নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে’। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবেদিতা হস্টেলে নাগাড়ে মন্ত্র পড়ে চলছেন তাতাই চক্রবর্তী, সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের পাশে বসে রয়েছেন অন্যান্য ছাত্রীরা। পুজো করার পর তাতাই, সুমনারা পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ালেন। সকলেই জোড়হাতে বিদ্যার দেবীর কাছে মনের প্রার্থনা জানালেন। এভাবেই প্রথা ভাঙলেন নিবেদিতা হস্টেলের পড়ুয়ারা। তাঁরা বলেন, মেয়েরা পুজো করতে পারবে না এমনটা কোথাও বলা নেই। তাঁরাও পুরোহিতের ভূমিকা নিতেই পারেন। মায়ের কাছে প্রার্থনা জানাতে পেরে ভালোই লাগছে।
তবে এই হস্টেলের ছাত্রীরা এর আগেও প্রথা ভাঙার সাহস দেখিয়েছেন। পড়ুয়ারা বলেন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই সরস্বতী পুজো নজর কাড়ে। প্রতিটি হস্টেলের পুজোয় রয়েছে থিমের ছোঁয়া। এখানকার মীরাবাই ছাত্রী নিবাসের থিম পরিবর্তন। মোবাইলেই বন্দি শৈশব। নতুন প্রজন্ম মাঠ ভুলে যেতে বসেছে। কয়েক বছরে অনেক কিছু হারিয়ে গিয়েছে। এসব কিছুই এই পুজো মণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে। সরোজিনী ছাত্রী নিবাসও হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন শিল্পকলা পুজো মণ্ডপে তুলে ধরেছে। এই মণ্ডপে এসে দেখা যাবে পুতুল নাচের অতীত কথা। ছৌনাচ এবং বহুরূপী শিল্পীদের জীবনের চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে বহুরূপী শিল্প বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি সেটা এই মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে সর্বক্ষণ বেজে চলছে, ‘মটর কলাই গোল গোল দাঁতে ভাঙে না’। পুজো উদ্যোক্তারা বলেন, বহুরূপী শিল্পীরা সমাজের নানা ছবি মজার ছলে ফুটিয়ে তোলে। সমাজ সচেতনতার কাজেও তাঁদের বড় ভূমিকা থাকে।
অরবিন্দ ছাত্রাবাসের পুজোর থিমের ‘চাইনা উমা হতে’। মহিলাদের উপর ঘটে যাওয়া নানা কাহিনি এই মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেসব অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতেই এমন থিম বেছে নেওয়া হয়েছে বলে ছাত্ররা জানিয়েছেন।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলগুলিতে পুজো দেখতে পড়ুয়ারা সকাল থেকে ভিড় করেছিলেন। বাদ ছিলেন না প্রশাসনিক আধিকারিকরা। পুলিস সুপার সায়ক দাস বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, এখানকার পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। বর্ধমান উত্তরের মহকুমাশাসক তীর্থঙ্কর বিশ্বাস বলেন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি মনে রাখার মতো।
বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যান পরেশ সরকারও বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ ঘুরে দেখেন। তিনি বলেন, এখানকার পুজোর আকর্ষণ অন্যরকম। ছাত্র জীবনের দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায়। আগের মতোই এখানকার পুজোর জাঁকজমক রয়েছে।পড়ুয়ারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরাও পুজোর টানে এখানে আসেন। সরস্বতী পুজোর দিনে এমন পরিবেশ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। পুজোর থিম হোক বা ছাত্রীদের মন্ত্রোচ্চারণে গোলাপবাগ সংলগ্ন এলাকা উৎসব মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রথা ভেঙে তাতাই, সুমনারা বিদ্যারদেবী সামনে শুদ্ধ সংস্কৃতে মন্ত্রোচ্চারণ করেন। নিবেদিতা ছাত্রী নিবাসে ছাত্রী পুরোহিত। নিজস্ব চিত্র