পরামর্শে পিজি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ নীলাদ্রি সরকার।
পরামর্শে পিজি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ নীলাদ্রি সরকার।
প্রখর গরম। তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির কাছে যাওয়ার সতর্কতা সর্বত্র। গরমে হাঁসফাঁস দশা ও ঘামের আকারে শরীর থেকে অনর্গল জল বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতাই সবচেয়ে ভয়ের কারণ। শরীর থেকে জলের সঙ্গে বেশ কিছুটা নুনও বেরিয়ে যায়। তাই এই সময় ডিহাইড্রেশন হয়।
ডিহাইড্রেশন কী?
হাইড্রো কথার অর্থ জল। ‘ডি’ কথার মানে ‘বিয়োগ’। শরীর থেকে জল ও নানা খনিজ বেরিয়ে যাওয়াকে ডিহাইড্রেশন বলে। লু বা তাপপ্রবাহের কারণে এমন হলে তাকে ‘হিট ডিহাইড্রেশন’ বলে। এর নানা ধরন আছে। কারও ক্ষেত্রে খনিজ বা সোডিয়াম-পটাশিয়ামের চেয়ে জল বেশি বেরয়। এতে দেহে নুনের ভাগ বৃদ্ধি পায়। একে বলে হাইপার ন্যাট্রিমিক ডিহাইড্রেশন। জল কম বেরিয়ে নুন বেশি বেরলে তাকে হাইপো ন্যাট্রিমিক ডিহাইড্রেশন বলে। তাই শুধু জল খেলেই হয় না, জলের সঙ্গে নুনরে পরিমাণও খেয়াল রাখতে হয়।
হিট ডিহাইড্রেশনে কী কী হতে পারে
ডিহাইড্রেশনের নানা লক্ষণ থাকে। যেমন: মাথা ঘোরা, শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ খুব বৃদ্ধি পাওয়া, বমিভাব সঙ্গে ঘাম ইত্যাদি।
ডিহাইড্রেশন বোঝার উপায়
ডিহাইড্রেশন হলে রোগীর জিভ ও মুখের ভিতরটা শুকিয়ে যেতে শুরু করে, ঘন ঘন জলতেষ্টা পায়। অনেকের ক্ষেত্রে আবার প্রস্রাবের রং হলুদ হয়। কারও ক্ষেত্রে পেশিতে টান ধরছে কি না। এই তিনটি উপসর্গের একটি হলেই বুঝতে হবে ডিহাইড্রেশন হচ্ছে।
বাড়িতে নাকি হাসপাতালে?
সামান্য ডিহাইড্রেশন বাড়িতেই সারিয়ে তোলা যায়। তখন জল, ওআরএস খেয়ে, ঠান্ডা ঘরে রোগীকে রেখে সমস্যা মেটানো যায়। কিন্তু রোগীর খুব মাথা ঘুরলে, অতিরিক্ত জ্বর হলে, শিরায় টানের প্রভাবে খিঁচুনির মতো হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সতর্ক না হলে এ থেকে হিট স্ট্রোক হতে পারে। রোগীর স্নায়ুর সমস্যাও দেখা যেতে পারে। ডিহাইড্রেশনের ফলে অনেক সময় রোগী সংজ্ঞা হারাতে পারেন। এসব হলে রোগীর প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
দিনে কতটা জল?
কে কতটা জল খাবেন তা নির্ভর করে তাঁর অন্যান্য শারীরিক অসুখ ও ওজনের উপর। সাধারণত একজন পূর্ণবয়স্ক ও সুস্থ ৭০ কেজি ওজনের মানুষের দিনে জল খাওয়ার মাত্রা আড়াই থেকে তিন লিটারের মধ্যে থাকা উচিত। ৯০-১০০ কেজি ওজনের সুস্থ মানুষ জল খাবেন সাড়ে তিন লিটার। সারাবছর যা জল খান, গরমে তার চেয়ে ৫০০ মিলিলিটার জল বেশি খেতে হবে। সহজ নিয়ম, তেষ্টা পেলেই জল খান। অনেকে এক চুমুক করে জল খেয়ে তেষ্টা মেটান। সেটা না করাই উচিত। কাঁচা জল, ওআরএস বা নুন-লেবুর শরবত মিলিয়ে শরীরে তরলের পরিমাণ হিসেব করতে হবে। বাইরের শরবত, খোলা জায়গার জল, বাইরের কাটা ফল, প্যাকেটবন্দি ফলের রস খাবেন না। কোল্ড ড্রিংক, চা-কফিও না খেলেই ভালো।
রাস্তাঘাটে বহু মানুষকে বেরতে হয়। কী কী সতর্কতা নেবেন?
সবসময় ব্যাগে ছাতা, সানগ্লাস রাখুন। সানস্ক্রিম মেখে বেরন। পর্যাপ্ত জল, ওআরএস বহন করতে হবে। জল শেষ হলে কিনে নিতে হবে। সুযোগ থাকলে ডাবের জল খান। আখ কিনে বাড়িতে আখের রস বানিয়ে খেতে পারেন। কষ্ট হলে ছায়া দেখে বিশ্রাম নিন। মাঝেমধ্যেই চোখ, মুখ ও ঘাড়ে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিন। রোদে বেরলে ভিজে রুমাল দিয়ে প্রায়ই মুখ, ঘাড় মুছতে থাকুন।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। এই সময় উচ্চ মাত্রায় প্রোটিনযুক্ত খাবার খাবন না। উচ্চ প্রোটিনে কিডনির উপরে চাপ পড়ে, ফলে তার কাজ সারতে বেশি পরিমাণে জল শোষণ করে। ফলে শরীরে জলের ঘাটতি দেখা যায়। তীব্র গরম থেকে ফিরেই এসি বা পাখার নীচে নয়। সাধারণ তাপমাত্রায় অল্প কিছুক্ষণ জিরিয়ে, ঘাম শুকিয়ে এলে ভিজে তোয়ালে বা গামছা দিয়ে মুখ-ঘাড়-হাত-পা স্পঞ্জ করে শুকিয়ে তারপর পাখার তলায় যান। শরীর পাখার তাপমাত্রায় মানিয়ে নিলে তারপর এসি চালান। এসির তাপমাত্রা খুব কমাবেন না। ২৪-২৬-এর মধ্যে রাখুন। প্রয়োজনে স্নান করুন বারবার। তবে ঠান্ডার ধাত থাকলে দিনে একবারের বেশি মাথা ভেজাবেন না।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়