Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

হাতের ট্যাটুই মূক ও বধির যুবককে বিহারে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিল

হাতের ট্যাটুই মূক ও বধির যুবককে বিহারে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিল
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
সংবাদদাতা, রামপুরহাট: হিন্দিতে লেখা ‘সিওয়ান’। ডান হাতের এই ট্যাটুই চিনিয়ে দিল ঠিকানা। প্রায় দেড় বছর পর রামপুরহাটের হোম থেকে বিহারে নিজের বাড়ি ফিরছে বছর উনিশের মূক ও বধির যুবক। মঙ্গলবার হোমে বাবাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ওই যুবক। ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেললেন বাবাও। 
Advertisement
বছর খানেক আগে বহরমপুরের চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির মাধ্যমে রামপুরহাট স্প্যাস্টিক অ্যান্ড হ্যান্ডিক্যাপ সোসাইটি হোমে ঠাঁই হয় ওই যুবকের। মূক ও বধির হওয়ায় তাঁর বাড়ি ঘর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবে যখনই বাইরের কেউ ওই হোমে আসতেন, তখনই ওই যুবক চিৎকার করে তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি কী বলতে চাইছেন, তা বুঝতে না পেরে এড়িয়ে চলে গিয়েছেন তাঁরা। গত রবিবার হোমের আবাসিকদের মধ্যে খাবার বিতরণ করতে আসেন মল্লারপুরের একটি রাইস মিল মালিকের স্ত্রী মঞ্জু খৈতান। একইভাবে তাঁকে দেখে দ্বিতলের জানালা দিয়ে ডান হাত বের করে চিৎকার শুরু করেন ওই যুবক। মঞ্জু দেবী হোম কর্তৃপক্ষকে তাঁকে নীচে নামিয়ে আনার জন্য বলেন। ওই যুবক ডান হাত দেখিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেন। তখনই তাঁর হাতে থাকা ট্যাটুতে নজর যায় মঞ্জু দেবীর। হাতে হিন্দিতে লেখা সিওয়ান। তিনি তৎক্ষণাৎ গুগুলে সার্চ করে দেখেন সিওয়ান বিহারের একটি জেলার নাম। ওই জেলার এক ব্যবসায়ীর কাছে তাঁদের মিল থেকে চাল যায়। মঞ্জু দেবী ছেলে রাহুল খৈতানের মোবাইলে যুবকের ছবি পাঠিয়ে সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেন। প্রথমে রাহুল অতটা গুরুত্ব দেয়নি। পরে মঞ্জু দেবী সিওয়ান যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এরপরই রাহুল সিওয়ানের ওই ব্যবসায়ীকে যুবকের ছবি পাঠিয়ে খোঁজ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে ওই যুবকের বাড়ি সিওয়ান লাগোয়া কৃষ্ণপুরা গ্রামে। তাঁর নাম আশিক আলি। খবর পেয়ে এদিন ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যেতে হোমে হাজির হন বাবা আসলাম আলি মদারি। পেশায় দিনমজুর আসলাম বলেন, পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে বড় আশিক। ছোট বেলায় ওর হাতে জেলার নাম লিখে দিয়েছিলাম। ২০২৩ সালের ১১ জুলাই থেকে ছেলে হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যায়। স্থানীয় থানায় নিখোঁজের ডায়েরি, বিজ্ঞাপন, অনেকে খোঁজাখুঁজি করেও পাইনি। ছেলে মূক ও বধির হওয়ায় ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভগবানরূপী এই ব্যবসায়ী দম্পতির কৃপায় ছেলেকে ফিরে পেলাম। আশিককে দেখতে পাওয়ার খবর বাড়িতে ফোন করে জানাতেই খুশিতে মেতে উঠেছে গোটা পরিবার। 
অন্যদিকে মঞ্জু দেবী বলেন, ওইদিন হাত দেখিয়ে ও চিৎকার না করলে হয়তো আমিও আর পাঁচজনের মতো হোমে খাবার দিয়ে চলে যেতাম। কিন্তু সে চিৎকার করে বোঝাতে চাইছিল এই হাতেই তাঁর পরিবারের খোঁজ রয়েছে। হাতের ট্যাটুতেই সে পরিবার ফিরে পেল। খুবই আনন্দ হচ্ছে। 
হোম সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বলেন, তাঁর হাতে হিন্দিতে ‘শিবান’ লেখা দেখে আমরা তার নাম দিয়েছিলাম শিবান। সে সবসময় হাত দেখিয়ে চিৎকার করত। হয়তো সে ভাবত এভাবেই সে পরিবারের কাছে পৌঁছতে পারবে। কিন্তু আমরা অতিষ্ট হয়ে উঠতাম। এখন বুঝতে পারছি। সে চিৎকার করেই রাস্তাটা বের করল। এদিন হোমে বাবাকে দেখতেই কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেন আশিক। বাবাও ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে কেঁদে ফেলেন। আশিক বাবাকে হাত দেখিয়ে ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলেন, ছোটবেলায় তুমি জোর করে এই ট্যাটু লিখে না দিলে হয়তো আমাকে ফিরে পেতে না। বাবা-ছেলের সেই মিলনদৃশ্য দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারেননি হোম কর্তৃপক্ষ থেকে অন্যান্য আবাসিকরা।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ