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। আইনে যুক্ত হয়েছে ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ বা এলাকাছাড়া করার ক্ষমতাও। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকরা যদি নিশ্চিত হন যে, কোনো দাগি অপরাধী বা গুন্ডা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকলে অশান্তি ছড়াতে পারে, তবে সেই অপরাধীকে অনধিক এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা সমগ্র জেলা থেকে ‘বহিষ্কার’-এর নির্দেশ দিতে পারবেন।
‘গুন্ডাদমন আইন’-এ জামিন-অযোগ্য ধারা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থানও রাখা হয়েছে। আইনটিকে আরও নিশ্ছিদ্র করতে এর আওতাধীন সমস্ত অপরাধকে সম্পূর্ণভাবে জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে। এর ফলে পুলিশ কোনো পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। কোনো ব্যক্তি সমাজবিরোধী বা সিন্ডিকেটের মতো সংগঠিত অপরাধের মাধ্যমে যদি সম্পত্তি বা টাকা উপার্জন করে, তবে সেই সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার আইনি অধিকারও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে। সরকারি এবং বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের প্রবণতা রুখতেও কড়া বিধান রয়েছে নয়া আইনে। মামলায় এই ইস্যুতেই প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী। তাঁর বক্তব্য, ‘এই আইনের মাপকাঠিতে গুন্ডা হিসাবে কারা সংজ্ঞায়িত হবেন?’ এই প্রশ্ন তুলেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এই আইনের মাধ্যমে যে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে গুন্ডা হিসাবে চালিয়ে দেওয়া হবে না—তার নিশ্চয়তা কোথায়?
আইনজীবী মহলের একাংশের মতে, রাজ্য সরকারের জারি করা এই নতুন আইন কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’ বা এনএসএ-এর আদলে তৈরি হয়েছে। এই আইন কার্যকর হওয়ার ফলে পুলিশ এবং প্রশাসনের ক্ষমতা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে বলে মত তাঁদের। চলতি সপ্তাহে মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে এই আইন নিয়ে এদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘এটা খুব দরকার ছিল। প্রয়োজনের ডাক ছিল। গুন্ডা-হার্মাদদের জব্দ করার জন্য এই আইনের খুব দরকার ছিল। বিধানসভায় আমরা বিল পাশ করিয়েছি, রাজ্যপাল অনুমোদন দিয়েছেন।’ বিরোধীরা অবশ্য একে ইংরেজ জমানার রাওলাট আইনের সঙ্গেও তুলনা করছে। এই আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কাও করছে। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন বলেছেন, ‘গুন্ডাদের দমন করা হোক। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক নেতাদের উপর আইনের যেন অপপ্রয়োগ না হয়।’