পরামর্শে টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া (ট্রাই)-র আধিকারিক অসীম দত্ত।
পরামর্শে টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া (ট্রাই)-র আধিকারিক অসীম দত্ত।
• ঘটনা ১: বর্ধমানের ব্যবসায়ী অরিন্দমবাবুকে একদিন হঠাৎ আত্মীয়রা ফোন করতে শুরু করেন—কী হয়েছে? তুমি এতগুলো টাকা চাইছ কেন? তিনি অবাক। পরে বুঝলেন, তাঁর নামে তোলা একটি অন্য সিম দিয়ে নতুন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেখানে তাঁর ছবি লাগিয়ে পরিচিতদের কাছে জরুরি প্রয়োজনে টাকার অনুরোধ পাঠানো হচ্ছিল।
• ঘটনা ২: শ্যামলীর নামে রেজিস্টার হওয়া একটি মোবাইল নম্বর থেকে নাকি প্রতারণার অভিযোগ এসেছে। অথচ তিনি এমন কোনো নম্বর ব্যবহারই করেন না। অভিযোগ শুনে চমকে গেলেন শ্যামলী। পরে উপলব্ধি করলেন, তাঁর ডকুমেন্ট ব্যবহার করে অন্য সিম তোলা হয়েছে। আর তা দিয়েই চলছে প্রতারণা।
উপরের ঘটনা দুটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এমনই বিভিন্ন ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটছে। হয়তো আপনার অজান্তেই, আপনার নাম ও ডকুমেন্ট ব্যবহার করে ভুয়ো সিম কিনছে প্রতারকরা। তা ব্যবহার করে চলছে একের পর এক অপরাধ। এর জেরে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মোবাইল নম্বর এখন কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ইউপিআই, হোয়াটসঅ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া, সরকারি পরিষেবা—সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওই ১০টি ডিজিট। তাই আপনার অজান্তে যদি আপনার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে কেউ সিম তুলে নেয়, সেই নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি, সাইবার অপরাধ সবই সম্ভব।
কীভাবে ব্যবহার হয় নথি?
একসময় সিম নেওয়ার ক্ষেত্রে পেপার কেওয়াইসি পদ্ধতি ছিল। অর্থাৎ গ্রাহককে ঠিকানার প্রমাণপত্র এবং পরিচয়পত্র জমা দিতে হত। অনেক ক্ষেত্রে সিম বিক্রেতা বা খুচরো এজেন্টদের হাত দিয়েই নথি অপব্যবহার হত। ধরুন, আপনি বৈধভাবে একটি সিম নিলেন। আপনার জমা দেওয়া কেওয়াইসি নথি ব্যবহার করে একই সঙ্গে আরও একটি সিম তোলা হল। একটি দেওয়া হল আপনাকে, অন্যটি চলে গেল প্রতারকদের হাতে। সেই নম্বর ব্যবহার করে শুরু হল জালিয়াতি। অনেক গ্রাহক বুঝতেই পারতেন না, তাঁদের নামে অতিরিক্ত সিম সক্রিয় রয়েছে। এখন ডিজিটাল কেওয়াইসি, ই কেওয়াইসি, ওটিপি ভেরিফিকেশন, বায়োমেট্রিক বা আধার-ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে সিম ইস্যু হয়। ফলে প্রতারণা কমেছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কীভাবে বুঝবেন আপনার নামে অন্য সিম রয়েছে?
‘সঞ্চার সাথী’ পোর্টাল বা অ্যাপ ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এটি ভারত সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশন-এর উদ্যোগ। এই প্ল্যাটফর্মে গিয়ে আপনি জানতে পারবেন—
• আপনার নামে কতগুলি মোবাইল নম্বর সক্রিয়।
• কোনো অচেনা নম্বর রয়েছে?
• হারানো ফোন ব্লক করার আবেদন।
• এই অ্যাপ বা পোর্টালে ট্যাফকপ নামে একটি টুল রয়েছে। সেখানে আপনার মোবাইল নম্বর ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে রেজিস্টার করুন। তাহলেই দেখতে পাবেন আপনার পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে কতগুলি সিম চালু রয়েছে। একজন সাধারণ গ্রাহকের নামে সাধারণত সর্বাধিক ৯টি সিম থাকতে পারে। তাই তালিকায় অচেনা নম্বর দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হন। যদি দেখেন আপনার নামে এমন কোনো নম্বর রয়েছে যা আপনি ব্যবহার করেন না, তাহলে সেটি ‘অপ্রয়োজনীয়’ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারবেন।
কী কী প্রতারণা হতে পারে?
• ব্যাংকের নামে ওটিপি হাতানো।
• ইউপিআই প্রতারণা।
• ভুয়ো হোয়াটসঅ্যাপ খুলে আত্মীয়দের থেকে টাকা চাওয়া।
• লোন জালিয়াতি।
• ভুয়ো ব্যবসায়িক কল।
প্রতারণা আটকাবেন কীভাবে?
১. অযাচিত প্রমোশনাল কল আটকাতে ট্রাই-এর ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ ব্যবস্থা ব্যবহার করুন।
২. সঞ্চার সাথীতে নিজের নামে কতগুলি সিম রয়েছে তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
৩. ব্যাংক, টেলিকম কোম্পানি বা সরকারি সংস্থা ওটিপি চায় না। ফোনে কাউকে ওটিপি বলবেন না।
৪. যত্রতত্র আধার, প্যান, ভোটার কার্ডের কপি দেবেন না।
যদি কখনো প্রতারণার শিকার হন, সেক্ষেত্রে দেরি না করে ফোন করুন ১৯৩০ নম্বরে। এটি ভারতের জাতীয় সাইবার প্রতারণা হেল্পলাইন। এছাড়া সাইবার ক্রাইম পোর্টালেও অভিযোগ জানাতে পারেন। তবে সমস্যা হল, অনেক সময় যে নম্বর দিয়ে প্রতারণা হচ্ছে, কাগজে-কলমে সেটি আপনার নামে। তাই প্রাথমিকভাবে আপনাকেই সমস্যায় পড়তে হয়। তাই যে নম্বর আপনার নয়, সেটি বন্ধ করুন। কোনো ব্যক্তি এধরনের প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণিত হলে তাঁকে এক থেকে দু’বছর কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার টেলিকম সার্ভিস দেবে না। পুলিশও আইনি ব্যবস্থা নেয়।
শান্তনু দত্ত