Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেশ কীভাবে গড়তে ও উন্নত করতে হয়

ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার সময়, একটি শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইনটি আমার নজরে পড়ে।

দেশ কীভাবে গড়তে ও উন্নত করতে হয়
  • ১৪ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার সময়, একটি শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইনটি আমার নজরে পড়ে। তাতে লেখা ছিল, ‘ভারতকে যেভাবে নির্মাণ করা হয়, ভারতের বিকাশ হয় সেভাবেই’। একদম খাঁটি কথা। আমরা অবশ্যই নির্মাণ করব। এবং, আমাদের জানতে হবে, জনসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ—যেমন রাস্তাঘাট, সেতু, রেলপথ, বিমানবন্দর, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং অফিসের জন্য ভবন প্রভৃতি নির্মাণ করতে হয় কীভাবে।

Advertisement

মহান নির্মাতা নেহরু
জওহরলাল নেহরু একজন মহান নির্মাতা ছিলেন। নেহেরু-বিদ্বেষীদের সমালোচনার কোনও মূল্য নেই। ১৯৪৭ সালে ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৪ কোটি এবং তারপর থেকে তা ক্রমেই বেড়েছে। তখন সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। নেহরুর নেতৃত্বে সরকার চলেছিল ১৭ বছর। ওই সময়ের মধ্যে তিনি বহু স্কুল এবং কলেজ তৈরি করেছিলেন। তিনিই তৈরি করেছিলেন আইআইটি, আইআইএম, ইস্পাত কারখানা, আইওসি, ওএনজিসি, এনএলসি, এইচএএল, ভেল, ইসরো, ভাকরা নাঙ্গাল, হিরাকুদ, দামোদর উপত্যকা এবং আরও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বলা বাহুল্য যে, প্রকল্পগুলির মূল চালিকাশক্তিও ছিলেন নেহরু। সে ছিল স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিকশিত হওয়ার কয়েকটি বছর। শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার দিক থেকে দেশটি তখন খুবই দুর্বল—প্রেক্ষাপট ছিল এমনই করুণ। নেহরুর নির্মাণগুলি আজও টিকে আছে। কারণ, ভারতে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও সৎ, জন্মগত বুদ্ধিমত্তার (নেটিভ ইনটেলিজেন্স) অধিকারী এবং নিষ্ঠাবান মানুষ বিপুল সংখ্যায় ছিল।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে, চোল রাজা কারিকালন কাবেরী নদীর উপর কাল্লানাই (গ্র্যান্ড আনিকট) নির্মাণ করেন। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম সেচ বাঁধগুলির মধ্যে একটি। এটি নির্মাণে মর্টারের মতো কোনও বাঁধাই উপাদান ব্যবহার করা হয়নি। কোনও মেশিনে কাটাই করা পাথর দিয়ে নয়, প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত আন্তঃসংযুক্ত পাথর দিয়ে ওই বাঁধ নির্মিত। এটি আজও সেচ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাজমহল তৈরির কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে। এই সৌধের স্থায়িত্ব সুনিশ্চিত করার জন্য যেসব নির্মাণসামগ্রী বেছে নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—লাল বেলেপাথর, মার্বেল, ব্রিক-ইন-লাইম মর্টার প্রভৃতি। ওইসঙ্গে ভিতও নির্মাণ করা হয়েছিল অতিশয় সুন্দরভাবে। কেন্দ্রীয় সরকারের মূল কেন্দ্র যে সাউথ ব্লক এবং নর্থ ব্লক—সেই দুটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯৩১ সালে। এই ভবনগুলি মজবুত, এবং এককথায় অসামান্য। আইকনিক কাঠামো নির্মাণের যে ঐতিহ্য ভারতের রয়েছে তা দু’হাজার বছরের প্রাচীন। 
ভারত প্রতিদিনই নির্মাণ করে চলেছে কিন্তু এর একটা টুইস্ট বা মোড় আছে। প্রতিটি নাগরিকই জানেন যে ব্যক্তিগত নির্মাণ এবং সরকারি নির্মাণের গুণমান এবং মজবুতির পার্থক্যটা কী। বিল্ডিং নির্মাণে দক্ষ ঠিকাদাররা দুই ধরনের কাজই করেন কিন্তু তাঁদের আচরণ দুই ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাঁদের কাজের প্রসেস বা প্রক্রিয়াগুলিও আলাদা আলাদা।
বেসরকারি বনাম সরকারি নির্মাণ
এই বিশেষ নিবন্ধে আমার উদ্বেগের বিষয়টি হল—সরকারি অর্থ ব্যবহার করে সরকারি নির্মাণগুলি। বেসরকারি নির্মাণের গুণমান নির্ভর করে স্থপতি ও ঠিকাদারের পছন্দ এবং তহবিল জোগাড়ের উপর। সরকারি নির্মাণ, বিশেষ করে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলিকে জমি কিংবা টাকার সঙ্কটে পড়তে হয় না। তাহলে আমরা কী সব কাণ্ড ঘটতে দেখছি? হাইওয়ে এবং নতুন রাস্তাগুলি খানাখন্দে ভরে ওঠে। পয়ঃপ্রণালী ফেটে রাস্তা ভেসে যায়। নয়াদিল্লিতে অশোকা রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কী হাল ভাবুন—একটি পয়ঃপ্রণালী গত দেড় বছরে তিন তিনবার ফেটে যাওয়ার ফলে রাস্তাটিই গোল্লায় গিয়েছে! সাধারণ গাড়ি থেকে বাস—সব রাস্তার বড় বড় গাড্ডায় গিয়ে পড়ছে। গোয়ালিয়রে ১৮ কোটি টাকায় তৈরি একটি রাস্তা উদ্বোধনের মাত্র ১৫ দিন পরই ভেঙেচুরে দফারফা হয়ে গিয়েছে। মনে করুন গুজরাতের মোরবির ঘটনাটি। কোনোক্রমে মেরামত করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার মাত্র চারদিন পরই একটি পাকা ব্রিজ ভেঙে পড়েছিল। ওই একটি ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৪১! তদন্তে প্রকাশ, একটি অযোগ্য কোম্পানিকে দিয়ে সেতুটি ‘মেরামত ও পুনরুদ্ধার’ করা হয়েছিল। তারা যেসব উপাদান দিয়ে কাজটি করেছিল তা ছিল নিম্নমানের। বিহারে নির্মাণের কিছুক্ষণ পরেই, এমনকী নির্মাণ চলাকালেই কোনও কোনও সেতু ভেঙে পড়ার ঘটনায় কেউ অবাক হয় না। একটি ব্রিজ তো তিন তিনবার মুখ থুবড়ে পড়েছিল। গত জুন মাসের ঘটনা। ভোপালের আইশবাগের বাসিন্দারা আতঙ্কের সঙ্গে আবিষ্কার করেন যে, রেল এবং পূর্তবিভাগের মধ্যে দীর্ঘ সাতবছর বিবাদের পর ৬৪৮ মিটার দীর্ঘ যে ব্রিজ তাঁদের ‘উপহার’ দেওয়া হয়েছে সেটি ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে তৈরি!  
সময় এবং অর্থের এমন বিপুল অপচয়ের কারণ অনেকই। প্রথম কারণ হল জবাবদিহিতার কোনও বালাই নেই। প্রচলিত নিয়মটি মনে হয়, ‘একটি বিপর্যয়কর প্রকল্পে যেহেতু অনেক ব্যক্তি জড়িয়ে থাকেন, তাই শেষমেশ কোনও ব্যক্তিকেই দায়ী করা হয় না।’ গোষ্ঠীবদ্ধ লোকজন ‘ইমিউনিটি’ বা অনাক্রম্যতার সুবিধা ভোগ করে থাকে। এই দীর্ঘ ইতিহাসই গোষ্ঠীগত দায়মুক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
আর একটি কারণ হল প্রসেস বা প্রক্রিয়া। সর্বনিম্ন দর যে সংস্থা দেয় সাধারণত সে’ই কাজের বরাতটি হাসিল করে বা কাজটি করার জন্য নির্বাচিত হয়। সর্বনিম্ন দর যে সংস্থা দিল তাকে সুযোগ না দিলে বিরূপ প্রশ্ন ওঠে, এমনকী তা নিয়ে তদন্তও শুরু হয়। তাহলে ‘লোয়েস্ট প্রাইস বিড’কে কেন বাদ দেওয়া হবে? এমন একটি বিজয়ী সংস্থা প্রকল্প নির্মাণে নিম্নমানের মালমশলা ব্যবহার করে এবং মোটা টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে অনুমোদিত পরিকল্পনার সঙ্গেই আপস চলে। বরাত প্রাপ্তির জন্য অনেক টেন্ডারে দরদাতারা নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে একজন ঠিকাদারকে জিতিয়ে দেন। ‘এস্টিমেটের ঊর্ধ্বে’র অর্থ থেকে টেন্ডারে বিজয়ী ব্যক্তি বা সংস্থা ঘুষ দেয়।
ডিজাইন, ড্রয়িং এবং এস্টিমেটগুলি আজেবাজে লোকদের দিয়ে বানানো এবং সুপারভাইজ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা (যাঁরা তর তর করে উপরে উঠেছেন) ডিজাইন ও উপকরণের উন্নতি, উন্নত নির্মাণ প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সঙ্গে পরিচিত নন। তাঁরা এইভাবে সময়োপযোগী হয়ে উঠলেই সরকারি প্রকল্প রূপায়ণে শ্রম, অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় হতে পারত। 
এর একটি প্রধান কারণ হল পলিটিক্যাল করাপশন বা রাজনৈতিক দুর্নীতি। তথাকথিত ‘শাঁসালো’ দপ্তর বা পদ পাওয়ার জন্য মন্ত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। অনেক রাজ্যে ‘রেট কার্ড’ পর্যন্ত চালু রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের শোচনীয় রূপায়ণের জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছে কিছু বিভাগ অথবা সংস্থা: এই ব্যাপারে সবার আগে আসে পিডব্লুডি বা পূর্তবিভাগের নাম। ডিডিএ এবং সমতুল কিছু প্রতিষ্ঠান, যাদের মাধ্যমে কম খরচে আবাসন (বাস্তবে অবশ্য তা পাকা বস্তিঘর) তৈরি হয় এই প্রশ্নে তারাও রয়েছে শীর্ষের কাছাকাছি। হাইওয়ে এবং রেলপথ নির্মাণের ব্যাপারও তেমন পিছিয়ে নেই।
গর্ডিয়ান নট কেটে ফেলুন
এটি গ্রিক পুরাণকথিত ‘গর্ডিয়ান নট’-এর মতোই এক অতিজটিল সমস্যা যার কোনও সমাধান নেই। সেটারই সমাধান করতে হবে দৃঢ়তার সঙ্গে। এর অর্থ হল, জনগণের পণ্য ‘নির্মাণকারী’ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে পর্যায়ক্রমে তুলে দিতে হবে। সিস্টেমের ‘সংস্কার’ করার অতীত প্রচেষ্টাগুলি ব্যর্থ হয়েছে এবং যদি আবার চেষ্টা করা হয়, তবে আবারও ব্যর্থ হবে। বিপরীতে, বেসরকারিকরণ এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ বণ্টন, পরিবহণ, খনি এবং তেল অনুসন্ধানের মান উন্নত হয়েছে। এগুলির মাধ্যমে জনগণের ব্যবহার্য পণ্য উৎপন্ন হয়।
জনস্বার্থে সরকারি নির্মাণে এগিয়ে যাওয়ার উপায় এটাই। স্বল্পমেয়াদে এতে খরচ বাড়বে। ‘কার্টেল’ বা ব্যবসায়ীদের সুবিধাবাদী গোপন গোষ্ঠী তৈরি হবে। দেখা দেবে কিছু দুর্বলতাও। আমাদের সংশোধন করতে হবে এবং নতুন পথের উপর এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, প্রকৃত, সুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগই জনগণের সম্পদ নির্মাণ করবে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ