১১ বছর, ৭৮টি দেশ, ৯১টি সফর। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরেই বিদেশের সংখ্যা ১৪। এ হল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির বিদেশ সফরের সালতামামি। বিরোধীরা কটাক্ষ করে বলে, উনি হলেন ভূ-পর্যটক। পায়ের তলায় সর্ষে লাগানো আছে। দেশের অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতিই থাক, এই প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের কোনও বিরাম নেই। কিন্তু এত বিদেশ সফর করেও যে ভারতের বৈদেশিক কূটনীতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ কল্কে পাচ্ছে না, তা পহেলগাঁও কাণ্ডের পরেই শোনা গিয়েছে। কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিদের নৃশংস হত্যালীলা চালানোর পিছনে যে পাকিস্তান রয়েছে, সেটা বোঝাতে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রীরা বারবার বিদেশ ছুটে গিয়েছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সমর্থন আদায়ে সবরকম দৌত্য চালিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ভারতের অবস্থান বোঝাতে সরকার মাঠে নামিয়েছিল দেশের প্রায় সব বিরোধী দলকে। দেশের স্বার্থে বিরোধীরাও সরকারকে সাথ দিয়েছিল। সেই আবহে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল ৩৩টি দেশ সফরও করেছে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের নিন্দা করলেও প্রায় কোনও দেশই সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অন্তত খুব জোরালোভাবে প্রকাশ্যে মুখ খোলেনি। উল্টে এত কাণ্ডের পরেও পাকিস্তানকে সমর্থন সাহায্য জুগিয়েছে কয়েকটি মহল! এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বৈদেশিক নীতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠলেও মোদির বিদেশ সফরে কোনও বিরাম নেই। সরকারি কোষাগারের শত শত কোটি টাকা খরচ করে প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণ চলছেই।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভুটান দিয়ে তাঁর বিদেশ সফর শুরু করেছিলেন মোদি। সেই থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ৯১টি আন্তর্জাতিক সফরে ৭৮টি দেশে গিয়েছেন তিনি। সবচেয়ে বেশি আমেরিকায় গিয়েছেন, দশ বার। চলতি বছরে জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নরওয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। খুব সম্প্রতি তৃণমূলের এক সাংসদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ১৪টি দেশ সফর করেছেন মোদি। এই বিপুল সংখ্যক সফরে কত খরচ হয়েছে? বিভিন্ন তথ্যে উঠে আসছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তাঁর বিদেশ সফরে খরচ হয়েছে প্রায় ২০০০ কোটি টাকা। আর ২০২১-২৪ সালের মধ্যে ২৯৫ কোটি টাকা। এর বাইরে রয়েছে ২০১৯-২০ সালের হিসাব। শুধু এ বছর পাঁচটি দেশ সফর করতেই সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ৬৭ কোটি টাকা। বাকি ৯টি দেশ সফরের খরচ এখনও হিসাব করে উঠতে পারেনি বিদেশ মন্ত্রক। বিদেশ সফরে মোদি দেশের আগের সব প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ইন্দিরা গান্ধী ১৫ বছর ৬ মাস ২১ দিন প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন মোট ৫৩ বার বিদেশ সফর করে ৬৯টি দেশে গিয়েছেন। মোদির দলের পূর্বসূরি অটলবিহারী বাজপেয়ি তাঁর রাজত্বের পাঁচ বছরে মাত্র ৩১টি দেশ গিয়েছেন। আর মোদির আগের দশ বছরের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ৭৩টি দেশে সফর করেছেন। এঁদের সফরের খরচও মোদির ধারেকাছে নয়। একথা ঠিক, দেশের বাণিজ্য, কূটনীতি, বিদেশনীতির স্বার্থেই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের বিদেশ সফর করতে হয়। সেটাই দস্তুর। সেই সফরের দরুন কাজের কাজ কতটা হচ্ছে সেটা অবশ্যই বিচার্য বিষয়। এখানেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে মোদির বিদেশ সফর।
কেন এত ঘন ঘন বিদেশ সফর করেন প্রধানমন্ত্রী? বিদেশ মন্ত্রকের দাবি, মূলত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, সংশ্লিষ্ট দেশের ভারতীয়দের সঙ্গে আলোচনা, আন্তর্জাতিক কোনও সামিট-এ যোগদান, কোনও স্মারক বা স্মৃতিসৌধে যাওয়ার কর্মসূচি থাকে প্রধানমন্ত্রীর। এইসব সফরে তাঁর সঙ্গী হন মন্ত্রী-অফিসারদের প্রতিনিধি দল। কিন্তু বিপুল খরচের সফরগুলির নিট ফল কতটা, তা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। মোদি সবচেয়ে বেশি যে দেশে সফর করেছেন, সেই আমেরিকায় দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মোদিকে ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেও যেভাবে ছড়ি ঘোরানো শুরু করেছেন বা সেটা করার সুযোগ পাচ্ছেন, তাতে বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, তিনি মোদিজিকে রীতিমতো ল্যাজে খেলাচ্ছেন। শুল্ক থেকে শুরু করে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে মধ্যস্থতার দাবি এবং এসব নিয়ে প্রথমদিকে মোদিজির রহস্যজনক নীরবতায় মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এই সফরগুলি আসলে বিদেশে নিজের আত্মপ্রচারে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ মোদিজির বিশেষ ‘বন্ধু’ ট্রাম্প একের পর এক যেভাবে হুঙ্কার দিয়ে চলেছেন বা ভারতীয়দের এদেশে ফেরত পাঠানোর সময় পায়ে শিকল বেঁধে তাঁদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন যে আচরণ করেছে তা কখনওই সম্মানজনক বা সমর্থনযোগ্য নয়। এখন আবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন ভারত থেকে কর্মী নিয়োগ না করার জন্য! তাই বারবার মার্কিন সফরের পরও ‘বন্ধুত্বের’ এমন প্রতিদান মিললে প্রশ্ন তো উঠবেই। এসব সমালোচনা অবশ্য মোদি গায়ে মাখেন না। বিদেশ সফরেও ইতিমধ্যে তিনি রেকর্ড করে ফেলেছেন। এখন হয়তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে চাইছেন। আর সফরের খরচ? সে লাগে টাকা, দেবে তো গৌরী সেন মানে আম জনতা। অর্থাৎ এর জন্য আছে জনগণের করের টাকা।