স্বরূপ কুলভী
স্বরূপ কুলভী
কাল থেকে মনে মোর লেগে আছে খটকা
ঝোলাগুড় কিসে দেয়, সাবান না পটকা ?’
ছোট্ট বন্ধুরা, সুকুমার রায়ে ‘নোট বই’ কবিতার কথা তো তোমরা সবাই জানো। বাস্তবেও আমাদের মনে এমন অনেক প্রশ্নের ভিড় করে। দেরি না করে সেগুলি জেনে নেওয়াই ভালো। আজ এমনই একটি প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ করব আমরা। চাঁদের জন্ম কি পৃথিবী থেকেই?
প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগের কথা। আমাদের সৌরজগৎ সৃষ্টি হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু আমাদের পৃথিবী এখনকার মতো হয়ে যায়নি। এরজন্য লেগেছে কোটি কোটি বছর। শুরুতে পৃথিবীর বেশিরভাগই ছিল গলিত লাভা। ক্ষণে ক্ষণে মহাকাশ থেকে আছড়ে পড়েছে গ্রহাণু। তখনও কি পৃথিবীর আকাশে সূর্যের সঙ্গে চাঁদকেও দেখা যেত? পৃথিবীর জন্মের সময়ই কি চাঁদও তৈরি হয়েছিল? বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী তখন একেবারে একাই ছিল। তাহলে চাঁদ এল কীভাবে? আর শুধু আধুনিক যুগেই নয়, বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিজ্ঞানীরা এব্যাপারে দিশা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এব্যাপারে বিজ্ঞানী মহলে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে।
গ্রিক দার্শনিক অ্যানাক্সাগোরাস এব্যাপারে একটা বৈপ্লবিক ধারণা দিয়েছিলেন। আর তা যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে। তিনি জানিয়েছেন, চাঁদের নিজের কোনও আলো নেই। সূর্যের আলোতেই আলোকিত হয় পৃথিবীর এই উপগ্রহ। শুধু তাই নয়। তাঁর ধারণা ছিল, চাঁদ সম্ভবত পাথুরে, পর্বতময় ও গহ্বর যুক্ত। আমাদের পৃথিবী ভেঙেই চাঁদ তৈরি হয়েছিল। এর প্রায় আড়াই হাজার বছর পর চার্লস ডারউইনের ছেলে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ হাওয়ার্ড ডারউইন ধারণা দিয়েছিলেন যে, পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ঘুরতে শুরু করে। সেটাই একটা সময় চাঁদে পরিণত হয়। আবার অনেক বিজ্ঞানী অনুমান করেন, মহাজাগতিক কোনও গ্রহাণু কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মায়ায় বাঁধা পড়ে। আর একটি তত্ত্বও রয়েছে। তা হল জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট থিওরি বা প্রচণ্ড সংঘর্ষের তত্ত্ব। এই তত্ত্ব পৃথিবীর জন্মলগ্নের কিছু পরের কথা বলছে। তখনও জমাট বাঁধেনি পৃথিবী। বেশিরভাগই উত্তপ্ত গলিত লাভা। গ্রহাণুদের আছড়ে পড়ার ধারা তখন অবিরাম। তখনই প্রায় মঙ্গলের মতো থিয়া নামে একটি বড় গ্রহ সদৃশ বস্তু পৃথিবীকে আঘাত করে। ওই আঘাতের ফলে পৃথিবী ও থিয়া মিলেমিশে বড় একটি গোলকে পরিণত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়া চলার একটা সময়ে গোলকের একটি অংশ ছিটকে যায়। কিন্তু তা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে বেরতে পারেনি। একে অপরের মায়ায় বাঁধা পড়ে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে থাকে, ওই অংশটি। এটাই হয়ে ওঠে চাঁদ।
এই রহস্য উদ্ঘাটনই ১৯৬৯ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’র অ্যাপোলো মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ওই অভিযানে মহাকাশচারীরা চাঁদ থেকে প্রায় ৩৮২ কেজি পাথর ও মাটি নিয়ে আসেন। আর তা থেকে চাঁদ কীভাবে তৈরি হল, তার কিছু সূত্র পাওয়া গিয়েছে। সেই পাথর ও মাটি পরীক্ষায় দেখা যায়, পৃথিবী ও চাঁদের রাসায়নিক গঠন, এমনকী মৌলিক পদার্থগুলির আইসোটপিক গঠনেরও বেশ মিল রয়েছে। এর থেকেই পৃথিবী ও তার উপগ্রহের সৃষ্টির একটা যোগসূত্র রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। চাঁদ যদি বাইরে কোথাও তৈরি হয়ে পৃথিবীর বাঁধনে এসে ধরা পড়ত, তাহলে এই গঠনে এতটা মিল থাকা সম্ভব ছিল না। আবার যদি দুটোই একসঙ্গে তৈরি হতো বা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চাঁদ তৈরি হতো তাহলে কী হতে পারত? চাঁদ পৃথিবীর অংশ হলে দু'টিরই খনিজের ধরণ ও অনুপাত একই রকম হতো। কিন্তু পৃথিবী ও চাঁদের খনিজের ধরণ ও অনুপাত কিছুটা ভিন্ন। তাহলে পৃথিবী ভেঙে বা বাইরের কোনও মহাজাগতিক বস্তুর চাঁদ হয়ে ওঠার তত্ত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।
চাঁদের জন্ম রহস্য নিয়ে ১৯৭০ ও ৮০-র দশকে বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক বিতর্ক চলতে থাকে। আর এই বিতর্কের মধেই জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট থিওরিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।